Ajker Patrika

সেচে ভোগান্তি: ডিজেলে দুশ্চিন্তা কৃষকের

  • চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল না পাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে সেচ কার্যক্রম
  • ঘণ্টার পর ঘণ্টা সারিতে দাঁড়িয়েও ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে
  • পাম্পে ভুয়া কৃষকের দৌরাত্ম্যে ভোগান্তির শিকার প্রকৃত কৃষকেরা
আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
সেচে ভোগান্তি: ডিজেলে দুশ্চিন্তা কৃষকের
ডিজেল শেষ হওয়ায় শ্যালো মেশিন কাঁধে করে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন দুই কৃষক। গত বৃহস্পতিবার রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার জগদীশপুর মাঠে। ছবি: আজকের পত্রিকা

বোরো ধানের ভরা মৌসুমে মাথায় হাত কৃষকের। ডিজেল নেই পাম্পে, থাকলেও মেলে না চাহিদামতো। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সারিতে দাঁড়িয়ে খালি হাতে ফিরছেন অনেকে। জ্বালানি না পেয়ে সেচ বন্ধ। যে সময় কৃষকের মুখে হাসি থাকার কথা, সেই সময়ে তাঁদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিতিশীলতার জেরে দেশে দেখা দিয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট। এর সরাসরি আঘাত পড়েছে ডিজেলনির্ভর কৃষি খাতে। রংপুর, পাবনা, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, গাইবান্ধা, রাজশাহী, গোপালগঞ্জ—সর্বত্র একই চিত্র।

রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলায় এবার ৫ লাখ ৯ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হচ্ছে। ডিজেলচালিত অগভীর নলকূপ ৯৬ হাজারের বেশি। জ্বালানি সংকটে সেচে এবার অতিরিক্ত খরচ হতে পারে ২৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। হাড়িয়ারকুঠির কাশিয়াবাড়ি গ্রামের কৃষক ইদ্রিস আলী বলেন, ‘দুইটা তেল পাম্প ঘুরে শেষে তিন নম্বর পাম্পে এসে দুই লিটার ডিজেল পেলাম। ২০০ টাকার ডিজেল নিতে আমার যাতায়াত খরচ ১২০ টাকা। এই তেলে চার ঘণ্টা মেশিন চলবে না। এবার যে ধানের কী হবে, আল্লাহ ভালো জানেন।’

গঙ্গাচড়ায় কয়েক হাজার একর জমিতে সেচের জন্য প্রতিদিন প্রচুর জ্বালানি প্রয়োজন। কিন্তু সরবরাহ কম থাকায় চাহিদা অনুযায়ী তেল মিলছে না। শিহাব ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকেরা সেচপাম্প বাইসাইকেলের পেছনে বেঁধে এনে তেল নেওয়ার চেষ্টা করছেন। দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়েও খালি হাতে ফিরতে হয় অনেককে।

কোলকোন্দ ইউনিয়নের চেংডো এলাকার কৃষক শাহিন বলেন, ‘তিস্তার চরে ৬ একর জমিতে ভুট্টা লাগাইছি। প্রতি সপ্তাহে পানি দিতে ৬-৭ লিটার পেট্রল লাগে। কিন্তু জেরিকেনে (প্লাস্টিকের তেলের জার) তেল দেয় না। তাই চার কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে পাম্প নিয়ে আসতে হয়। এত কষ্ট করে আসার পর সাত লিটার দরকার থাকলেও দিল মাত্র ৩ লিটার।’

শিহাব ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার সাইয়েদুজ্জামান সবুজ বলেন, ‘কৃষক না হয়েও অনেকে তেল নিয়ে পরে বেশি দামে বিক্রি করছে। তেল সংকট থাকায় আমরা চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ পাচ্ছি না। তাই বাধ্য হয়ে প্রকৃত কৃষকদের সেচপাম্প নিয়ে আসতে বলছি। এতে তাঁদের কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু ভুয়া কৃষকদের মাধ্যমে তেল বাইরে বিক্রি ঠেকাতেই এই ব্যবস্থা।’

পাবনার চাটমোহর উপজেলায়ও একই চিত্র। কৃষকেরা শ্যালো মেশিন, পাওয়ার টিলার, হারভেস্টার চালাতে ডিজেল পাচ্ছেন না। ক্যানে তেল দেওয়া বন্ধ থাকায় পাম্পে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। গুনাইগাছা গ্রামের কৃষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘আমাদের মাঠে ২০০ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য শ্যালো ইঞ্জিন চালিত গভীর নলকূপ আছে। এক ফসল উৎপাদনে ৮ থেকে ৯ ব্যারেল ডিজেল লাগে। কিন্তু এবার তেল সংকটের কারণে সেচ বন্ধ রাখা রয়েছে। অনেকে ধানের আবাদ না করে পাট ও তিল বুনেছে। এতে কৃষকের লোকসান হবে।’

ফরিদপুরে চলতি মৌসুমে ৮৭ হাজার ৩২৮ হেক্টর জমিতে পাট, ২৩ এরপর পৃষ্ঠা ৭ কলাম ?

হাজার ১৫৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান, ৬ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে তিল এবং ৫ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে ভুট্টার আবাদ হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে নিয়মিত সেচ প্রয়োজন হলেও ডিজেলের সংকটে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকেরা। নগরকান্দার আমিরুল মোল্যা বলেন, ‘পাটে পানি দিতে খুব কষ্ট হচ্ছে, ঠিকমতো তেল পাচ্ছি না। পাম্পে গেলে বলে তেল নাই; দোকান থেকে কিনলে ১৫০ টাকা লিটার, তা-ও ৫ লিটারের বেশি দিচ্ছে না। এই রোদে পাটে ঠিকমতো পানি না দিতে পারলে গাছ মরে যাবে।’

কুষ্টিয়ায় কৃষক আশরাফুল আলম বলেন, ‘প্রতি বিঘা জমিতে সেচ দিতে প্রায় ২ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। আমার ১৩ বিঘা জমির মধ্যে ৮ বিঘায় ধান। কিন্তু দিনে মাত্র ৩ লিটার করে ডিজেল পাচ্ছি। এক দিন পরপর ১৯ লিটার লাগে, পাচ্ছি মাত্র ৬ লিটার।’ গাইবান্ধার এনামুল হোসেন বলেন, ‘আমি পাঁচ বিঘা জমিতে ধানের আবাদ করছি। তেলের জন্য তিন-চার দিন থেকে ঘুরছি। কোথায় পাই নাই।’ ঝিনাইদহের মিঠুন দাস বলেন, ‘সকাল ৬টা থেকে আমি লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এখন বেলা ১১টা বাজে। এসে শুনছি তেল শেষ হয়ে গেছে।’

রাজশাহীর চরাঞ্চলে পদ্মা নদী পার হয়ে তেল আনতে হচ্ছে। পুঠিয়ার মাইনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা আগে গ্রামের বাজারেই ডিজেল পেতাম। এখন ১০ কিলোমিটার দূরে পাম্প থেকে তেল আনতে হয়। লম্বা লাইন ধরে তা-ও ৫ লিটার তেল দেয়।’ গোপালগঞ্জের রহমত মিয়া বলেন, ‘এখন বোরো ধানে থোড় আশার সময়। এই সময়ে জমিতে পর্যাপ্ত সেচ না দিতে পারলে ধান পুষ্ট হবে না।’

বিভিন্ন জেলার কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংকট মোকাবিলায় ট্যাগ অফিসার নিয়োগ এবং স্লিপ দেওয়ার পাশাপাশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকেরা বলছেন, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে কৃষকেরা চান, যথাসময়ে যেন তাঁদের পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করা হয়। অন্যথায় ভরা মৌসুমে ফসল হারিয়ে ক্ষতির মুখে পড়তে হবে তাঁদের।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন রংপুর, পাবনা, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, গাইবান্ধা, রাজশাহী, গোপালগঞ্জের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা।]

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত