Ajker Patrika

জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্ন

আল শাহারিয়া
জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্ন
জুলাইয়ের টানা বৃষ্টির পর ঢাকার কাঁচাবাজারে দাম বেড়ে যায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে সুনামগঞ্জের হাওরে যখন কৃষক ধান কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনই উজান থেকে নেমে আসা ঢল আর টানা বৃষ্টিতে সুনামগঞ্জ ও এর আশপাশের প্রায় ৪৬ হাজার হেক্টর বোরো জমি তলিয়ে যায়। জাতীয় চাল উৎপাদনে প্রায় ২ লাখ মেট্রিক টন ঘাটতির শঙ্কা তৈরি হয় সে সময়ই। এই একটা ঘটনা বিচ্ছিন্ন মনে হতে পারে, কিন্তু জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি যৌথভাবে প্রকাশিত ২০২৬ সালের ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস’-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে প্রায় ১ দশমিক ৬ কোটি মানুষ সংকটকালীন বা তার চেয়ে খারাপ পর্যায়ের খাদ্য অনিরাপত্তায় ছিলেন। দুর্ভিক্ষ নেই, বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ খাদ্যসংকটের দেশগুলোর তালিকাতেও বাংলাদেশ নেই। তবু উচ্চ মাত্রার তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় থাকা মানুষের সংখ্যায় বিশ্বের শীর্ষ দশ।

এই সংখ্যাটা প্রথম দেখাতে যতটা উদ্বেগজনক মনে হয়, এর পেছনের প্রেক্ষাপট আরও বৃহৎ। সেই প্রতিবেদন মতে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে, ৭৬ লাখ মানুষ তালিকা থেকে বেরিয়ে এসেছেন। এই উন্নতির পেছনে বড় দুর্যোগের অনুপস্থিতি, খাদ্য মূল্যস্ফীতির কিছুটা হ্রাস আর রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির অবদান আছে। তবে তুলনামূলক ভালো একটা বছরেও, যে বছরে বড় কোনো দুর্যোগ আঘাত হানেনি, বাংলাদেশ তবু বিশ্বের শীর্ষ দশে রয়ে গেছে। তার মানে সমস্যাটা শুধু আকস্মিক বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের না, এর শিকড় অনেক গভীরে, আয়ের অস্থিরতা, ক্রয়ক্ষমতার দুর্বলতা আর জলবায়ুর সঙ্গে সম্পর্কিত কাঠামোগত ঝুঁকির মধ্যে।

জলবায়ু পরিবর্তন এই কাঠামোগত ঝুঁকির একটা কেন্দ্রীয় অংশ, আর তার প্রমাণ পাওয়া যায় এই বছরের বৃষ্টির হিসাবেই। এপ্রিলে বাংলাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়, গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। জুনে ঠিক তার উল্টো চিত্র, স্বাভাবিকের চেয়ে ২৯ শতাংশ কম বৃষ্টি, গত সাত বছরের সর্বনিম্ন, যার প্রভাব সরাসরি পড়ে আমনের বীজতলা তৈরির ওপর। জুলাইয়ে আবার বৃষ্টি বাড়ে স্বাভাবিকের চেয়ে ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ। একই বছরের মধ্যে এই তিনটা বিপরীতমুখী চিত্র কোনো কাকতালীয় ঘটনা না। প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো সক্রিয় হয়ে ওঠাটা এর একটা কারণ, তবে এই এক কারণে পুরো প্রেক্ষাপট এমন হয় না। বরং দীর্ঘমেয়াদি একটা পরিবর্তনের সঙ্গে এল নিনো যুক্ত হয়ে অস্থিরতাকে আরও তীব্র করেছে। পিএলওএস ক্লাইমেটে প্রকাশিত ৩৪ বছরের একটা বিশ্লেষণ দেখাচ্ছে, দেশের কেন্দ্রীয় ও উত্তরাঞ্চলে বর্ষার বৃষ্টি কমছে, অথচ টানা বৃষ্টির দিনের সংখ্যা বাড়ছে।

প্রকৃতির এই অস্বাভাবিক আচরণে সরাসরি ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে কৃষককে। ‘জার্নাল অব ওয়াটার অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ’-এ প্রকাশিত একটা গবেষণা অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অনিয়মিত বৃষ্টির কারণে কৃষকেরা রোপণ ও কাটার উপযুক্ত সময় নির্ধারণ করতে না পারায় ধানের ফলন ১৭ থেকে ১৮ শতাংশ আর গমের ফলন ৩১ থেকে ৬৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। উচ্চ তাপমাত্রার প্রভাব আরও তীব্র, একটা সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় বোরো ধানের ফলন ৩২ শতাংশ পর্যন্ত কমার আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলে এই সংকট আরেকটা স্তর যোগ করে। খুলনা আর সাতক্ষীরার মতো জেলায় মাটির লবণাক্ততা কিছু জায়গায় ৪০ ডিএস পার মিটার পর্যন্ত পৌঁছেছে, দেশের মোট জমির প্রায় ৩০ শতাংশ যেখানে অবস্থিত। ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন আর দুর্বল বেড়িবাঁধের কারণে নোনা পানির বারবার আগ্রাসনে উপকূলের উর্বর পলিমাটি ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির ঘাটতি আর বর্ষায় হঠাৎ বন্যা, এই দুই বিপরীতমুখী চাপ উপকূলীয় কৃষককে দুই দিক থেকে ঘিরে ধরেছে। ফলন কমার এই সংখ্যাগুলো শেষ পর্যন্ত বাজারে গিয়ে ঠেকে। জুলাইয়ের টানা বৃষ্টির পর ঢাকার বাজারে বেগুন, করলা, কাঁচা মরিচের দাম এক সপ্তাহের মধ্যেই বেড়ে যায়, কোথাও কোথাও দ্বিগুণের কাছাকাছি। চালের বাজারও অস্থির থাকে, বোরো মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই কেজিতে দুই থেকে চার টাকা বাড়ে। এই দামের বোঝা সবচেয়ে বেশি বহন করতে হয় যাঁদের আয় সবচেয়ে কম, যাঁদের হাতে বিকল্প কিছু কেনার সামর্থ্য নেই।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটা হয়তো দৃষ্টিভঙ্গিতে দরকার। বন্যা নিয়ন্ত্রণ, লবণাক্ততা ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু সহনশীল বীজ, ফসলবিমা, গুদাম সুবিধা আর পূর্বাভাস ব্যবস্থাকে আলাদা আলাদা উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে না দেখে খাদ্যনিরাপত্তা নীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা দরকার। জলবায়ু অভিযোজন আর খাদ্যনীতি এখন আর আলাদা দুটো ফাইল না, একই সংকটের দুই পিঠ। বৃষ্টির প্যাটার্ন যেভাবে একই বছরের মধ্যে দিক বদলাচ্ছে, লবণাক্ততা যেভাবে উপকূলে বাড়ছে, এসব বিচ্ছিন্ন দুর্যোগ না, বরং নিয়মিত বাস্তবতা হয়ে উঠছে বলেই বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন। এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই এখন ভাবতে হবে কীভাবে তার সঙ্গে মানিয়ে চলা যায়, যাতে একটামাত্র আগাম বন্যা বা একটা লবণাক্ত মৌসুম গোটা বছরের খাদ্যব্যবস্থাকে ভেঙে না দেয়। কিন্তু শুধু মানিয়ে নেওয়াই যথেষ্ট না। বাংলাদেশ যে সংকটের বোঝা বইছে, তার জন্ম মূলত বিশ্বের অন্যত্র, শিল্পোন্নত দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণে, যার সঙ্গে হাওরের কৃষক বা উপকূলের জেলের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। যারা ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে বেশি নিঃসরণ ঘটিয়েছে, তাদের দায় স্বীকার করতে হবে এবং নিঃসরণ প্রকৃত অর্থে কমাতে হবে, শুধু অভিযোজন-তহবিল দিয়ে দায়মুক্তি ঘটবে না।

লেখক: শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত