Ajker Patrika

কর্মহীন শ্রমিক

সম্পাদকীয়
কর্মহীন শ্রমিক

‘লোকসানের জন্য মালিক কারখানা বন্ধ করে দেইল। এলাই হামার কামকাজ নাই। কেমন করি সংসার চলিবে? ছোট দুইখান ছাওয়াক নিয়া না খায়া মরির নাগিবে।’ কর্মহীন পোশাকশ্রমিক রোজিনার এই আক্ষেপ কোনো কর্তৃপক্ষের দরজায় গিয়ে কড়া নাড়বে কি না, তা আমাদের জানা নেই। তবে এ কথা সত্যি, নীলফামারীর ২৫০টি কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রোজিনার মতো ৫ হাজারের বেশি শ্রমিক ও কারিগর কাজ হারিয়েছেন।

২৯ জানুয়ারি আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবরের মাধ্যমে পাঠক এর বিস্তারিত জানতে পেরেছেন।

পাকিস্তান আমল থেকে নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলায় ঝুট কাপড়ভিত্তিক পোশাক উৎপাদিত হয়ে আসছে। ২০০২ সালের পর থেকে এ ধরনের ব্যবসার আরও প্রসার হয়। পাশাপাশি এখানে কারচুপিশিল্পেরও বড় বাজার তৈরি হয়। কিন্তু গত দুই বছরে এখানকার ছোট-বড় ১০০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে— কতগুলো স্থায়ীভাবে আর কতগুলো অস্থায়ীভাবে। কারণ, ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় বড় পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে ঝুট কাপড়ের দাম অনেক বেড়ে গেছে। সুতা এবং অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং পুঁজিসংকটে উপজেলার প্রায় দেড় শ কারচুপি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

হঠাৎ এসব কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণ শুধুই মূল্যবৃদ্ধি নয়, এর সঙ্গে যোগ করতে হয় ভারতের এক কঠিন সিদ্ধান্ত। নীলফামারীর বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো থেকে পণ্য রপ্তানি করা হতো মূলত ভারত, নেপাল ও ভুটানে। গত বছর ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আদেশ দেয়, সেই দেশে পণ্য প্রবেশ করতে পারবে শুধু কলকাতা সমুদ্রবন্দর দিয়ে। ফলে আমাদের দেশের পোশাক সেখানে আগের আর স্থলবন্দর দিয়ে রপ্তানি করা যাচ্ছে না। আর সে কারণে কলকাতা সমুদ্রবন্দর দিয়ে রপ্তানিতে খরচ বেড়ে গেছে দ্বিগুণের বেশি।

এমন অবস্থায় কারখানার মালিকদের জন্য ব্যবসা টিকিয়ে রাখা যে অনেকটা মুশকিল হয়ে পড়েছে, তা বোঝার জন্য খুব অসুবিধা হয় না। কিন্তু তাঁদের কারখানার হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে যখন সংসার চালাতে পারছেন না, তখন সেই দায়ভার আসলে কে নেবে? নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বিকল্প কোনো কাজের ব্যবস্থা কে করে দেবে?

ভারত তার মুনাফা দেখবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সে ক্ষেত্রে আমাদের দেশে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়লে সেই সমস্যার সমাধান কি রাষ্ট্র করবে না?

একটি দেশের জনগণ সেই দেশের রাজনীতির বাইরে কখনোই থাকতে পারে না। প্রত্যক্ষভাবে যদি না-ও হয়, অনিচ্ছাসত্ত্বেও রাজনীতির ভেতর তাদের ঢুকে পড়তে হয়। তারা ভোট না দিলে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয় না। আর জনপ্রতিনিধি নির্বাচন তথা সরকার গঠন ৯না করা হলে দেশের জন্য, জনগণের পক্ষে কাজটা করবে কে? নিম্ন আয়ের স্বল্পশিক্ষিত বা নিরক্ষর জনগণের অনেকে ভূরাজনীতি সম্পর্কে তেমন ওয়াকিবহাল নয়, অথচ সেই গ্যাঁড়াকলে তাদের পড়তেই হয়; যেমনটা পড়েছেন সৈয়দপুরের কর্মহীন শ্রমিকেরা।

বেকারত্ব নিরসনের জন্য তাঁরা কাকে আসন্ন নির্বাচনে ভোট দেবেন, সেটা নিশ্চয় ইতিমধ্যে ঠিক করে ফেলেছেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত