Ajker Patrika

আলো

সম্পাদকীয়
আলো

আরিফুল ইসলাম ছিলেন লালমনিরহাট টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের প্রভাষক। অধ্যাপনা নিয়েই ব্যস্ত থাকতে পারতেন তিনি। কিন্তু কী কারণে কে জানে, তিনি মাদকবিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়লেন। ‘আলোকিত লালমনিরহাট’ নামে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুললেন। মাদক, জুয়াসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ নিবারণের জন্যই গড়া হয়েছিল সে সংগঠন।

আরিফুল ইসলাম শুরু করেছিলেন নিজ গ্রাম থেকেই। সেই গ্রামে অর্থাৎ গন্ধমরুয়া গ্রামে যারা মাদকের সঙ্গে যুক্ত, যারা অনলাইন জুয়াকে ছড়িয়ে দিচ্ছে, তাদের সতর্ক করে দিয়েছিলেন তিনি। এলাকা হবে মাদকমুক্ত, জুয়ামুক্ত—এ রকম আকাঙ্ক্ষাই ছিল তাঁর। আন্দোলন যখন গড়ে তুলেছেন, তখন সঙ্গেও নিশ্চয়ই পেয়েছিলেন কিছু আলোকিত মানুষ। কিন্তু কে না জানে, সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিমান হয়ে উঠতে পারে অপরাধীরা। মাদক নেওয়া কিংবা মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত হয় যারা, তাদের মতো ভয়ংকর মানুষ কমই আছে। নেশার প্রভাবে তারা যেকোনো তুচ্ছ কারণে মানুষ খুন করতে পারে। একই কথা বলা যায় জুয়ার ব্যাপারীদের ক্ষেত্রে। তারাও হয়ে উঠতে পারে ভয়ংকর। এটাও আরেক ধরনের নেশা। দুধরনের নেশাই শেষ করে দিতে পারে মানুষের জীবন। আরিফুল চেষ্টা করেছিলেন এই মাদকসেবী বা কারবারি কিংবা অনলাইন জুয়াড়িদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু চোরা কি ধর্মের কাহিনি শোনে?

মামলার এজাহারে লেখা হয়েছে, আরিফুল ইসলাম ‘অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত গ্রামের রহিদুল ইসলাম, হাসান আলী, মেহেদী হাসান, পারভেজ, মমিন মিয়া, হৃদয় মিয়াসহ কয়েকজনকে ডেকে জুয়া থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এর পর থেকেই তাঁর ওপর ক্ষোভ তৈরি হয়।’ তারই পরিণতিতে ‘১ আগস্ট কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে আরিফুলের ওপর দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় রহিদুলের নেতৃত্বাধীন একটি দল। পরে স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে নিয়ে যান।’ আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু বিভিন্ন হাসপাতালে টানা ২১ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে অবশেষে তিনি মারা যান। ৬ আগস্ট আরিফুল একটি ছেলেসন্তানের বাবা হন। কিন্তু সন্তানকে দেখে যাওয়ার সৌভাগ্য তাঁর হয়নি।

আরিফুলের মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী অভিযুক্তদের বাড়িতে ভাঙচুর চালায়, অগ্নিসংযোগ করে। পুলিশ বিষয়টির দিকে নজর রাখছে।

আরিফুল আলো জ্বালাতে চেয়েছিলেন সমাজে, অথচ তাঁর জীবনের আলোই নিভিয়ে দিল দুর্বৃত্তরা। এই অন্ধকার বড় বেদনাদায়ক, বড় মর্মান্তিক। আমরা গতানুগতিক ধারায় শুধু এই ঘটনার নিন্দা জানাব না। আমরা জানতে চাইব, মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে কথা বলার সময় পাড়ার অভিভাবকেরা কোথায় থাকেন? একসময় সমাজের শক্তি হিসেবে তাঁরাই বিবেচিত হতেন। এখন বখাটেরাই বরং তাঁদের ওপর খোদকারি করে বেড়ায়। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ একজোট হয়ে সমাজের কুলাঙ্গারদের প্রতিরোধ না করলে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে এই অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়া যাবে না।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত