Ajker Patrika

এমপির মুক্তিযোদ্ধা পরিবার

সম্পাদকীয়
এমপির মুক্তিযোদ্ধা পরিবার

ইতিহাসই একদিন ইতিহাস হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে কোন রাজনৈতিক দল কোন পক্ষ নিয়েছিল, সেটা ইতিহাসের পাতা ওলটালেই দেখা যাবে। এটি কোনো বিতর্কের বিষয় নয়। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী দলের কোনো কোনো সংসদ সদস্য তাঁদের নিজ পরিবারকে মুক্তিযোদ্ধা পরিবার বলার যে মরিয়া চেষ্টা করছেন, তার পেছনের উদ্দেশ্য খোঁজা দরকার। সংসদের মতো জায়গায় দাঁড়িয়ে জামায়াতের একজন সদস্য তাঁদের পরিবারের ৪৭ জন সদস্য মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বলে দাবি করায় স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে।

এ কথা পরিষ্কারভাবে বলা দরকার, ১৯৭১ সালে যদি কোনো রাজনৈতিক দল পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে থাকে, তাহলে সেটা তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হতেই পারে। তাদের মনে হতেই পারে, অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে ইয়াহিয়া সরকার যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, তার প্রয়োজনীয়তা ছিল। এরপর ৯ মাস জুড়েই পাকিস্তানের পক্ষে প্রচারণা চালানোকেও তারা তাদের রাজনৈতিক দর্শন বলে মনে করতে পারে। এগুলো রাজনৈতিক বিষয়। এগুলো নিয়ে বিতর্ক থাকবে, দলগতভাবে অবস্থান নেওয়ার প্রশ্নটি অপরাধের বিষয় নয়। তারা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল বলে মানবাধিকারবিরোধী হিসেবে বিবেচিত হয় না। দলটি সামগ্রিকভাবে রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী তৈরি করে বাঙালি নিধনযজ্ঞে পাকিস্তানিদের সঙ্গে এক হয়ে অংশ নিয়েছিল বলেই তাদের বিচারের দাবি উঠেছিল। হত্যাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন এই দলের অনেক সদস্য। জামায়াত দলটি তাদের শরীর থেকে ১৯৭১ সালের সেই কলঙ্কিত ছাপ উঠিয়ে ফেলতে পারবে না। জামায়াত যদি তাদের একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে জনগণের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা না চায়, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাদের বর্তমান মূল্যায়ন না জানায়, তাহলে তাদের প্রতি জনগণের সন্দেহ-অবিশ্বাস কীভাবে কাটবে? তাদের গোড়ায় যে গলদ, তা থেকে মুক্ত হতে না পারলে বর্তমান ডালপালার চারিত্রিক পরিবর্তন হবে কী করে? ওই প্রশ্নটির ফয়সালা করেই তো তাদের রাজনীতি করতে হবে।

এ কথা সত্য, বর্তমান প্রজন্মের জামায়াত নেতাদের অনেকেই ১৯৭১ সালের জামায়াতের বিতর্কিত ভূমিকার জন্য দায়ী নন। কিন্তু যদি তাঁরা সেই জামায়াতের লিগ্যাসি বহন করে থাকেন, তাহলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রশ্নগুলোর উত্তর তাঁদের দিতেই হবে। সম্ভবত সেই কারণেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নানা রকম কৌশল অবলম্বন করতে গিয়ে জামায়াত নেতারা এমন সব গল্প ফেঁদে বসছেন, যা শুধু হাস্যরসের খোরাকই জোগাচ্ছে না, চিন্তারও কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সংসদে দাঁড়িয়ে কেউ নিজেকে শিশু মুক্তিযোদ্ধা বলে দাবি করছেন, কেউ নিজের সেই বাবাকে মুক্তিযুদ্ধের শহীদ বলে দাবি করছেন, যিনি দিব্যি বেঁচে আছেন।

জাতীয় সংসদ ছেলের হাতের মোয়া নয়। দেশকে ঠিকভাবে পরিচালিত করার জন্যই জনগণ ভোট দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করে থাকে। সংসদ অধিবেশনের জন্য যে অর্থের ব্যয় হয়, তা জনগণের করের টাকা। সে কথা বিবেচনা করে মহান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক পারিবারিক আষাঢ়ে গল্প ফাঁদার এই চর্চা বন্ধ হোক—এটাই কামনা করি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত