Ajker Patrika

বিশাল বাড়িতে নিঃসঙ্গ মৃত্যু, দেখতে এলেন না স্বজনেরা

ফরিদপুর প্রতিনিধি
আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৬, ১৪: ১১
বিশাল বাড়িতে নিঃসঙ্গ মৃত্যু, দেখতে এলেন না স্বজনেরা
নিজস্ব এই বাড়িতে একা বসবাস করতেন কোয়েল চৌধুরী। ছবি: আজকের পত্রিকা

ফরিদপুরে তিনতলা একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে অচেতন অবস্থায় কোয়েল চৌধুরী (৫৪) নামে এক ব্যক্তিকে উদ্ধারের পর হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর খবর তাঁর কানাডাপ্রবাসী একমাত্র বোন ও স্বজনদের স্থানীয়রা জানালেও কেউ আসেনি।  পরে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় শহরের আলীপুর কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গতকাল রোববার দুপুরে অচেতন অবস্থায় ফরিদপুর শহরের পূর্ব খাবাসপুর এলাকার চৌধুরী ভিলা নামক একটি ভবন থেকে কোয়েল চৌধুরীকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০০০ সালের দিকে এই ভবনটি কিনে বসবাস করে আসছিলেন হাশমত আলী চৌধুরী ও আছিয়া খানম দম্পতি। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, তাঁরা দুজনেই ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। তাঁদের মৃত্যু পর থেকেই ধীরে ধীরে একা হয়ে পড়েন কোয়েল চৌধুরী।

অচেতন হয়ে থাকার খবরে দরজা ভেঙে উদ্ধার করে পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা। ছবি: আজকের পত্রিকা
অচেতন হয়ে থাকার খবরে দরজা ভেঙে উদ্ধার করে পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা। ছবি: আজকের পত্রিকা

প্রতিবেশীরা জানান, এই দম্পতি রেখে যান বাবু চৌধুরী ও কোয়েল চৌধুরী নামে দুই পুত্রসন্তান এবং একমাত্র মেয়েকে। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর দুই ভাইকে রেখে কানাডায় পাড়ি জমান মেয়ে। এই দুই ভাই ছোটবেলা থেকেই মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। একমাত্র বোন কানাডায় চলে যাওয়ার পর থেকেই দুই ভাই দুর্বিষহ জীবন যাপন করছিলেন।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, কোয়েল চৌধুরী আর বাবু চৌধুরী মানসিক ভারসাম্যহীন হলেও তাঁদের চলাচল ছিল স্বাভাবিক, কখনো উচ্ছৃঙ্খলতা করেননি। দুই ভাইয়ের মধ্যে সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত মধুর। শহরের মানুষ তাঁদের একসঙ্গেই বেশি দেখতেন। কখনো পাশাপাশি হাঁটতেন, কখনো হাত ধরে রাস্তার একপাশ ধরে হেঁটে যেতেন ধীর পায়ে।

কিন্তু প্রায় দেড় বছর আগে বড় ভাই বাবু চৌধুরী মারা যান। এর পর থেকে বিশাল সেই ফ্ল্যাটে একেবারে একা হয়ে যান কোয়েল চৌধুরী। ভাড়াটিয়ারাই নিয়মিত তাঁর খাবারের ব্যবস্থা করতেন। প্রতিবেশীরাও রাখতেন খোঁজখবর।

অচেতন অবস্থায় কোয়েল চৌধুরীকে হাসপাতালে নিয়ে যায় স্থানীয়রা। ছবি: আজকের পত্রিকা
অচেতন অবস্থায় কোয়েল চৌধুরীকে হাসপাতালে নিয়ে যায় স্থানীয়রা। ছবি: আজকের পত্রিকা

প্রতিবেশী আশিকুর রহমান খান বলেন, ‘গতকাল সকালে এক ভাড়াটিয়া খাবার দিতে যান, ডাকাডাকি করেও ভেতর থেকে সাড়া না পাওয়ায় তাঁরা আমাদের জানান। আমরা সেখানে গিয়ে ৯৯৯-এ ফোনকল দিয়ে পুলিশকে জানাই। পুলিশ এসে ঘরের দরজা ভেঙে তাঁকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে। তাঁর দুচোখ বেয়ে পানি ঝরে পড়ার দাগ দেখা যায়। আমরা প্রথমে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখান থেকে দ্রুত ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।’

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘মারা যাওয়ার পর তাঁর কানাডাপ্রবাসী বোনকে জানালে তিনি আমাদের দাফন করে ফেলতে বলেন। এমনকি অন্য স্বজনদের জানালেও তাঁরা কেউ আসেননি। পরে স্থানীয়দের উদ্যোগে বাবা-মায়ের কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। দাফনের পর দূর সম্পর্কের কয়েকজন আত্মীয় এসেছিলেন। বড় ভাই বাবু চৌধুরীর মৃত্যুর পরও কেউ আসেননি।’

কথিত আছে, মা-বাবা দুজনেই সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় ছোটকালে তাঁরা কর্মস্থলে যাওয়ার আগে দুই ভাইকে ঘুমের ওষুধ খাওয়াতেন। যার ফলে একপর্যায়ে তাঁরা মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন।

ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহামুদুল হাসান জানান, ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে পুলিশ গিয়ে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে। পরে স্থানীয়রা হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে মারা যাওয়ার পর কেউ থানায় জানাননি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত