Ajker Patrika

মানুষের হাতে বাড়ছে নগদ টাকা

মৃত্তিকা সাহা, ঢাকা
মানুষের হাতে বাড়ছে নগদ টাকা
গ্রাফিক্স: আজকের পত্রিকা

একদিকে নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলার উদ্যোগ। অন্যদিকে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিজের কাছেই রাখছে মানুষ। ফলে দেশে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। একই সময়ে ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কম থাকায় বিষয়টিকে উদ্বেগের সঙ্গে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা।

তাঁদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট, কয়েকটি ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতা, অনিশ্চিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং নগদনির্ভর ব্যবসায়িক সংস্কৃতির কারণে মানুষের মধ্যে হাতে টাকা রাখার প্রবণতা বেড়েছে। এই প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, চলতি বছরের মে মাস শেষে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। এক মাস আগে এপ্রিলে এই পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯৯ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক মাসেই নগদ অর্থ বেড়েছে ৪৯ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা বা ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। আর গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ব্যাংকের বাইরে থাকা মুদ্রার প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৮ দশমিক ৯২ শতাংশ। সেই সময় হাতে রাখা টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯৩ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকা। বিপরীতে একই সময়ে ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি আজকের পত্রিকাকে বলেন, মানুষের হাতে নগদ অর্থ বেড়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো ব্যাংকের প্রতি আস্থাহীনতা। অনেক আমানতকারী এখন আর ব্যাংকে অর্থ রাখতে নিরাপদ বোধ করছেন না। ফলে দুর্বল ব্যাংকগুলো থেকে তুলে নেওয়া অর্থের একটি অংশ আর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসছে না।

মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, মূল্যস্ফীতির কারণে পরিবারের মাসিক ব্যয়ও বেড়েছে। বাজার, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় মেটাতে আগের তুলনায় বেশি নগদ অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। আবার অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে অনেক পরিবার হাতে নগদ অর্থ রাখাকে নিরাপদ মনে করছে।

ব্যাংকারদের ভাষ্য, কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক থেকে গ্রাহকদের অর্থ তুলে নেওয়ার প্রবণতা এখনো পুরোপুরি থামেনি। উত্তোলিত অর্থের একটি অংশ তুলনামূলক শক্তিশালী ব্যাংকগুলোয় জমা হলেও একটি বড় অংশ নগদ হিসেবে মানুষের হাতে থেকে যাচ্ছে।

সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শওকত আলী খান জানান, তাঁদের ব্যাংকে আমানতের প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। তবে কয়েকটি ব্যাংক থেকে গ্রাহকেরা অর্থ তুলে নেওয়ায় সেসব ব্যাংক তারল্যসংকটে পড়েছে। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মে মাস শেষে ব্যাংক খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ৪১ হাজার ৯৯ কোটি টাকা। এটি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ৪৪ শতাংশ বেশি। ওই সময় ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ৩২ হাজার ৬৫ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নেওয়ার প্রবণতার পেছনে কয়েকটি ব্যাংকের আর্থিক সংকট বড় ভূমিকা রেখেছে। কয়েকটি ব্যাংকের দুর্বল অবস্থার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। ফলে এসব ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলনের চাপ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে কয়েকটি ব্যাংক এককভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা হারিয়ে ফেললে সেগুলোকে একীভূত করে সরকারি মালিকানাধীন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। এ ছাড়া সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকেও বড় ধরনের তারল্যসংকট দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে হাতে নগদ হিসেবে রাখার প্রবণতা ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক নয়। এতে ব্যাংকগুলোর তারল্যসংকট আরও তীব্র হতে পারে এবং বাজারে নগদ অর্থের প্রবাহ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত