Ajker Patrika

একমাত্র সন্তান নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণার বিপরীতে বাস্তবতা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
একমাত্র সন্তান নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণার বিপরীতে বাস্তবতা
ছবি: সংগৃহীত

সমাজে একমাত্র সন্তানদের নিয়ে নানা ধরনের প্রচলিত ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, ভাইবোন না থাকায় তারা একাকী, স্বার্থপর, আদুরে, জেদি কিংবা সামাজিকভাবে অদক্ষ হয়ে ওঠে। কিন্তু দীর্ঘদিনের গবেষণা বলছে, এসব ধারণার পক্ষে শক্ত কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তারপরও একমাত্র সন্তানদের নিয়ে গৎবাঁধা কিছু সামাজিক পূর্বধারণা আজও টিকে আছে।

শৈশব থেকেই একমাত্র সন্তানদের প্রায়ই প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। যেমন—‘তোমার কি একা লাগে না?’ , ‘একটা ভাই বা বোন থাকলে ভালো হতো না?’ বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সহানুভূতির এই জায়গাটুকু আবার দখল করে নেয় সমালোচনা। দৃঢ় মত প্রকাশ করলেই বা একটু আলাদা আচরণ করলেই শুনতে হয়, ‘তুমি তো একমাত্র সন্তান!’ অর্থাৎ ব্যক্তিত্বের নানা বৈশিষ্ট্যকে ভাইবোন না থাকার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত।

সম্প্রতি এই বিষয়ে গবেষণার আলোকে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ্লেষণধর্মী পত্রিকা ‘দ্য আটলান্টিক’। পত্রিকাটির মতে, একমাত্র সন্তানদের নিয়ে প্রচলিত ধারণার শিকড় লুকিয়ে রয়েছে উনিশ শতকের শেষ দিকে। ১৮৯৬ সালে ক্লার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ই ডব্লিউ বোহানন এক গবেষণায় দাবি করেছিলেন—একমাত্র সন্তানেরা কল্পনার জগতে বেশি থাকে, অন্য শিশুদের সঙ্গে সহজে মিশতে পারে না, অতিরিক্ত আদরে নষ্ট হয়ে যায় এবং শারীরিকভাবেও দুর্বল হয়। পরে আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম সভাপতি জি স্ট্যানলি হল আরও কঠোর মন্তব্য করে বলেছিলেন, ‘একমাত্র সন্তান হওয়াটাই এক ধরনের রোগ।’ যদিও সেই গবেষণার সীমাবদ্ধতা ছিল স্পষ্ট। অংশগ্রহণকারী অনেক শিশুই ছিল বিচ্ছিন্ন গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা, যেখানে অন্য শিশুদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ খুব কম ছিল।

পরবর্তী কয়েক দশকে একমাত্র সন্তান নিয়ে এসব ধারণা আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বই, সংবাদপত্র, সিনেমা ও টেলিভিশনে একমাত্র সন্তানদের প্রায়ই আদুরে, আত্মকেন্দ্রিক বা অদ্ভুত চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে। হ্যারি পটার সিরিজের হারমায়োনি গ্রেঞ্জার, চার্লি অ্যান্ড দ্য চকলেট ফ্যাক্টরির ভেরুকা সল্ট কিংবা গিলমোর গার্লস–এর রোরি গিলমোরের মতো চরিত্রগুলোও এই ধারণাকে কোনো না কোনোভাবে আরও শক্তিশালী করেছে।

তবে বাস্তবে চিত্রটি ভিন্ন। আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, একমাত্র সন্তানেরা সাধারণত বাবা-মায়ের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে যোগাযোগে স্বচ্ছন্দ হয়। স্কুল, খেলাধুলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে তারা সমবয়সীদের সঙ্গেও স্বাভাবিকভাবে মিশে যায়। ফলে সামাজিক দক্ষতার ক্ষেত্রে তাদের উল্লেখযোগ্য কোনো ঘাটতি দেখা যায় না।

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, একমাত্র সন্তানদের বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষার স্কোর তুলনামূলক বেশি হতে পারে এবং তাদের শিক্ষাগত লক্ষ্যও উচ্চাভিলাষী হয়। এর একটি কারণ হতে পারে, বাবা-মায়ের সময়, মনোযোগ ও অর্থনৈতিক সম্পদের পুরোটা একজন সন্তানের পেছনেই ব্যয় হয়। এ ছাড়া কর্মজীবন, বিবাহ, সামাজিক অবস্থান কিংবা ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে একমাত্র সন্তান ও ভাইবোন থাকা মানুষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি।

তবে কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, একমাত্র সন্তানেরা একা সময় কাটাতে তুলনামূলক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে পারে এবং দলগত কর্মকাণ্ডে কিছুটা কম আগ্রহী হতে পারে। আবার চীনে পরিচালিত একটি এমআরআইভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, একমাত্র সন্তানদের সৃজনশীলতা বেশি হলেও অন্যদের সঙ্গে সহজে মানিয়ে নেওয়ার প্রবণতা কিছুটা কম হতে পারে। তবে গবেষকদের মতে, এর পেছনে পারিবারিক কাঠামোর চেয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আজকের বিশ্বে পরিবার ছোট হয়ে আসছে। অর্থনৈতিক চাপ, কর্মজীবনের অগ্রাধিকার এবং দেরিতে সন্তান নেওয়ার প্রবণতার কারণে একমাত্র সন্তানের সংখ্যা বাড়ছে। তবুও বহু সমাজে এখনো ‘আদর্শ পরিবার’ বলতে একাধিক সন্তানের পরিবারকেই বোঝানো হয়। ফলে একমাত্র সন্তানদের ঘিরে পুরোনো ধারণাগুলো টিকে আছে।

সব মিলিয়ে গবেষণার বার্তা স্পষ্ট—একমাত্র সন্তান হওয়া কোনো দুর্বলতা নয়। বরং ব্যক্তিত্ব, সামাজিক দক্ষতা বা ভবিষ্যৎ সাফল্য নির্ধারণে ভাইবোনের উপস্থিতির চেয়ে পারিবারিক পরিবেশ, ভালোবাসা, শিক্ষা ও সামাজিক অভিজ্ঞতার প্রভাবই অনেক বেশি হয়ে থাকে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত