‘কবিতা’ পত্রিকা প্রকাশের পরে সম্পাদক বুদ্ধদেব বসুকে লেখা এক চিঠিতে নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘তোমাদের কবিতা পত্রিকাটি পড়ে বিশেষ আনন্দ পেয়েছি। এর প্রায় প্রত্যেকটি রচনার মধ্যেই বৈশিষ্ট্য আছে। সাহিত্য-বারোয়ারির দল-বাঁধা লেখার মতো হয়নি।’ এরপর তিনি পত্রিকার ওই সংখ্যায় প্রকাশিত সমর সেনের কবিতা সম্পর্কে বলেন, ‘সমর সেনের কবিতা কয়টিতে গদ্যের রূঢ়তার ভিতর দিয়ে কাব্যের লাবণ্য প্রকাশ পেয়েছে। সাহিত্যে এঁর লেখা ট্যাঁকসই হবে বলেই বোধ হচ্ছে’ (৩ অক্টোবর ১৯৩৫)। রবীন্দ্রনাথের সেই ভবিষ্যদ্বাণী শেষ পর্যন্ত সত্যি হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সমর সেন নিজেই সাহিত্যের সেই ‘মধ্যমাঠ’ থেকে স্বেচ্ছায় নিজেকে গুটিয়ে নেন—১৯৩৪ থেকে ১৯৪৬—মোটামুটি এই ১২ বছর তিনি কাব্যচর্চা করেছেন। এরপর বলা যায় অন্য জগতে বসতি গড়েন।
সমর সেনের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, কখনো তিনি দিল্লিতে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে চাকুরি, কখনো কলকাতায় দৈনিক পত্রিকায়; কখনো মস্কোতে অনুবাদকের কাজ, আবার কখনো তিনি কলকাতায় ইংরেজি সাপ্তাহিকের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। বিচিত্র পেশায় নিয়োজিত থাকা এবং পেশাবদল তাঁর জীবনে একটি স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। এ প্রশ্ন তো এখন উঠতেই পারে যে এসবের সঙ্গে সাহিত্যচর্চার দ্বন্দ্বটা কোথায়?
দ্বন্দ্ব হয়তো তেমনটা নেই, তবে আমরা দেখতে পাই যে সমর সেনের নিজের মধ্যেই রাজনৈতিক, বিশেষ করে মতাদর্শগত নির্দিষ্ট কিছু ‘ছক না-মেলাতে’ পারা নিয়ে এক ধরনের নৈতিক সংকট সেই চল্লিশের দশকেই হাজির হয়েছিল। এ সম্পর্কে অনেকটা বিরতি নিয়ে দীর্ঘদিন বাদে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘১৯৪১-এর ২২শে জুন হিটলার রাশিয়া আক্রমণ করাতে “সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ” রাতারাতি “জনযুদ্ধে” পরিণত হ’ল। ব্যাপারটা ছকে ফেলতে বিশেষ বেগ পেতে হয়েছিল।’ তারপরই বলছেন, ‘১৯৪৪-এর জুন মাসে মিত্রশক্তিরা পশ্চিম ইউরোপে দ্বিতীয় ফ্রন্ট খোলাতে বিবেক হালকা হয়ে গেল, সরকারি চাকরি নিয়ে রেডিও-র সংবাদ বিভাগে ঢুকলাম। সংবাদের চাপে, দেশের দাঙ্গাহাঙ্গামায় আস্তে-আস্তে কবিতা লেখা বন্ধ হয়ে এলো, ছক মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছিল।’
আমরা বুঝতে পারি যে যেনতেনভাবে একটা জোড়াতালি-দেওয়া জীবন কাটাতে তাঁর বরাবরই আপত্তি ছিল। এ প্রসঙ্গে দীপেন্দু চক্রবর্তী তাঁর একটি লেখায় বলেছিলেন, ‘সমরবাবু যে শুধুই বড় বড় চাকুরি ছেড়েছেন তাই নয়, বামপন্থী সাংবাদিক হিসেবেও আত্মপ্রচারের বড় বড় সুযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। এদিক থেকে তিনি প্রায় অদ্বিতীয় বিখ্যাত বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে। যে পেশাগত স্বার্থে তাবড়-তাবড় মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবীদের আপস প্রায় প্রাত্যহিত ব্যাপার, তিনি সেই ক্ষেত্রেই বিদ্রোহী হয়ে দেখিয়ে গেছেন শ্রেণিত্যাগ পুরোপুরি সম্ভব না হলেও স্বশ্রেণির বিরুদ্ধে রুজি-রোজগারের ক্ষেত্রেই রুখে দাঁড়ানো যায় এককভাবে।’ কথাটা বলা যায়, পুরোপুরি যৌক্তিক। আবার এ-ও ঠিক যে সমর সেনের সেই রুখে-দাঁড়ানোর ব্যাপারটি অনেকের কাছেই ঠিক পছন্দসই ছিল না।
এই অপছন্দের ব্যাপারটি আমরা পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ একটি বামপন্থী পার্টির বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে নানাভাবে দেখতে পেয়েছি। আবার সমর সেন নিজেও পশ্চিমবঙ্গের তথাকথিত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের কর্মতৎপরতায়, রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংকটে তাঁদের ভূমিকায় রীতিমতো অসন্তুষ্ট এবং সমালোচনামুখর ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংকটে ‘সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন...চাষী মজুরেরা, যাদের কাছে বুদ্ধিজীবীদের বার্তা পৌঁছয় না।’ সেই সঙ্গে তিনি এটিও বিশ্বাস করতেন যে ভোটের মাধ্যমে বাস্তবে কোনো ‘বিপ্লব সাধিত হয় না। তার জন্য অন্য পন্থা দরকার।’ সেই পন্থা যে ঠিক কী ধরনের হতে পারে, সেই বিষয়েও তিনি কখনো আড়ে-আড়ে কথা বলেননি, যা বলার প্রকাশ্যেই বলেছেন।
একটি স্মৃতিচারণামূলক গদ্যে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘দিনকাল ছিল উত্তেজনায় ভরা। ১৯৬৮-তে চারদিকে গরম হাওয়া, দেশে ও বিদেশে। দেশে নকশালবাড়ি আন্দোলন নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।’ এরপরই সোজাসাপ্টা বলেছেন, ‘অনেকেই ভুলে গিয়েছেন যে খুনোখুনি প্রথম শুরু হয় ফ্রন্ট সরকারের শরিকদের মধ্যে, “ক্ষমতাবিস্তারের সংগ্রামে”। তারপর শুরু হয় নকশালপন্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষ। জ্যোতিবাবু, প্রমোদবাবু নিহত মার্কসবাদীদের কথা এখনো কথায়-কথায় বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে জ্যোতিবাবুর জানা উচিত যে একজন মার্কসবাদী নিহত হলে অন্তত চারজন নকশালপন্থী খতম হতেন। থানা পুলিশ তাঁর হাতে ছিল, ওখানে নকশালপন্থীদের যাবার কোনো উপায় ছিল না।’
সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী হিসেবে সমর সেনের এইসব সত্যভাষণ তাঁর বিরোধী পক্ষের কিছু মানুষও অন্তত মৌখিকভাবে হলেও স্বীকার করতেন। সিপিআইএমপন্থী বুদ্ধিজীবী অশোক মিত্র যেমন বলেছিলেন, ‘বর্তমানে যে রাজনৈতিক, সামাজিক, বিচারগত অস্থিরতা তথা মানহীনতা ভারতবর্ষের প্রধান লক্ষণ, সেটা সাময়িক, আমার ধারণা এই বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের মধ্য থেকেই নতুন-কিছু নিয়মকলা আসবে, সেই নিয়মকলার নিরিখেই সমর সেনের সাংবাদিকতার ভূমিকার পুনর্মূল্যায়ন হবে।’
বলা যায়, কী সাহিত্যে, কী রাজনৈতিক মতাদর্শে, কী জীবন-জীবিকায়—আমৃত্যু আপসহীন রয়ে গিয়েছিলেন সমর সেন। সত্তরের দশকের শেষ পর্যায়ে লেখা একটা গদ্যে তিনি বলেন, ‘অধুনা বেঁচে থাকার কী মানে অনেক সময় বুঝতে পারি না। যে পার্টিতে বিশ্বাস ছিল সেটি খণ্ডবিক্ষিপ্ত, অনেককে মারা হয়েছে নৃশংসভাবে, অনেকে কারাগারে, মাও সে-তুঙের দীর্ঘ যাত্রা শেষ। যদি বলেন সি.পি.এম. নতুন পশ্চিমবঙ্গ গড়ে তুলবে সেই আশায় থাকুন, সে গুড়ে বালি।...এই বিশাল দেশে আমূল পরিবর্তন কবে এবং কীভাবে হবে...পরম ব্রহ্ম পর্যন্ত জানেন না।’
এই হতাশা সমর সেনের মধ্যে ছিল এবং সেইটিই তো স্বাভাবিক। কিন্তু হতাশাকে নিজের চেতনায়, কর্মে কোনোভাবেই জেঁকে বসতে দেননি। একজন সত্যিকারের প্রগতিবাদী বুদ্ধিজীবীর সেইটিই প্রধান একটি লক্ষণ।
১৯৮৭ সালের ২৩ আগস্ট সমর সেন প্রয়াত হন। তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই আমাদের শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা।
লেখক: অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম দেশের বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞ। বর্তমানে তিনি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল অনুষদের ডিন। তিনি কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টাও।
২৬ মিনিট আগে
বরগুনার মানুষ আনন্দে হাসবে নাকি দুঃখে কাঁদবে, তা ঠিক করার ভার তাদেরই দেওয়া উচিত। অথবা হাসি-কান্না বাদ দিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে থাকাটা নিরাপদ কি না, সেটাও তারা ভেবে দেখতে পারে। আচ্ছা, ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়’ শব্দটি কি এখনো বাংলা ভাষায় আছে?
৩৫ মিনিট আগে
ঢাকার অভিজাত এলাকার এক আধুনিক বাড়িতে একটি হারিকেন দেখতে পাই। হারিকেনটি দেখতে বেশ সুন্দর ছিল। হারিকেন তো দুটি কাজে লাগে। একটি হচ্ছে লোডশেডিংয়ের সময় আলো দেয়, আরেকটি হচ্ছে মশা থেকে রক্ষা করে। দুটি জলজ্যান্ত সমস্যা এ সময়ের। একটি বিদ্যুৎ, অন্যটি মশা। দুটি সমস্যারই একটা উপসংহার হয়ে গেছে।
১ দিন আগে
আমাদের দেশে গরমকালে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে, এটা নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু প্রতিবছর গরম এলেই যদি মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হয়, তাহলে প্রশ্ন হলো, সমস্যাটি কি শুধু বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়া, নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি?
১ দিন আগে