Ajker Patrika

আইএমইডির প্রতিবেদন: সেচ প্রকল্পের খাদে খাদে রাজ্যের অনিয়ম

  • ৮৮টি খাল অর্ধেক খনন করে ফেলে রাখা হয়েছে।
  • ব্যাহত হচ্ছে খালের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ।
  • বিদ্যুৎহীন পাম্পহাউস অব্যবহৃত রয়েছে।
  • খালের দৈর্ঘ্য কমিয়ে সেচ বাড়ানোর বিভ্রান্তিকর হিসাব।
মাহফুজুল ইসলাম, ঢাকা
আইএমইডির প্রতিবেদন: সেচ প্রকল্পের খাদে খাদে রাজ্যের অনিয়ম

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সমীক্ষা এবং অনুমোদিত নকশা উপেক্ষা করে ভিন্ন ৪৬টি খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। এ ছাড়া অনুমোদিত তালিকার বাইরে গিয়ে স্থাপন করা হয়েছে ৯টি কূপ (ডাগ ওয়েল)। এ ছাড়া ৮৮টি খাল অর্ধেক খনন করে ফেলে রাখায় ব্যাহত হচ্ছে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ। শতভাগ সরকারি অর্থায়নের এই প্রকল্পে এমন বড় ধরনের অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মাঠপর্যায়ের প্রকৃত তথ্য আমলে না নিয়ে টেবিল-চেয়ারে বসে প্রকল্পের ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) তৈরির কারণে বাস্তবায়ন পর্যায়ে এসে এই ধরনের বড় অসংগতি হয়েছে।

কাগজে এক, বাস্তবে আরেক

‘চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন’ নামে প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০২ কোটি ২৬ লাখ টাকা।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৭ সালের জুন মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদিত এই প্রকল্পে গত এপ্রিল পর্যন্ত ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৬৭ শতাংশ। আর্থিক ব্যয় হয়েছে ৩৯৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। প্রতিবেদন বলছে, ভৌত অগ্রগতি দৃশ্যত সন্তোষজনক মনে হলেও প্রকল্পের মূল নকশা ও পরিকল্পনায় রয়েছে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় যে পরিমাণ খাল খননের সুপারিশ ছিল, ডিপিপিতে খালের দৈর্ঘ্য তার চেয়ে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আবার কম দৈর্ঘ্যের খাল খনন করে উল্টো বেশি পরিমাণ জমিতে সেচ দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা অবাস্তব ও পরস্পরবিরোধী।

খরচে মনগড়া সমন্বয় ও অডিট আপত্তি

প্রকল্পটির আর্থিক ব্যবস্থাপনায়ও সরকারি বিধিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ পেয়েছে আইএমইডি। দেখা গেছে, বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা (এপিপি) ও খরচের ক্ষেত্রে মূল ডিপিপি এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ (ডিওএফপি) সংক্রান্ত নির্দেশনাবলি মানা হয়নি। নিয়মবহির্ভূতভাবে এক খাতের টাকা অন্য খাতে নিয়ে ‘আন্তখাত সমন্বয়’ করা হয়েছে। এ ছাড়া অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি বরাদ্দ দিয়ে ব্যয় করা হয়েছে।

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়, আর্থিক অনিয়মের কারণে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এক্সটার্নাল অডিটের পক্ষ থেকে ৭টি গুরুতর অডিট আপত্তি উত্থাপন করা হয়েছিল, যা প্রকল্প কর্তৃপক্ষ এখনো নিষ্পত্তি করতে পারেনি।

ঝুঁকিতে মূল্যবান অবকাঠামো

সরেজমিনে পরিদর্শনকারী দল বেশ কিছু কারিগরি ত্রুটি দেখেছে। এগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে বিদ্যুৎহীন পাম্প হাউস। বিদ্যুচ্চালিত এলএলপি (লো লিফট পাম্প) হাউস নির্মাণ করা হলেও বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় না করায় সেগুলোতে এখনো বিদ্যুৎ-সংযোগ দেওয়া হয়নি। কোটি টাকার অবকাঠামো মাঠে অলস পড়ে নষ্ট হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সেচ অবকাঠামো নির্দেশিকায় যেকোনো সৌরবিদ্যুতে চালিত প্রকল্পের জন্য ‘বজ্রপাত সুরক্ষা ব্যবস্থা’ বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই প্রকল্পে স্থাপিত মূল্যবান সৌরবিদ্যুৎ প্যানেলগুলোতে কোনো বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা রাখা হয়নি, যা উপকূলীয় এলাকার আবহাওয়ায় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

আধুনিক ড্রিপ ও স্প্রিংকলার (বিভিন্ন গতিতে পানি দেওয়া) সেচব্যবস্থাকে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও যন্ত্রগুলোকে শুধু প্রদর্শনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।

৮৮টি খাল আংশিক খনন

প্রতিবেদন অনুসারে প্রকল্পের আওতায় ২৯৪টি খালের মোট ৪৭১ দশমিক ৫০ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ৮৮টি খাল আংশিক বা অর্ধেক খনন করে ফেলে রাখা হয়। এতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং উজান ও ভাটির কৃষকদের মধ্যে সেচের পানি পাওয়া নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে। পরিদর্শন দলের সদস্যরা দেখেছেন, এই ৮৮টি খালের মধ্যে ১১টিই সমীক্ষা ও অনুমোদিত নকশার বাইরে।

আইএমইডির হয়ে সরেজমিন গিয়ে সাক্ষাৎকার ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে এই প্রকল্পের সব তথ্য যাচাই-বাছাই করেছে ইন্টারন্যাশনাল ট্রেনিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস (আইটিএমসি) নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

তথ্য হালনাগাদ নেই

ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রকল্প তদারকির জন্য সরকারের বাধ্যতামূলক নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও ই-পিএমআইএস সফটওয়্যারে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতির তথ্য নিয়মিত ও সঠিকভাবে হালনাগাদ করা হয়নি। কর্মকর্তাদের কেউ কেউ বলছেন, এটি তদারকির প্রক্রিয়াকে অন্ধকারে রাখার শামিল। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ে আধুনিক প্রযুক্তি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দক্ষ কারিগরি জনবলও তৈরি করা হয়নি।

ডিপিপি সংশোধনের সুপারিশ

আইএমইডির প্রতিবেদনে অনতিবিলম্বে প্রকল্পটির ডিপিপি সংশোধনের সুপারিশ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে সরকারি বিধি অমান্য করে যাঁরা ভিন্ন স্থানে প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন এবং যাঁরা আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালকের বক্তব্য

প্রাথমিক সমীক্ষা এবং নকশায় না থাকলেও ৪৬টি খাল পুনঃখনন ও ৯টি কূপ খননের কথা স্বীকার করেছেন প্রকল্প পরিচালক নূরুল ইসলাম। তিনি এ বিষয়ে আজকের পত্রিকাকে বলেন, প্রকল্পের স্টিয়ারিং কমিটি এবং উপজেলা সেচ কমিটির অনুমোদনক্রমে খাল খনন ও ডাগ ওয়েল স্থাপন নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞের সুপারিশ এবং কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া

সার্বিক বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, সরকারের উচিত প্রকল্প প্রণয়নের আগেই সঠিকভাবে সমীক্ষা করা, যাতে পরবর্তী সময়ে পরিবর্তন করতে না হয়। সঠিকভাবে সমীক্ষা না করে প্রকল্প নেওয়া হলে তার বাস্তবায়নে দেরি হয়, ব্যয়ও বাড়ে।

বছরের পর বছর সরকার এভাবে কাজ করে আসছে মন্তব্য করে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এর ফলে প্রকল্পগুলো সঠিক জবাবদিহির আওতায় আসে না।

পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার বলেন, প্রকল্পের বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে তুলে ধরা হবে, যাতে তারা প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত