Ajker Patrika

কেন ঘুমের মধ্যে চেপে ধরে নিশি ভূত!

ফিচার ডেস্ক
আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২৬, ১৭: ১৬
কেন ঘুমের মধ্যে চেপে ধরে নিশি ভূত!
স্লিপ প্যারালাইসিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৭৫ শতাংশ কোনো না কোনো অলীক দৃশ্য বা অনুভূতির মুখোমুখি হন। আর এ থেকে জন্ম নেয় স্লিপ ডেমন্স বা নিশি পেত্নীর ধারণা। ছবি: পেক্সেলস

ঘুম ভেঙেছে, চোখ মেলতেই দেখলেন ঘরের কোণে দাঁড়ানো কোনো এক অস্পষ্ট কালো অবয়ব। ঘরের ভেতর এক হিংস্র উপস্থিতি টের পাচ্ছেন। এদিকে বুকে যেন বিশাল কোনো ভারী পাথর বা দেও-দানব চেপে বসে আছে। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু চিৎকার করতে কিংবা হাত-পা একটুও নাড়াতে পারছেন না। রূপকথা বা হরর সিনেমার এই অতিপরিচিত দৃশ্য কিন্তু কোনো কাল্পনিক গল্প নয়। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ জীবনে অন্তত একবার এই অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। আমাদের বাংলায় একে ‘বোবায় ধরা’ বা ‘নিশি পেত্নীতে পাওয়া’ বলা হয়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম ‘স্লিপ প্যারালাইসিস’।

কেন হয় এই অবস্থা

আমরা যখন ঘুমাতে যাই, শরীর এনআরইএম এবং আরইএম নামক দুটি ধাপের মধ্য দিয়ে যায়। স্বপ্নের জগতে আমরা ডুব দিই এই আরইএম ধাপেই। এ সময় মস্তিষ্ক অত্যন্ত সক্রিয় থাকে। কিন্তু শরীর আঘাত থেকে রক্ষা করতে আমাদের পেশিগুলো সাময়িকভাবে অবশ বা অচল করে রাখা হয়। একে মাসল অ্যাটোনিয়া বলে। স্লিপ প্যারালাইসিসের সময় এই ঘুম ও জাগরণের মাঝের সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়। মস্তিষ্ক জেগে উঠলেও পেশির অবশ অবস্থা থেকে যায়। ফলে ব্যক্তি চারপাশে দেখতে পান ও চিন্তা করতে পারেন ঠিকই; কিন্তু শরীর নাড়াতে পারেন না। স্লিপ প্যারালাইসিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৭৫ শতাংশই কোনো না কোনো অলীক দৃশ্য বা অনুভূতির মুখোমুখি হন। আর এ থেকে জন্ম নেয় স্লিপ ডেমন্স বা নিশি পেত্নীর ধারণা।

বিভিন্ন সংস্কৃতিতে স্লিপ ডেমন্স

ইতিহাসজুড়ে বিভিন্ন সংস্কৃতি এই অভিজ্ঞতাকে নিজেদের মতো ব্যাখ্যা করেছে। যেমন—

লিলিতু: খ্রিষ্টপূর্ব ২৪০০ অব্দে মেসোপটেমিয়া সভ্যতার নথিতে প্রথম লিলিতু নামক নারী দানবের উল্লেখ পাওয়া যায়। একে ইনকিউবাস বা নাইট-মেয়ারের আদি রূপ মনে করা হয়।

নাইট-মেয়ার: মধ্যযুগীয় ইউরোপে বুক চেপে ধরা নারী সত্তাকে নাইট-মেয়ার বলা হতো।

অ্যাগ রোগ বা ওল্ড হ্যাগ: সত্তরের দশকে নিউফাউন্ডল্যান্ডের অধিবাসীদের মধ্যে অ্যাগ রোগ বা বৃদ্ধ ডাইনির ধারণার কথা উল্লেখ করা হয়।

পিসাদেইরা: ব্রাজিলের লোকগাথায় চালের ওপর ওত পেতে থাকা বুড়ি পিসাদেইরা পেট ভরা অবস্থায় পিঠ দিয়ে ঘুমানো মানুষের বুকের ওপর উঠে বসে।

কানাসিবারি: জাপানে এটিকে বৌদ্ধ দেবতার জাদুকরি শক্তির সঙ্গে তুলনা করে কানাসিবারি বলা হয়।

জিন ও খমাচ সাঙ্গকাত: মিসরে এটিকে জিনের উপদ্রব এবং কম্বোডিয়ায় খমাচ সাঙ্গকাত বা প্রেতাত্মার চাপ দেওয়া বলে বিশ্বাস করা হয়।

বিজ্ঞান ও গবেষণা যা বলছে

আধুনিক গবেষকদের মতে, এটি কোনো অলৌকিক বিষয় নয়। তাঁরা বলছেন, জেগে থাকা অবস্থায় আরইএম ঘুমের স্বপ্ন দেখার ফলে এমনটা ঘটে। এর নেপথ্যে রয়েছে হরমোনের (যেমন সেরোটোনিন) প্রভাব। মস্তিষ্কের শারীরিক গঠনের ধারণায় বিভ্রান্তি এবং ফুসফুসের পেশি অবশ থাকায় শ্বাস অগভীর হওয়া। ভয় পেলে শরীরের ফাইট-অর-ফ্লাইট প্রতিক্রিয়া চালু হয়ে এই আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দেয়। আমেরিকান একাডেমি অব স্লিপ মেডিসিনের তথ্যমতে, স্লিপ প্যারালাইসিস মূলত ঘুমের ঘাটতির কারণে ঘটে থাকে। বিষয়টিকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বোর্ড-সার্টিফায়েড সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. কারা ব্যাগট জানান, স্লিপ প্যারালাইসিসে আক্রান্তদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষই শ্রবণ, দৃশ্য বা স্পর্শজনিত অলীক অনুভূতি বা স্লিপ ডেমন্সের মুখোমুখি হন।

তাৎক্ষণিক মুক্তি ও প্রতিরোধের উপায়

সাধারণত কয়েক সেকেন্ড থেকে ২ মিনিট পর্যন্ত এই অবস্থা স্থায়ী হতে পারে। এটি মারাত্মক বিপজ্জনক নয়। তবে তাৎক্ষণিক মুক্তি পেতে হলে কিছু বিষয় মনে রাখা জরুরি। সেগুলো হলো—

  • আঙুল, চোখ বা মুখের হালকা পেশি নাড়ানোর চেষ্টা করুন।
  • জোর করে ঝাঁকুনি দেওয়া বা কাশির চেষ্টা করতে পারেন।
  • বড় শ্বাস নিয়ে শান্ত থাকার চেষ্টা করুন।
  • পাশে থাকা সঙ্গীকে স্পর্শ করে নিজেকে জাগিয়ে দিতে বলুন।

ভবিষ্যতে এটি এড়াতে চিত হয়ে না ঘুমিয়ে কাত হয়ে ঘুমানোর অভ্যাস করুন। প্রতিদিন অন্তত ৭ ঘণ্টা ঘুমান এবং ঘুমানোর ২ ঘণ্টা আগে মোবাইল-ল্যাপটপ থেকে দূরে থাকুন। দুশ্চিন্তা বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

সূত্র: হেলথ লাইন, স্লিপ ফাউন্ডেশন

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত