Ajker Patrika

জাতীয় নির্বাচনে নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণ কম

স্বপ্না রেজা
জাতীয় নির্বাচনে নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণ কম

বৈষম্যবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের মৌলিক উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া যাবে কি না, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের চিন্তাচেতনায় বড় আকারে প্রশ্নটা এবার থেকেই যাচ্ছে। এই নির্বাচনকে রাষ্ট্র সংস্কারের অন্যতম কৌশল কিংবা পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত বা দাবি করা হলেও, বাস্তবে তার উল্টোটাই দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ কঠিন বৈষম্য থেকেই যাচ্ছে। বলা বাহুল্য, সেটা অতীতের তুলনায় বহুগুণ বেশি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে।

যেটা স্পষ্টত হয়েছে ও হচ্ছে—বর্তমান রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নারী নেতৃত্বকে অবমূল্যায়ন ও অবহেলা করা হয়েছে, নারীদের বেশ পেছনে রাখা হয়েছে; আবার ঠেলে দেওয়া হয়েছে এবং সেটি করা হয়েছে খুব সুপরিকল্পিতভাবে। এই নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে নারী প্রার্থী রাখা হয়েছে খুবই কমসংখ্যক, যেটা চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের চেতনার বিপরীত এবং গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে মোটেও সমর্থন করে না; বরং বৈষম্যের কথা বলে। বৈষম্যবিরোধী যে গণ-অভ্যুত্থান দেশে সংঘটিত হয়েছিল এক সমতাভিত্তিক সমাজব্যবস্থা কায়েম করার লক্ষ্যে এবং সব ধরনের স্বৈরশাসন বিলুপ্ত করার দৃঢ় শপথ পাঠ করে, তা যেন নিমেষে উধাও হয়ে গেছে।

প্রশ্ন জাগবেই-বা না কেন? আজ যে রাজনৈতিক দলগুলো এবং তাদের নেতারা নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় দেশের শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন, তাঁরা চব্বিশের জুলাইকে স্মরণ করলেও এর দুর্বার আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণের কথা ভুলেও উচ্চারণ করেননি। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের সম্মুখসারিতে যে নারীরা ছিলেন, তাঁরা কোনো আলোচনায় নেই, কোথাও নেই।

আমরা দেখেছি, বৈষম্যবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের পর আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের একটা অংশ জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নামক একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে। সহজ সমীকরণে সমাজের বৈষম্যের বিরোধিতা করতে গিয়ে একটা পর্যায়ে তারাও রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে এনসিপি গঠন করে। অথচ সাধারণ মানুষের অনেকের ভাবনায় ছিল, এই তরুণেরা নির্ঘাত পচে যাওয়া রাজনীতির ঊর্ধ্বে অবস্থান করবেন, সততার পরিচয় দেবেন, অতীতের প্রবীণদের ভুলভ্রান্তি সংশোধনে সহায়তা করবেন। আন্দোলনের সময় তাঁদের অভিব্যক্তি ছিল রাষ্ট্রকে সংস্কার করার অভিপ্রায়ে, রাষ্ট্রকে স্বৈরশাসনের কবল থেকে উদ্ধার আকাঙ্ক্ষায় এবং সেটা হওয়ার কথা নারী ও পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়।

কিন্তু জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের আগে আচমকা দেখা গেল দলটির নারী সদস্যদের লাইন ধরে পদত্যাগ করতে। অথচ তাঁরা দেশের পটপরিবর্তনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন, সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। এর কারণ কী? কারণ কিন্তু পরিষ্কার।

যত দূর মনে পড়ে, একটা সময় এনসিপির নেতারা বলেছিলেন, তাঁরা জয়ী হওয়ার জন্য শুধু নির্বাচন করবেন না; বরং তাঁরা রাজনীতিতে সংস্কার আনতে চান, স্বৈরাচারী মনোভাব থেকে দেশকে মুক্ত করতে চান, দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে চান। যদিও এনসিপির দুজন নেতা ইতিপূর্বে অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। কেউ কেউ বিষয়টিকে অন্তর্বর্তী সরকারের ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

ক্ষমতা ব্যক্তি-গোষ্ঠীকে এমনভাবে আকৃষ্ট করে যে তার থেকে কারোরই মুক্তি ঘটে না সহসা। নির্বাচনে জয়ী হতে তাই এনসিপির নেতারা এখন জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধেছেন বলে অনেকের ধারণা। এতে অতীতে বলা কথা ‘ইরেজ’ হয়ে গেছে কিংবা মুছে গেছে।

জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনে কোনো নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়নি। তবে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় এনসিপির বর্তমান পুরুষ নেতাদের সঙ্গে নারী নেতৃত্ব থাকলেও এবং নারীরা সাহসিকতার সঙ্গে সম্মুখসারিতে থাকলেও নারী নেতাদের প্রতি কঠিন বৈষম্যমূলক মনোভাব পোষণ করা হয়েছে।

গ্রামগঞ্জে তথা দেশের সাধারণ মানুষ দুটো বিষয়ে অতিশয় সংবেদনশীল। এক, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাওয়া বাংলাদেশ ও তার সার্বভৌমত্ব; দুই, নারীর ক্ষমতায়ন, অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণ ও ভূমিকা অপরিসীম। চাইলেই কেউ তা অস্বীকার করার সেই অধিকার পেতে পারেন না। এমন এক পরিস্থিতিতে নারী নেতৃত্বকে অগ্রাহ্য করা চরম বৈষম্যের পরিচয় বলে মনে করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ এটা মেনে নিতে পারছেন না। একজন তরুণ নারীনেত্রী বলছিলেন, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ওয়াদা ভঙ্গ করেছে; বিশেষ করে এনসিপি।

একজন প্রবীণ শিক্ষকের অভিমত, দেশের রাজনৈতিক মূল্যবোধ নষ্ট হয়ে গেছে। আদতে পুরুষবাদের উত্থানের সংস্কার যেন চলছে।

একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা হতাশ হয়ে বলছিলেন, গত দেড় বছরে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বেশ অবনতি হয়েছে।

এটা হওয়ার কথা ছিল না। নারীরা বেশি সহিংসতার শিকার হয়েছে। তরুণদের ভেতর চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে, যা ইতিবাচক কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় না।

পরিশেষে বলতে চাই, যে দেশে নারীরা সমাজের সব ধরনের প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন, করছেন, রাষ্ট্র পরিচালনায়ও সক্ষমতা দেখিয়েছেন, শিক্ষা অর্জনে এগিয়ে সেই দেশে নারীকে পেছনে রাখার বিষয়টি স্বাভাবিক কোনো ঘটনা হতে পারে না। দেশের মানুষকে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। কারণ, অপশক্তিকে একমাত্র রুখে দিতে পারে সবার সচেতনতাই।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত