Ajker Patrika

কতটুকু ইলেকশন, কতটুকু সিলেকশন

প্রতিটা ব্যালট পেপারে রাষ্ট্রপতি প্রার্থীদের নাম থাকবে। এমপি সাহেবরা সেই ব্যালট পেপারে ভোট দেবেন, তারপর সেই পেপারেই নিজের পরিচিতি লিখে স্বাক্ষর করবেন। অর্থাৎ কে কাকে ভোট দিলেন, সেটা আর গোপন থাকবে না। সবাই জানতে পারবেন। তাহলে ব্যালট পেপার, সিইসিকে রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ, সংসদ ভবনে নির্বাচন অনুষ্ঠান—এত নাটকের দরকারটাই-বা কী?

মাসুদ কামাল
কতটুকু ইলেকশন, কতটুকু সিলেকশন
রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বেশির ভাগ মানুষের কাছেই পছন্দের একজন। ছবি: পিআইডি

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। দেশের বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি সম্ভবত বেশির ভাগ মানুষের কাছেই পছন্দের একজন মানুষ। সেভাবে দেখলে বঙ্গভবন একজন যোগ্য অভিভাবকই পেয়েছে। পূর্ববর্তী রাষ্ট্রপতিদের সঙ্গে তুলনা করলে আমার বিবেচনায় বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের পর মির্জা ফখরুলকেই যোগ্যতম মনে হয়। জামায়াত-এনসিপির পক্ষ থেকে এবার রাষ্ট্রপতি পদের জন্য কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী করা হয়েছিল। তিনি হেরে গেছেন বিপুল ভোটের ব্যবধানে। নিজেদের প্রার্থীর এমন ভরাডুবির পরও, মির্জা ফখরুলকে নিয়ে জামায়াত-এনসিপিও যে খুব একটা মন খারাপ করবে, তা আমার মনে হয় না। একজন নিপাট ভদ্রলোক হিসেবে রাজনৈতিক অঙ্গনেও তাঁর পরিচিতি রয়েছে।

এমন একজন যোগ্য লোক রাষ্ট্রপতি হওয়া সত্ত্বেও যে প্রক্রিয়ায় তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন, তা নিয়ে কিছু প্রশ্ন রয়েছে। আরও সরাসরি বললে—‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচন’ বলতে আমাদের দেশে যা চলে, তাকে কি আদৌ কোনো নির্বাচন বলা যায়? ইলেকশন আর সিলেকশনের মধ্যে একটা মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ইলেকশন বা নির্বাচন হচ্ছে এমন একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, যেখানে একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং নির্দিষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন ভোটাররা গোপন ব্যালট বা ভোটের মাধ্যমে তাঁদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। নির্বাচনের মূল শর্তটাই হচ্ছে, এখানে ভোট বা মতামত দেওয়া হবে গোপনে। কেউ জানবেন না অন্যজন কাকে ভোট দিয়েছেন। ফলে এতে ফলাফলের একটি অনিশ্চয়তা থাকে। মির্জা ফখরুলের নির্বাচিত হওয়া নিয়ে কি কোনো অনিশ্চয়তা ছিল? ছিল না। যে মুহূর্তে বিএনপি তাঁকে মনোনীত করেছে, তখনই সবাই জানত—তিনি রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন।

তবে একটা হালকা চিন্তা কিন্তু ছিল। অনেকে এমনও বলেছেন, বাধ্যবাধকতা না থাকলে অলি আহমদও বিএনপির অনেক এমপির ভোট পেতে পারতেন। অলি আহমদ বিএনপি ঘরানারই লোক। দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতি করেছেন। মেজর জেনারেল জিয়া যখন বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন, তখন থেকেই তিনি বিএনপিতে। এমনকি জিয়া যখন মুক্তিযুদ্ধে যান, তখনো অলি আহমদ ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচর। সেই হিসেবে তাঁর সঙ্গে বিএনপির অনেক নেতা-কর্মীরই সুসম্পর্ক থাকতে পারে। বিএনপি থেকে বের হয়ে এলডিপি গঠন করলেও হাসিনা সরকারের শেষ কয়েক বছর বিএনপির সঙ্গে মিলেই আন্দোলনের মাঠে ছিলেন। কাজেই তাঁদের অনেকের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকাও অস্বাভাবিক কিছু নয়।

সম্ভবত এই ভয়টাই পেয়েছে এবার সরকারি দল। আর সে কারণেই তাঁদের চিফ হুইপ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে বেশ জোরেশোরে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন, বলেছেন—এই নির্বাচনে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর থাকবে। অর্থাৎ দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে কেউ ভোট দিলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়ে যাবে। এই জায়গাটাই আমি বুঝি না। মাঝে মাঝে অনেক আইন আমার কাছে খুবই দুর্বোধ্য লাগে। তার চেয়ে বেশি দুর্বোধ্য মনে হয় জ্ঞানী লোকজনের দেওয়া সেই আইনের ব্যাখ্যা। যেমন ধরা যাক, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আইনটি। সেই সঙ্গে চিফ হুইপের দেওয়া ব্যাখ্যা।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আমাদের সংবিধানে কী বলা হয়েছে? সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদে বলা আছে—‘বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকিবেন, যিনি আইন অনুযায়ী সংসদ-সদস্যগণ কর্তৃক নির্বাচিত হইবেন।’ এই যে ‘আইন অনুযায়ী’ নির্বাচিত হওয়ার কথা, এর অর্থ কী? তাহলে পুরো আইনটি বরং দেখা যাক। ১৯৯১ সালের এ-সংক্রান্ত আইনে বলা হয়েছে—‘রাষ্ট্রপতি সংসদ-সদস্যগণের প্রকাশ্য ভোটে নির্বাচিত হইবেন।’ এই জায়গাটা নিয়েই যত কথা। ‘প্রকাশ্য ভোট’ বলতে কী বোঝায়? সবার সামনে ভোট দেবেন? নাকি সবাইকে দেখিয়ে ভোট দেবেন? সবাইকে দেখিয়ে দিলে সেটা ‘ভোট’ হয় কীভাবে? নির্বাচন হয় কীভাবে?

এই নির্বাচন পদ্ধতিটা বড় অদ্ভুত। সংসদ সদস্যগণ কিন্তু হাত তুলে প্রকাশ্যে ভোট দেবেন না। বরং তাঁরা ব্যালট পেপারে ভোট দেবেন। প্রতিটা ব্যালট পেপারে রাষ্ট্রপতি প্রার্থীদের নাম থাকবে। এমপি সাহেবরা সেই ব্যালট পেপারে ভোট দেবেন, তারপর সেই পেপারেই নিজের পরিচিতি লিখে স্বাক্ষর করবেন। অর্থাৎ কে কাকে ভোট দিলেন, সেটা আর গোপন থাকবে না। সবাই জানতে পারবেন। তাহলে ব্যালট পেপার, সিইসিকে রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ, সংসদ ভবনে নির্বাচন অনুষ্ঠান—এত নাটকের দরকারটাই-বা কী? হাত তুলে বলে দিলেই তো হয়! সেই সঙ্গে এটাকে গালভরা ‘নির্বাচন’ নামকরণই-বা কেন?

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল মিলে একটা ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ তৈরি করেছিল। সেখানে এই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কীভাবে হবে সে সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেখানে কিন্তু ‘সংসদ সদস্যদের গোপন ভোটে’ নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি—সবাই সেই সিদ্ধান্তে একমত পর্যন্ত হয়েছে। সেই যে একমত হওয়া, তার প্রতিফলন কোথায়? বিএনপি হয়তো বলবে, জুলাই সনদ তো বাস্তবায়িত হয়নি, তাই সে অনুযায়ী এখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা যাচ্ছে না। তাহলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করেই তারপর এই কাজগুলো করলেই হতো। তা না করে তড়িঘড়ি করা কেন? আগের রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের মেয়াদ তো ছিলই। ছয় মাস যখন তাঁকে সহ্য করা গেল, আর কটা দিন অপেক্ষা করাই যেত। তাহলে কি জুলাই সনদে বিএনপির সম্মতি কেবলই ‘লোকদেখানো’ ব্যাপার ছিল। বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতার কথায় সে রকম ধারণা জাতি এরই মধ্যে পেয়েছে। তারা জানিয়েছে, কেবল জাতীয় নির্বাচন যাতে আর না পিছিয়ে যায়, সে জন্যই তারা নাকি তখন সবকিছুতে রাজি হয়েছে! কী ভয়ংকর আত্মস্বীকৃতি! নির্বাচনের সময় বিএনপি ৩১ দফা নিয়ে জনগণের কাছে গেছে, বেশ অনেক অঙ্গীকার করেছে। এর মধ্যে কোনটি কোনটি কেবল জয় পেতে করেছে, তা নিয়েই মানুষের মধ্যে এখন সন্দেহ দেখা দিতে পারে। কারণ মানুষ এরই মধ্যে দেখতে পাচ্ছে, জুলাই সনদে যে ক্ষেত্রে পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে, তার অনেক জায়গাতেই সম্ভাব্য পরিবর্তনকে এড়িয়ে আগের নিয়মেই কাজ করা হচ্ছে। অর্থাৎ, চব্বিশের সেই জুলাই আন্দোলনকে বিএনপি যেন একটা নিছক সরকার পরিবর্তনের আন্দোলনে পরিণত করতে উঠেপড়ে লেগেছে।

এবার বরং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এর প্রয়োগ নিয়ে দুটি কথা বলি। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে—‘কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি- (ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে।’ এখান অনুচ্ছেদের (খ) ধারাটি খেয়াল করুন। ‘সংসদে দলের পক্ষে বা বিপক্ষে’ ভোট দেওয়ার বিষয়টা আসলে কী? সংসদে যখন কোনো বিল উত্থাপন হয়, তখন তার পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দেওয়াকেই এখানে বোঝানো হয়েছে। তাহলে এটাকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটদানের সঙ্গে কেন মেলানো হলো? ২০ আগস্ট নির্বাচন হলো, তখন কি জাতীয় সংসদের কোনো অধিবেশন চলছিল? উত্তর হচ্ছে—না, চলছিল না। তাহলে যখন অধিবেশন চলে না, তখন সংসদে ভোট দেওয়া, না দেওয়ার প্রশ্নটাই-বা আসে কীভাবে? এ ক্ষেত্রে বরং এই সংসদের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার কথা ও আচরণের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি এই নির্বাচনে ভোট দেননি। তাঁর মতে, যে নির্বাচনে কোনো অনিশ্চয়তা থাকে না, তাকে প্রকৃত নির্বাচন বলা যায় না। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কারণে এই ভোটের ফলাফল কী হতে যাচ্ছে, তা আগে থেকেই সবার জানা ছিল। তাই এটি কোনো নির্বাচন নয়, বরং একধরনের ‘মনোনয়ন’মাত্র।

রুমিন ফারহানার এমন বক্তব্যের জবাব কি আছে কোনো? আসলে পুরো বিষয়টিই অস্পষ্ট এবং দুর্বোধ্য। তাই এ রকম ‘প্রকাশ্য ভোট’, ৭০ অনুচ্ছেদের সদম্ভ উপস্থিতি, হুইপের হুমকি—এত এত বিষয় যখন একত্র হয়ে যায়, তখন সেই ‘নির্বাচন’ নিয়ে, নির্বাচনে জয় নিয়ে গর্ব দূরে থাক, উচ্চারণেই কেমন যেন অস্বস্তি থাকে।

দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী রাজনৈতিক দল কেন সে রকম একটা অস্বস্তিকে আলিঙ্গন করল—বুঝতে পারি না।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত