Ajker Patrika

জেন-জি ও মিলেনিয়ালদের স্বপ্নপুরী সিউল

ফিচার ডেস্ক  
জেন-জি ও মিলেনিয়ালদের স্বপ্নপুরী সিউল

রোমান্টিক গলির মুখ, নায়িকার ব্যবহার করা লিপস্টিকের শেড কিংবা রাতে বন্ধুদের সঙ্গে ক্যাফেতে বসে ধোঁয়া ওঠা স্পাইসি রাইস কেক খাওয়ার দৃশ্য হরহামেশা দেখানো হয় কে-ড্রামায়। স্ক্রিনের এই রঙিন জীবনের প্রতি তরুণ প্রজন্মের মুগ্ধতা বিশ্বজুড়ে। এই রঙিন জীবন এখন আর শুধু নাটক কিংবা সিনেমার চিত্রনাট্যে সীমাবদ্ধ নেই। অর্থবান মিলেনিয়াল এবং জেন-জি পর্যটকদের কাছে সিউল এখন আর শুধু দর্শনীয় শহর নয়, এটি তাদের লাইফস্টাইল এবং স্বপ্নের বাস্তবায়নের এক জীবন্ত কেন্দ্র।

ইউএসভিত্তিক ভ্রমণ মিডিয়া আউটলেট ট্র্যাজি ট্রাভেলের ‘২০২৬ দ্য ট্র্যাজিস’ অ্যাওয়ার্ডে টানা পঞ্চমবার বিশ্বের সেরা শহরের মুকুট জিতেছে সিউল। গড়ে বছরে প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার ডলার আয় করা তরুণ পেশাদারদের প্রত্যক্ষ ভোটে শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছে কোরিয়ার রাজধানী। এথেন্স, লন্ডন, হংকং বা ডাবলিনের মতো বাঘা বাঘা শহরকে পেছনে ফেলে টানা পাঁচবার বিজয়ী হিসেবে সিউলকে দেওয়া হয়েছে বিশেষ ‘কুইন্ট স্ট্যাটাস’ এবং স্থান দেওয়া হয়েছে ‘হল অব ফেম’-এ।

সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইলের টানে পর্যটক

আগে সিউলে যাওয়া পর্যটকদের সফর সীমাবদ্ধ থাকত ঐতিহাসিক রাজপ্রাসাদ বা রাজকীয় জাদুঘরের চারদেয়ালে। কিন্তু বর্তমানের ডিজিটাল নেটিভ তরুণেরা খুঁজছেন লাইফস্টাইল ট্যুরিজম। অর্থাৎ তাঁরা সাধারণ কোরীয়দের দৈনন্দিন জীবনের আসল রূপ দেখতে চাইছেন।

কে-ফ্যাশন ও বিউটি ট্রেন্ড

কে-ড্রামায় প্রিয় তারকার পরা কাস্টমাইজড পোশাক কিংবা মেকআপ লুকের খোঁজে তরুণেরা এখন ভিড় করছেন সিউলের সংসু-দং-এর মতো হাই-ফ্যাশন ও পপ-আপ শপগুলোতে। তবে আধুনিক ফ্যাশন ও স্কিন কেয়ারের ট্রেন্ড নিজের ত্বকে পরীক্ষা করে নেওয়ার চমৎকার সুযোগ দিচ্ছে পপ-আপ এই কালচার।

কে-ফুড ও স্ট্রিট কালচার

কে-ড্রামাগুলোতে মাঝে মাঝেই দেখানো হয়ে থাকে খাওয়াদাওয়ার দৃশ্য। সেখানে ভেসে ওঠে ধোঁয়া ওঠা নুডলস, স্যুপ, রামেন কিংবা ভাজা মাংস খাওয়ার দৃশ্য। তাই বিকেলের মুখরোচক খাবারের জন্য পর্যটকেরা ছুটছেন ঐতিহাসিক গোয়াংজাং মার্কেটে। সেখানে গরম-গরম মুগ ডালের প্যানকেক কিংবা ঝাল রাইস কেক (টপোক্কি) খাওয়ার অনুভূতি ঠিক যেন কে-ড্রামার জনপ্রিয় দৃশ্যের মতো।

রেট্রো ও হিপ-জিরো ভাইব

ভিনটেজ পোশাকের সন্ধানে দোংমাইও ফ্লি মার্কেট কিংবা পুরোনো গলির ভেতর আধুনিক ক্যাফে কালচারের স্বাদ নিতে উলজিরোর গলিঘুঁজিতে ঘুরছেন তরুণেরা। সিউল এআই ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, গত এক বছরে আধুনিক নকশার ডংদেমুন ডিজাইন প্লাজায় বিদেশি পর্যটকদের যাতায়াত প্রায় ১২ শতাংশ এবং ঐতিহাসিক গোয়াংজাং মার্কেটে প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে।

গণপরিবহনের আধুনিক রূপ

সিউলের বড় চমক হলো, এর ভৌগোলিক সুবিধা এবং গণপরিবহনের সহজলভ্যতা। সকালে সংসু-দংয়ে কে-বিউটি শপিং শেষে মাত্র কয়েক মিনিটের পাবলিক ট্রানজিট ধরে পর্যটকেরা পৌঁছে যাচ্ছেন আছাসান বা গোয়ানাকসান পর্বতের পাদদেশে। শহরের সীমা পার না হয়েই হাইকিং বুট পায়ে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে সূর্যাস্ত দেখার এই অভিজ্ঞতা অনন্যসাধারণ এক সংযোজন। আছাসান পর্বতের ট্রেইলে বিদেশি পর্যটকদের যাতায়াত গত বছরের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে।

নিরাপত্তা ও অর্থনীতির নতুন সমীকরণ

একা ভ্রমণকারী তরুণীদের কাছে সিউল বিশ্বের অন্যতম ট্রাস্টেড ডেস্টিনেশন হয়ে উঠেছে মূলত তিন কারণে—সহজলভ্য গণপরিবহন, সর্বব্যাপী স্মার্ট পরিকাঠামো এবং অপরাধমুক্ত পরিবেশ। আর এই এক্সপেরিয়েনশিয়াল ট্যুরিজমের সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে কোরিয়ার অর্থনীতিতে। হিসাব অনুযায়ী, গত এপ্রিলে প্রায় ১৫ লাখ ৬০ হাজার বিদেশি পর্যটক সিউল ভ্রমণ করে কার্ড পেমেন্টের মাধ্যমে রেকর্ড ১ দশমিক ১৫৩ ট্রিলিয়ন কোরিয়ান ওন ব্যয় করেছেন। এ ছাড়া ২০২৫ সালে সিউল ৩১৭টি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করে এশিয়ায় প্রথম এবং বিশ্বে তৃতীয় স্থান পাওয়ার মধ্য দিয়ে পেশাদার ব্যবসায়িক ভ্রমণ এবং বিনোদনের এক শক্তিশালী কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

তরুণ পর্যটকদের এই আকর্ষণ ধরে রাখতে সিউল মেট্রোপলিটন গভর্নমেন্ট ও সিউল ট্যুরিজম অর্গানাইজেশন এখন তাদের খাদ্য, শপিং ও প্রকৃতির মেলবন্ধনে হ্যান্ডস-অন বা বাস্তব অভিজ্ঞতামূলক ট্যুরিজম প্যাকেজ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। কে-পপের সুর, কে-ড্রামার রোমান্স আর আধুনিক নগর-সংস্কৃতির এই মেলবন্ধনে সিউল যেন আজ সত্যিই তরুণ প্রজন্মের কাছে এক স্বপ্নপুরী।

সূত্র: দ্য কোরিয়া টাইম, দ্য চোসুনিলবো

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত