Ajker Patrika

আমার ল্যুভ দর্শন

সোনালি ইসলাম
আমার ল্যুভ দর্শন

ইউরোপে আগে তিনবার গেলেও কেন জানি না আমি ফ্রান্স যাইনি। প্রতিবারই পারিবারিক কোনো না কোনো কারণে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। এবার যখন সুযোগ এল, তখন বরং সুইজারল্যান্ড আর ব্রাসেলস ট্যুর বাতিল করে প্যারিসেই দুই দিন বেশি থাকার আবদার করলাম। ল্যুভ মিউজিয়াম যাব। আমার বহু আশা-আকাঙ্ক্ষার ল্যুভ।

আমি আমার অতিবিখ্যাত চিকিৎসক স্বামীর সঙ্গে ফ্রান্সে এসেছি, নাকি সে আমার সঙ্গে এসেছে, সে বিষয়ে আমার সন্দেহ দেখা দিয়েছে। যা হোক, জানা গেল, আমরা নারীরা যাব লাঞ্চ আর শপিং করে। আর সেমিনারে আমন্ত্রিত চিকিৎসকেরা যাবেন সেমিনার শেষে। মোট সময় বরাদ্দ তিন ঘণ্টা। শুনেই মেজাজটা খারাপ হলো। ল্যুভ মিউজিয়ামে কেউ তিন ঘণ্টার ট্যুর করে? তবু গেলাম। কিন্তু চিকিৎসকেরা নেমেছেন অন্য গেটে, তাঁদের কাছে টিকিট। তাই দুই দল একসঙ্গে হতেই কেটে গেল আধা ঘণ্টা। এমন নয় যে আমাকে তিন ঘণ্টা পরেই ল্যুভ থেকে বের করে দেবে। কিন্তু সমস্যা হলো গ্র্যান্ড ডিনারেও নারীদের যেতে হবে!

আমাদের গাড়ি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, তার সামনেই দেখলাম একটা হোটেল। নাম ল্যুভ হোটেল। শুনলাম, সেই অতিবিখ্যাত হোটেলে এসে থাকেন বিশিষ্ট শিল্পী আর শিল্পবিষয়ক গবেষকেরা। প্রাচীন হোটেলটিও আমার কাছে দর্শনীয় বলে সেটির দিকে অপলক তাকিয়ে ছিলাম। হঠাৎ একটা দরজা খুলে ছোট ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালেন এক প্রৌঢ়। ঝাঁকড়া চুল, মুখভর্তি দাঁড়ি আর বাদামি চোখের তীক্ষ্ণ চাহনি দেখে আমি থমকে গেলাম!

শেষ পর্যন্ত দুটি দল এক হলো। তথ্য বলছে, ল্যুভের প্রতিটি প্রদর্শিত শিল্পকর্মের সামনে মাত্র ৩০ সেকেন্ড করে দাঁড়ালেও পুরো জাদুঘরটি একনজর দেখতে লাগবে টানা ১০০ দিন!

জাদুঘরে প্রবেশের বিশাল লাইন সামনে। তবে এখানে আসা চিকিৎসকেরা আমন্ত্রিত অতিথি আর সবাই সিনিয়র সিটিজেন বলে সেই বিশাল লাইনে আর দাঁড়াতে হলো না। ভেতরে ঢুকেই ‘মোনালিসা’ দেখতে জোর পায়ে হাঁটতে শুরু করলাম। আমার চিকিৎসক স্বামী ‘কই যাও, কই যাও’ বলে দু-একবার ডেকে উত্তর না পেয়ে অসহায়ভাবে আমার পেছনে আক্ষরিক অর্থেই ছুটে চললেন।

আপনারা সবাই জানেন, মোনালিসা যে ঘরে আছেন, সেখানে আসল শিল্পকর্মটি নেই। অথচ মাঝারি মাপের ঘরটায় গিজগিজ করছে মানুষ। বুদ্ধি করে কাঁধের ভারী ব্যাগ গাড়িতে রেখে শুধু মোবাইল ফোন এক হাতে ধরে চলে এসেছি। এখন শুধু মোনালিসার কাছে পৌঁছাতে হবে। হাডুডু খেলার গতিতে দুহাত সামনে বাড়িয়ে আমি সেই মানুষের পাঁচিল ভেঙে ঢুকতে শুরু করলাম। আশপাশের অনেকেই হয়তো আমার হাত-পায়ের গুঁতোয় জখম হচ্ছিলেন। একজন শুধু খুব জোরে বলে উঠলেন, এক্সকিউজ মি।

হয়তো তাঁর পা মাড়িয়ে দিয়েছিলাম। আমি ঘুরে বললাম, ইউ আর এক্সকিউজড।

ভদ্রলোক আর কিছু বলে ওঠার আগেই আমি পৌঁছে গেলাম মোনালিসাকে ঘিরে রাখা নীল কর্ডের সামনে। আর আমার স্বামী বেগতিক দেখে আমার কাঁধ আর হাতের গুঁতোয় ফাঁকা হওয়া পথ ধরে এসে পৌঁছালেন। তারপর দুজনে মিলে ছবি তোলা পর্ব সেরে ধীরে-সুস্থে ফিরে এলাম ঘরের বাইরে। সত্যি কথা বলতে কি, এত দূরে রাখা ওইটুকু মোনালিসা দেখে সময় নষ্ট করার মানে হয় না, সেটুকু জেনে নেব বইপত্রে। কিন্তু ল্যুভে এসে মোনালিসা পর্যন্ত যাব না, এই ব্যাপারটা মেনে নেওয়া যায় না। যা হোক, বের হয়ে দেখি দলের অন্যরা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। ভিড় দেখে ভয়ে আর এগোনোর সাহস পাননি। আমি তাঁদের মোনালিসা সম্পর্কে একটা লেকচার দিয়ে ফেললাম—তাঁরা কতটুকু বুঝলেন জানি না, তবে সঙ্গের এক নারী বলেই ফেললেন, এই দেখার জন্য এত যন্ত্রণা!

মোনালিসা ছবির রহস্যময়ী নারীটির আসল পরিচয় নিয়ে দীর্ঘকাল বিতর্ক ছিল। তবে অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতে, তিনি ছিলেন ফ্লোরেন্সের এক সিল্ক ব্যবসায়ী ফ্রান্সিসকো দেল জিওকোন্দোর স্ত্রী, যাঁর নাম লিসা ঘেরারদিনি। ইতালীয় ভাষায় ‘মোনা’ শব্দের অর্থ ম্যাডাম বা শ্রীমতী। সেই হিসেবে ছবিটির নাম দাঁড়ায় ‘ম্যাডাম লিসা’। ইতালিতে এই ছবিটিকে ‘লা জিওকোন্দা’ বলা হয়।

ল্যুভ মিউজিয়ামে লেখক
ল্যুভ মিউজিয়ামে লেখক

​​​​মোনালিসা কাপড়ের ক্যানভাসে আঁকা নয়। মাত্র ৩০ ইঞ্চি × ২১ ইঞ্চি আকারের একটি পপলার কাঠের প্যানেলের ওপর তেলরঙে আঁকা হয়েছিল এই ছবি।

সবাই জানি যে মোনালিসার চোখে কোনো ভ্রু বা পাপড়ি নেই। তবে ​২০০৭ সালে এক উচ্চ প্রযুক্তির স্ক্যানে পরীক্ষায় দেখা গেছে, ভিঞ্চি আসলে ভ্রু এঁকেছিলেন। কিন্তু শত শত বছর ধরে পরিষ্কার এবং রক্ষণাবেক্ষণ করার কারণে তা একসময় মুছে গেছে।

​মোনালিসা দেখার পরে বাকি থাকে ভেনাস মূর্তি দেখা। একতলা দোতলা পেরিয়ে এসে পৌঁছালাম ভেনাসের মূর্তির সামনে। একই ঘরে ভেনাস, আফ্রোদিতি এবং আরও কয়েকটি ভাস্কর্য রাখা। এখানে বেশি ভিড় নেই। মুশকিল হলো, সমস্ত চিত্রশিল্প এবং ভাস্কর্যের সামনে যা লেখা, তা সবই ফ্রেঞ্চ ভাষায়। ফ্রেঞ্চ শিখেছিলাম বটে, তবে চর্চার অভাবে ভুলে গেছি।

ভেনাস ডি মাইলো বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত এবং প্রাচীন গ্রিক ভাস্কর্য। এই মার্বেল মূর্তিটি ধ্রুপদি সৌন্দর্য এবং একটি বিশেষ রহস্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত—এর কোনো হাত নেই। ​১৮২০ সালে এজিয়ান সাগরের গ্রিক দ্বীপ মিলোস-এর একটি প্রাচীন থিয়েটারের ধ্বংসাবশেষ থেকে এটি উদ্ধার করা হয়। ফরাসিরা দ্বীপটিকে মাইলো বলত। সেখান থেকেই এর নাম হয় ভেনাস ডি মাইলো। ​এটি খ্রিষ্টপূর্ব ১০০ থেকে ১৩০ অব্দের মধ্যে অর্থাৎ হেলেনীয় যুগে তৈরি বলে অনুমান করা হয়।

​এটি দেখতে গিয়ে একজন জ্ঞানী প্রফেসর জানতে চাইলেন, বার্থ অব ভেনাসে তো একটা ঝিনুক থাকার কথা। সেটা নেই কেন?

আমি মনে মনে নিজেকে গালি দিলাম। বিখ্যাত চিকিৎসক অধ্যাপক টাইফয়েড আর ডেঙ্গু জ্বরে গুলিয়ে ফেলেছেন! রেনেসাঁ আমলের বতিচেল্লির আঁকা ‘বার্থ অব ভেনাস’ আর ‘ভেনাস দ্য মাইলো’ কি এক! আমি অমায়িক হেসে বললাম, তাহলে তো আমাদের ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে যেতে হবে। কারণ ঝিনুকসহ ভেনাস সেখানকার উফিজি গ্যালারিতে সাজানো আছে। যাবেন নাকি?

‘নাহ, না। আর কোথাও যাওয়া যাবে না। ডিনার টাইম হয়ে যাচ্ছে।’

আমি হাসিমুখে মেনে নিলাম। এই সব সহযাত্রীর যে এই পর্যন্ত আনতে পেরেছি, সেটাই আমার ভাগ্য।

এমন একটা ঐতিহাসিক জায়গায় গেলে নিজেদের ক্ষুদ্র মনে হয়। শত শত বছর ধরে এই প্রাসাদটি দাঁড়িয়ে আছে। যখনই কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তখনই সেটাকে মেরামত করে আবার আগের মতো করা হচ্ছে। কী দারুণ ব্যাপার!

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত