Ajker Patrika

বিএডিসির ৬৫ বছরের অভিযাত্রা: কৃষকের মাঠ থেকে মানুষের পাতে

তাহমিনা
বিএডিসির ৬৫ বছরের অভিযাত্রা: কৃষকের মাঠ থেকে মানুষের পাতে
ফাইল ছবি

একটি ধানের শিষের গল্প আসলে শুধু একটি শস্যের গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি ভালো বীজের গল্প, সঠিক সময়ে সেচ পাওয়ার গল্প, প্রয়োজনীয় সার পাওয়ার গল্প, কৃষকের নিরলস শ্রম এবং সর্বোপরি একটি জাতির খাদ্য নিরাপত্তার গল্প। ধানের শিষটি যখন কৃষকের মাঠে দুলতে থাকে তখন তার পেছনে কাজ করে যায় বহু প্রতিষ্ঠানের নীরব প্রচেষ্টা। সেই নেপথ্যের অন্যতম কান্ডারি হলো বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)।

কাকতালীয়ভাবে নয়, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন এর জন্ম হয়েছিল এক ঐতিহাসিক দিনে, ১৬ অক্টোবর ১৯৬১। জাতিসংঘ ঘোষিত বিশ্ব খাদ্য দিবসও ১৬ অক্টোবর। খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন ও রক্ষার্থে বিএডিসির কার্যক্রম যেন একই সূত্রে গাঁথা। উদ্দেশ্য একই, শুধু পরিধি ভিন্ন। ১৬ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব খাদ্য দিবস। ফলে দিনটি বিএডিসির জন্য শুধু প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন নয়; কৃষি, খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার বৃহত্তর অঙ্গীকার স্মরণ করারও একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন।

১৯৬১ সালে যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে বিএডিসি যাত্রা শুরু করে, ৬৫ বছরে এসে তা এখন বহুমাত্রিকতায় বিস্তৃত। বিএডিসি দেশের কৃষি উন্নয়নে একটি বহুমুখী সেবা প্রদানকারী সংস্থা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। সংস্থাটি মানসম্মত বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ, সেচ সুবিধা প্রদান ও সম্প্রসারণ, মানসম্মত সার আমদানি ও বিতরণ কার্যক্রমের মাধ্যমে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। প্রতিষ্ঠার সময় দেশের কৃষি ছিল নানা সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ। উন্নতমানের বীজের স্বল্পতা, সেচের সীমিত সুযোগ, কৃষি উপকরণের অপ্রতুলতা কৃষি উৎপাদনের পথে বড় বাধা ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের কৃষি চাহিদা যেমন বেড়েছে, তেমনি পরিবর্তিত হয়েছে কৃষির ধরন, আর এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের কার্যক্রমকে সামঞ্জস্য করে কৃষকের পাশে থেকেছে বিএডিসি।

বীজে স্বনির্ভরতায় অন্যতম সহযাত্রী

১৯৬২-৬৩ সালে বিএডিসি প্রায় ১৩ দশমিক ৮ টন বীজ সরবরাহের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করে। ক্রমান্বয়ে বিএডিসির বীজ উৎপাদন ও সরবরাহের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। উল্লেখ্য ২০২৫-২৬ সালে বিএডিসি কর্তৃক ধান, গম, ভুট্টা, আলু, পাট, ডাল, মসলা, সবজি ও তৈলবীজসহ বিভিন্ন ফসলের ১ দশমিক ৪৪ লাখ টন বীজ উৎপাদন এবং ১ দশমিক ৪৭ লাখ টন বীজ কৃষক পর্যায়ে বিতরণ করা হয়েছে। মানসম্মত বীজ ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির অন্যতম উপকরণ।

উন্নতমানের বীজ উৎপাদন ও কৃষক পর্যায়ে বিতরণের লক্ষ্যে বিএডিসির রয়েছে নিজস্ব ৩৪টি বীজ উৎপাদন খামার, ১০টি উদ্যান উন্নয়ন কেন্দ্র, ১৪টি এগ্রোসার্ভিস সেন্টার, ৯২টি চুক্তিবদ্ধ চাষি জোন, ৬৫ টি বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, ৩০টি আলুবীজ হিমাগার,৮টি টিস্যু কালচার ল্যাব এবং ১০০টি বীজ বিক্রয় কেন্দ্র। বিএডিসির বিভিন্ন চুক্তিবদ্ধ চাষি জোনে ১ লাখ ৫ হাজার ৭৭৫ জন চুক্তিবদ্ধ চাষি রয়েছে, যারা বিএডিসির বীজ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে মানসম্মত বীজ উৎপাদন করে বিএডিসির কাছে তা সরবরাহ করে যাচ্ছে। গবেষণা সেলের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৪০টি উচ্চফলনশীল এবং সম্ভাবনাময় ফসলের জাত বিএডিসির নামে নিবন্ধন করা হয়েছে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের চরম প্রভাব মোকাবিলায় প্রতিকূলতাসহিষ্ণু তথা লবণাক্ত, খরা ও জলমগ্নসহিষ্ণু জাতের বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ এবং সরবরাহের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সেচ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা

১৯৬১-৬২ সালে ১৫৫৫টি শক্তিচালিত পাম্পের মাধ্যমে বিএডিসি কর্তৃক দেশে আধুনিক সেচ ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ব্যবস্থার প্রচলন ঘটে। বাংলাদেশের কৃষিতে সেচের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে সেচ নির্ভর চাষাবাদ দেশের খাদ্য উৎপাদন স্থিতিশীল রাখতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বর্তমানে পানি সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তি, ভূউপরিস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি করে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানোর মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং সেচ ব্যয় হ্রাসের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

এ ছাড়া জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, খাল পুনঃখনন, ভূউপরিস্থ ও ভূগর্ভস্থ সেচনালা নির্মাণ, ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ, সেচ অবকাঠামো নির্মাণ, শক্তিচালিত পাম্প স্থাপন, গভীর নলকূপ পুনর্বাসন, পাহাড়ি এলাকায় ঝিরিবাঁধ নির্মাণ এবং সৌরবিদ্যুৎ চালিত পাম্প ও ডাগওয়েল স্থাপন কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। বিভিন্ন প্রকল্পের বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২২০০০ হেক্টর জমি সেচ সুবিধা ও সেচ সম্প্রসারণ করা হয়েছে। তা ছাড়া আলোচ্য অর্থবছরে ৮২০ কিলোমিটার খাল খনন/পুনঃখনন, ৬৬২টি সেচ অবকাঠামো নির্মাণ, ৪৯ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ, ১৬১টি সোলার সেচ পাম্প স্থাপন, ৫০টি পলিশেড নির্মাণ, ৪৭৮টি রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং এবং ১৩০ হেক্টর জলাবদ্ধতা দূরীকরণ করা হয়েছে।

সার ব্যবস্থাপনার সাফল্যে বিএডিসি

কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে বীজ ও সেচের পাশাপাশি সার ব্যবস্থাপনাও নিবিড়ভাবে জড়িত। কৃষি উৎপাদনের অন্যতম উপকরণ সার। ১৯৬০-৬১ সাল থেকে বিএডিসি কৃষকদের নিকট সার বিক্রি, ব্যবহারে উদ্বুদ্ধকরণ এবং প্রশিক্ষণ প্রদানের কাজ শুরু করে। ১৯৬২-৬৩ সালে প্রায় ৫০ হাজার টন সার কৃষক পর্যায়ে বিতরণ করা হয়। বিএডিসির মাধ্যমে তখন থেকে সারা দেশে থানাভিত্তিক সার বিক্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে সার বিপণন কার্যক্রম চালু করা হয়। বর্তমানে বিএডিসি কর্তৃক ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি) নন-ইউরিয়া সার আমদানি করা হয়েছে ২৬ দশমিক ২৭ লাখ টন এবং সার বিতরণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪ দশমিক ১ লাখ টন।

উল্লেখ্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সারা দেশে বিএডিসি জাতীয় চাহিদার বিপরীতে ৭৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ নন-ইউরিয়া সার সরবরাহ করেছে।

বিএডিসি মূলত রাষ্ট্রীয় চুক্তির আওতায় নন ইউরিয়া সার আমদানি করে থাকে। বর্তমানে বিএডিসি রাষ্ট্রীয় চুক্তির আওতায় তিউনিসিয়া ও মরক্কো হতে টিএসপি, মরক্কো, সৌদি আরব ও চীন হতে ডিএপি এবং রাশিয়া ও কানাডা হতে এমওপি সার আমদানি করা হচ্ছে। নন ইউরিয়া সারের নিরাপত্তা মজুত গড়ে তুলতে সরকারের নির্দেশনায় রাষ্ট্রীয় চুক্তির আওতায় বিএডিসি কার্যকর ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে বিএডিসির দেশব্যাপী ২১টি অঞ্চলের ৬৪ জেলার ৫০টি বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে ১৪৮টি সার গুদাম হতে প্রায় ১০ হাজার ৮১৫ জন ডিলারের মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে নন-ইউরিয়া সার সরবরাহ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বিএডিসির সার গুদামের আদর্শ ধারণক্ষমতা ২ লাখ ৯৪ হাজার ৮৩৩ টন। গুদামের ধারণক্ষমতা কার্যকরভাবে বৃদ্ধির লক্ষ্যে আরও নানা ধরনের পদক্ষেপ চলমান রয়েছে। সার ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম বিএডিসির মাধ্যমে সম্পাদিত হওয়ায় কৃষকেরা যথাসময়ে সরকার নির্ধারিত মূল্যে মানসম্পন্ন সার প্রাপ্তিতে সক্ষম হচ্ছে।

বিশেষ উদ্যোগে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার

খাল খনন/পুনঃখনন

ভূ-উপরিস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেচপদ্ধতি হলো সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা বিদ্যমান খাল-নালা পুনঃ: খননপূর্বক পানির প্রবাহ চলমান রাখা। এ ক্ষেত্রে বিএডিসির রয়েছে এক উজ্জ্বল ও গৌরবান্বিত ইতিহাস। বিষয়টি গুরুত্বের সহিত প্রাধান্য দিয়ে সরকার সারা দেশে পাঁচ বছরে ২০,০০০ কিলোমিটার খাল-নালা পুনঃখননের মহাপরিকল্পনায় গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে ৯ হাজার কিলোমিটার খাল-নালা পুনঃখননের দায়িত্ব বিএডিসির অনুকূলে ন্যস্ত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে এর অংশ হিসেবে বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৮২০ কিলোমিটার খাল-নালা পুনঃখননের কাজটি সম্পাদিত হয়েছে। খাল খননের ফলে ভূ-উপরিস্থ পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধি, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, পতিত জমি আবাদি জমিতে রূপান্তর, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং সর্বোপরি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পাবে।

সোলার সেচ পাম্প স্থাপন

বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে সেচ একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। সেচ ব্যবস্থায় জ্বালানি ব্যয় কমানো, বিদ্যুৎ ও ডিজেলের ওপর নির্ভরতা হ্রাস এবং কৃষকের জন্য নিরবচ্ছিন্ন সেচ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বিএডিসি কৃষিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ লক্ষ্যে ‘নবায়নযোগ্য সৌরশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যমান সেচযন্ত্র সমূহকে সৌরশক্তি চালিত সেচযন্ত্রে রূপান্তরকরণ প্রকল্প’ প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। সরকারের এ মহাপরিকল্পনাটি দেশের মোট ৮টি বিভাগের ৫৬টি জেলার ৩৪৯টি উপজেলা জুড়ে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পের আওতায় বিএডিসি কর্তৃক বিদ্যমান ৫০ হাজার ৯০০টি ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রকে সোলার সেচযন্ত্রে রূপান্তর করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রতিদিন ৩৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। তার মধ্যে ২৫ হাজার সেচযন্ত্র নেট মিটারিং পদ্ধতিতে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হবে। ফলে বার্ষিক প্রায় ১৭৬ দশমিক ৪০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।

পলিশেডে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কৃষি

আধুনিক ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিএডিসি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে নিরাপদ ও রপ্তানিযোগ্য কৃষিপণ্য উৎপাদনে পলিশেড নির্মাণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। সারা দেশে এ পর্যন্ত ৮২টি পলিশেড নির্মাণ করা হয়েছে এবং জুন ২০২৮-এর মধ্যে আরও ৬০টি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রচণ্ড ঠান্ডা, অধিক তাপ কিংবা অতিবৃষ্টির মতো প্রতিকূল আবহাওয়াতেও পলিশেডে চারা উৎপাদন অব্যাহত থাকায় কৃষকের চারা উৎপাদন ঝুঁকি কমছে। ফলে বছরব্যাপী উচ্চমূল্যের সবজি, ফল ও ফুল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পলিশেডে পানিসাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়, পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হয় এবং কৃষিকাজে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়। ফলে এটি লাভজনক, টেকসই ও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

পাটবীজে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে

পাট বাংলাদেশের ঐতিহ্য, অর্থনীতি ও কৃষির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের ব্যবহৃত পাট বীজের চাহিদা দেশের অভ্যন্তরেই উৎপাদনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণকল্পে বিএডিসির মাধ্যমে ৪ বছরমেয়াদি একটি সময়ভিত্তিক সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা অনুযায়ী বর্তমানে ২০২৬-২৭ উৎপাদন মৌসুমে ২২১০ টন বীজ উৎপাদনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

২০২৭-২৮ উৎপাদন বর্ষে যথাক্রমে ৩৩০০ এবং ২০২৮-২৯ উৎপাদনবর্ষে ৪৫১০ টন বীজ উৎপাদনের পরিকল্পনাসহ ২০২৯-৩০ উৎপাদন বর্ষ হতে স্থায়ীভাবে ৫ হাজার টন পাট বীজ উৎপাদনের কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে বিদ্যমান পাট বীজ উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশের ১০টি জেলায় পাট বীজ চুক্তিবদ্ধ চাষি জোন স্থাপন করা হবে। একই সঙ্গে বর্ণিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ‘মানসম্পন্ন পাট বীজ উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে আমদানি নির্ভরতা কমাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ডিসেম্বর ২০২৯ পর্যন্ত মেয়াদে অনুমোদনের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

রপ্তানি সম্ভাবনায় ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট

কৃষিপণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও বিএডিসি নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বাষ্পতাপ প্রয়োগের মাধ্যমে আমসহ বিভিন্ন ফল ও সবজি জীবাণুমুক্তকরণ এবং সংরক্ষণকাল (Shelf Life) বৃদ্ধির মাধ্যমে সেগুলোকে রপ্তানি উপযোগী করার জন্য বিএডিসি কর্তৃক ঢাকার গাবতলীতে ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট এবং হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে।

গত ৬ জুলাই এই প্ল্যান্টে বাংলাদেশে প্রথমবারের মত আমের ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট শুরু হয়েছে। প্ল্যান্টে দৈনিক ১২ টন আম ও অন্যান্য সতেজ কৃষিপণ্য ট্রিটমেন্ট করা সম্ভব হবে। এ যাবৎ দেশীয় বাজারের জন্য ৮ হাজার ৬২০ কেজি এবং বিদেশে রপ্তানি করার জন্য ১২ হাজার ৮০ কেজি আম ট্রিটমেন্ট করা হয়েছে। এই প্ল্যান্টে ফল ও সবজি রপ্তানির জন্য ফাইটোসেনিটারি সার্টিফিকেট (পিসি) প্রদান এবং প্যাকেজিং এর সুবিধা রয়েছে। এর ফলে ফল ও সবজি রপ্তানির ক্ষেত্রে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে।

হাইব্রিড ভুট্টাবীজে নতুন সম্ভাবনা

ভুট্টাবীজ সরবরাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মূলত আমদানি নির্ভর। ভুট্টা বীজ সরবরাহের ক্ষেত্রেও বিএডিসি নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। ২০২৫-২৬ মৌসুমে দেশে ভুট্টা বীজের চাহিদা ছিল ১১ হাজার ৪৫৮ টন (কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ-২০২৫)। ২০২৫-২৬ মৌসুমে বিএডিসি স্বল্পমূল্যে দেশের সবচেয়ে উচ্চফলনশীল একটি জাত হাইব্রিড ভুট্টা (বি-৩৩৫৫) বীজ সরবরাহ করেছে। এর ফলে দেশে হাইব্রিড ভুট্টার বীজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয়ভাবে হাইব্রিড ভুট্টার বীজ উৎপাদনের পথ সুগম হবে।

গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজবীজ উৎপাদন

পেঁয়াজ বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান ও অপরিহার্য মসলা জাতীয় ফসল। কৃষকদের নিকট গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ বীজ সরবরাহের ক্ষেত্রে আমদানি নির্ভরতা সম্পূর্ণরূপে কমিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার কর্তৃক দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদনে অত্যধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী তিন অর্থবছরে দেশের ভেতরেই ‍বিএডিসি ১১০ টন গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এরই অংশ হিসেবে চলতি উৎপাদন মৌসুমে বিভিন্ন খামারে ৪০ টন গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ বীজ (এন-৫৩ জাত) উৎপাদনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। যা পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করে ২০৩০-৩১ উৎপাদন বর্ষে ১০০-১১০ টনে উন্নীত করা হবে।

সামনে আরও চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের কৃষি এখন আর শুধু উৎপাদন বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নিরাপদ খাদ্য, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, পানি সাশ্রয়, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ, আধুনিক প্রযুক্তি, কৃষি পণ্যের মানোন্নয়ন এবং বাজার ব্যবস্থাপনা-সবকিছু মিলেই গড়ে উঠেছে ভবিষ্যতের কৃষি। বিএডিসির ছয় দশকেরও বেশি সময়ের পথচলা মূলত বাংলাদেশের কৃষির পরিবর্তনেরই প্রতিচ্ছবি। এক সময় যেখানে খাদ্যঘাটতি ছিল বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে আজ কৃষি উৎপাদনে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে।

এই অগ্রযাত্রায় কৃষক যেমন প্রধান শক্তি, তেমনি কৃষকের প্রয়োজনীয় উপকরণ ও প্রযুক্তি নিশ্চিত করার প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও অনস্বীকার্য। ৬৫ বছরের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বিএডিসির সামনে তাই একদিকে রয়েছে গৌরবময় অতীত, অন্যদিকে রয়েছে আরও বড় দায়িত্বের ভবিষ্যৎ। কৃষকের হাত ধরে মাঠ থেকে মানুষের পাতে খাদ্য পৌঁছানোর এই অবিচ্ছিন্ন ধারাকে আরও সমৃদ্ধ ও টেকসই করতে বিএডিসি তার কার্যক্রমকে সময়ের সঙ্গে আরও আধুনিক ও জনমুখী করে এগিয়ে নিচ্ছে। বীজ, সার ও সেচের মতো মৌলিক কৃষি উপকরণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারের আধুনিক ও স্মার্ট কৃষির ভিত শক্তিশালী করাই আগামী দিনের প্রত্যয়।

কৃষকের হাত শক্তিশালী হলেই আরও সমৃদ্ধ হবে বাংলাদেশ। সেই অগ্রযাত্রায় কৃষকের পাশে থেকে বিএডিসি এগিয়ে যাবে-‘কৃষকের সেবা, কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নতুন প্রত্যয়ে অধিকতর দায়িত্বশীলতা, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার পরিচয় দিয়ে স্ব স্ব ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালনে গুরুত্বারোপ করে যাচ্ছেন বিএডিসির চেয়ারম্যান মো. আজিজুল ইসলাম।

তাহমিনা রচি, যুগ্মপ্রধান, মনিটরিং, বিএডিসি, ঢাকা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত