Ajker Patrika

নিজেদের মেধাকে আগে কাজে লাগান

আব্দুর রাজ্জাক 
আপডেট : ১২ মে ২০২৬, ০৮: ৩৮
নিজেদের মেধাকে আগে কাজে লাগান

বর্তমান পৃথিবীতে মেধার বিকল্প কিছু নেই। এখন যা কিছু করবেন, যা কিছু ভাববেন, সবকিছুতেই মেধার দরকার। মেধার বিকল্প একমাত্র অধিক মেধাসম্পন্ন চিন্তাভাবনা। মেধার বিকাশ ঘটাতে হবে বিজ্ঞানভিত্তিক, বাস্তবভিত্তিক কাজকে সমাধান করার জন্য। মুক্তবুদ্ধির চিন্তা করতে হবে, যা চলমান আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে মানানসই হয়।

নিজেদের মেধাকে কাজ না লাগাতে পারলে পৃথিবীর কোনো জাতি অগ্রসর হতে পারে না। আফ্রিকার কিছু কিছু অঞ্চলের মানুষকে বলা হয় তারা খুব একটা মেধাবী না। যেমন বান্টু জাতি। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এই জাতি জিনগতভাবে তেমন চিন্তাশীল না। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে এ রকম আরও জাতি-গোষ্ঠী থাকতে পারে, যারা চিন্তা-চেতনার দিক থেকে এখনো অনগ্রসর। হতেই পারে তারা উপযুক্ত পরিবেশ পায়নি, আধুনিক পৃথিবীর ছোঁয়া সেখানে ধীরগতিতে পৌঁছেছে, তাই তাদের মেধার বিকাশ সেভাবে ঘটেনি। কিন্তু আমরা দক্ষিণ এশিয়ার দেশের, বিশেষ করে আমাদের এই ভূখণ্ডের মানুষ যে মেধাবী, সেটার প্রমাণ বহু ক্ষেত্রে রয়েছে। বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় আমাদের যথেষ্ট মেধাবী মানুষ আছে। অর্থনীতিতে, সমাজবিজ্ঞানে, সাহিত্যসহ সব ক্ষেত্রেই আমরা মেধার পরিচয় রেখেছি। কিন্তু জাতির প্রয়োজনে আমরা এই মেধাকে কাজে লাগাতে পারছি না, আমাদের মেধা পাচার হয়ে যাচ্ছে। আমাদের এই দেশের মেধাবী সন্তানেরা ইউরোপ-আমেরিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যথেষ্ট প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন, সেইসব দেশে সমাদৃত হয়েছেন, পুরস্কৃত হয়েছেন। এইসব মেধাবী বিজ্ঞানী দেশে আসতে চাইছেন না এই কারণে যে, এখানে এলে তাঁদের মূল্যায়ন হবে না।

পানিকে আর্সেনিকমুক্ত করার জন্য সনোফিল্টার আবিষ্কার করে ২০০৭ সালে বিজ্ঞানী আবুল হুসসাম গ্রেইঞ্জার চ্যালেঞ্জ গোল্ড অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন। এই পুরস্কারকে বলা হয় টেকনোলজির নোবেল পুরস্কার, পুরস্কারের অর্থমূল্য ছিল ১০ লাখ মার্কিন ডলার, যার প্রায় ৭০ শতাংশ তিনি মানবসেবায় ব্যবহার করেন। অথচ আমরা অনেক বাঙালি এই বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীর নাম জানি না। এ রকম আরও শত উদাহরণ আছে। আমাদের এই দেশেরই সন্তানেরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন।

এত কথা বললাম যে কারণে, সেই আলোচনায় ফিরে আসি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৬ সাল থেকে বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং নামে একটি সাবজেক্ট চালু করেছে। বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় সাধারণত যারা মোটামুটি প্রথম দিকে থাকে, তারাই এই সাবজেক্টে ভর্তি হয়। উদ্দেশ্য ছিল মহৎ। আমাদের দেশের বিভিন্ন মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজসহ বড় বড় সরকারি হাসপাতালে হাজার হাজার কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ব্যবহার উপযোগী না হওয়ায় অথবা ব্যবহার করার মতো যোগ্য ইঞ্জিনিয়ার না থাকার কারণে পড়ে আছে দীর্ঘদিন, ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, জং ধরে যাচ্ছে। বুয়েট এই বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং চালু করেছিল এইসব যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা করার জন্য। মোট ছয় ব্যাচে দেড় শ ছাত্র এখান থেকে বের হয়েছে। এই মেধাবী বঙ্গসন্তানদের আমাদের দেশ কোনো কাজের ব্যবস্থা করতে পারেনি। এতগুলো মেডিকেল কলেজ, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি হাসপাতাল থাকা সত্ত্বেও, সেখানে তাদের প্রয়োজন থাকার পরেও এই মেধাবী ইঞ্জিনিয়ারদের চাকরির ব্যবস্থা করছে না আমাদের রাষ্ট্র। ফলে তারা চলে যাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, যেখানে তাদের অনেক কদর আছে। উচ্চশিক্ষা অর্জন করে সেই সব দেশেই তারা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। আমাদের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও এই মেধাবী ইঞ্জিনিয়ারদের আমরা কাজে লাগাতে পারলাম না। রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে আমরা তাদের শিক্ষা দিলাম, কিন্তু ফল ভোগ করছে আমেরিকা-ইউরোপসহ পশ্চিম ইউরোপীয় দেশের মানুষেরা। আমরা আমাদের নিজস্ব মেধাসম্পদ কাজে লাগালাম না একেবারেই ইচ্ছা করে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ন্যূনতম বেতনে যদি এই মেধাবী ইঞ্জিনিয়ারদের সরকার কাজের ব্যবস্থা করত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে, তাহলে আমরা আমাদের মেডিকেল কলেজগুলোকে মানসম্পন্নভাবে পরিচালনা করতে পারতাম, হাজার হাজার কোটি টাকা যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হতো মানবসেবায়।

কিছু কিছু অপ্রচলিত বিষয় আছে, খুবই মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা সেইসব বিষয়ে পড়াশোনা করে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছে। আমাদেরই এক বন্ধুর মেয়ে আইআইটি দিল্লি থেকে মলিকুলার বায়োলজিতে পিএইচডি করে এসেছিল। আমাদের এখানে বিভিন্ন গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান আছে, তাকে কাজে লাগানো যেত। মেয়েটি খুবই চেষ্টা করেছিল দেশে কিছু করার জন্য। দুই বছর চেষ্টা করে যখন কিছু পেল না, তখন সে আমেরিকায় চলে গেল। আমেরিকা তাকে লুফে নিল! সে এখন সেখানকার সিনিয়র রিসার্চার হিসেবে খুবই ভালো করছে। আমরা হারালাম এক অমূল্য সম্পদ। এ জাতি বঞ্চিত হলো এই মেধাবী বিজ্ঞানীর সেবা গ্রহণ করতে।

আমাদের দেশেরই এই রকম বহু ক্ষেত্রে বহু মেধাবী বিজ্ঞানী, গবেষক আছেন যাঁরা দেশে থাকতে চান, দেশের সেবা করতে চান। তাঁদের চাহিদা খুব একটা বেশি না। আমাদের শত শত সংসদ সদস্য কি একবারও চিন্তা করেন না, এই সমাজকে টিকিয়ে রাখতে হলে মেধাবী মানুষকে বিভিন্ন সেক্টরে নিয়োগ দিতে হবে? ভাড়া করা গবেষক, বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার দিয়ে জাতিকে বেশি দূর অগ্রসর করানো যায় না। একটা পর্যায় পর্যন্ত চলতে পারে, চিরদিন এভাবে চলতে পারে না। তাঁদের যোগ্যতা আছে কিন্তু কোনো আন্তরিকতা থাকে না। বাইরের দেশ থেকে যেসব ভাড়া করা স্পেশালিস্ট আমাদের দেশে আসেন, তাঁরা কি খুব একটা অন্তর দিয়ে আমাদের সেবা করতে চান? আমি অন্তত তা বিশ্বাস করি না। আমাদের নিজেদের বিশেষজ্ঞরা অবশ্যই মনেপ্রাণে চান তাঁদের নিজ দেশকে উন্নতির শিখরের দিকে পৌঁছানোর, দরকার শুধু তাঁদের জায়গা করে দেওয়া।

বিজ্ঞানের বিস্তারিত বিষয়ে পড়াশোনা করেন অত্যন্ত তুখোড় মেধাবীরা। তাঁদের চাওয়া-পাওয়া আসলেই অনেক কম, তাঁরা লোভী নন, তাঁরা মানবতাবাদী, তাঁরা সমাজসেবী, সমাজসংস্কারক। আসুন, বিভিন্ন বিষয়ের মেধাবী মানুষদের আমরা শ্রদ্ধা করি, এই সমাজে তাঁদের ঠাঁই করে দিই। আমাদের নিজেদের স্বার্থের জন্যই এই মেধাবী মানুষদের আমরা যেন আর অবহেলা না করি, তাঁদের মেধা পাচার হতে না দিই, তাঁদের মেধা যেন আমাদের কাজে লাগে, সমাজের কাজে লাগে, সেই ব্যাপারে সবাই সচেতন হই।

আমরা একটি মেধাবী জাতি চাই। চিন্তাশীল, মুক্তবুদ্ধির, মুক্তমনা সমাজ গড়তে চাই এইসব মেধাবী মুক্তবুদ্ধির মানুষের সমন্বয়ে। মেধা ও যোগ্যতার স্থান সবার ওপরে, মেধাবীদের হাতে ব্যস্ত থাকুক আমাদের সব খাত। গত দু-তিন মাসে যেভাবে হাম মহামারি রূপ ধারণ করছে, মেধাবী দেশপ্রেমিক মানুষ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পদায়িত থাকলে, রোগতত্ত্ব নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় মেধাবী বিজ্ঞানীরা পদায়িত থাকলে দেশের অবস্থা এ রকম হতো না। অন্য পেশার খুবই অযোগ্য একজন উপদেষ্টা প্রধান পদে বসেছিলেন বলে বাস্তবভিত্তিক কোনো চিন্তাভাবনা তাঁর মস্তিষ্ক থেকে আসেনি। জাতি আজকে একটি খাদে পড়ে গেল। তাই মেধাবী মানুষদের যথাযথ স্থানে পদায়ন করাই রাষ্ট্রের কাজ।

লেখক: প্রকৌশলী

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ফেনী ও পঞ্চগড়ের আলোচিত দুই এসপি প্রত্যাহার

৯০ লাখ ভোটার বাদ দিয়ে হারানো হয়েছে তৃণমূলকে, মমতার আবেদনে সাড়া দিলেন আদালত

বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া নির্মাণে ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফকে জমি হস্তান্তর: শুভেন্দু

জঙ্গল সলিমপুরে হবে দুটি পুলিশ একাডেমি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

হাজিরা খাতায় মা উপস্থিত থাকলেও শ্রেণিকক্ষে ক্লাস নেন ছেলে

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত