Ajker Patrika

তালাক দেওয়ার সর্বোত্তম পদ্ধতি ও ইসলামের বিধান

  • তালাক আল্লাহর কাছে বৈধ কাজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ঘৃণিত
  • হুট করে তালাক দেওয়া ইসলাম সমর্থন করে না
  • তালাক দেওয়ার সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো ‘তালাকে আহসান’
মুফতি হাসান আরিফ
তালাক দেওয়ার সর্বোত্তম পদ্ধতি ও ইসলামের বিধান
তালাক আল্লাহর কাছে বৈধ কাজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ঘৃণিত বিষয়। ছবি: সংগৃহীত

দাম্পত্যজীবনে অনেক সময় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যেখানে স্বামী-স্ত্রীর একত্রে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ইসলাম ধর্ম দাম্পত্যসম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিলেও একান্ত নিরুপায় অবস্থায় ‘তালাক’ বা বিচ্ছেদের অনুমতি দিয়েছে। তবে হুট করে তালাক দেওয়া ইসলাম সমর্থন করে না। তালাক দেওয়ার আগে যেমন কিছু সংশোধনমূলক পদক্ষেপ রয়েছে, তেমনি তালাক দেওয়ারও একটি সর্বোত্তম পদ্ধতি রয়েছে।

তালাকের আগে সংশোধনের ৩টি পদক্ষেপ

স্ত্রী যদি অবাধ্য হয় বা উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপন করে, তবে সরাসরি তালাক না দিয়ে স্বামী নিচের তিনটি পদক্ষেপ ক্রমান্বয়ে অনুসরণ করবে:

  • ১. সদুপদেশ ও বুঝিয়ে বলা: রাগের মাথায় উত্তেজিত না হয়ে স্ত্রীকে মিষ্টি ভাষায় বোঝানো এবং মায়া-মমতার মাধ্যমে ভুল ধরিয়ে দেওয়া।
  • ২. শয্যা বর্জন: প্রথম ধাপে কাজ না হলে সাময়িকভাবে স্ত্রীর সঙ্গে একত্রে রাতযাপন থেকে বিরত থাকা বা বিছানা পৃথক করা। এতে স্ত্রী নিজের ভুল বুঝতে পারার সুযোগ পায়।
  • ৩. সালিসের মাধ্যমে মীমাংসা: ব্যক্তিগত চেষ্টায় কাজ না হলে উভয় পক্ষ থেকে (স্বামী ও স্ত্রীর পরিবার থেকে) বিজ্ঞ ব্যক্তিদের মাধ্যমে সালিস করে সমস্যা নিরসনের আপ্রাণ চেষ্টা করা। (সুরা নিসা: ৩৫)

তালাক দেওয়ার সর্বোত্তম পদ্ধতি

যদি সব চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং বিচ্ছেদ অনিবার্য হয়ে পড়ে, তবে ইসলামি শরিয়ত মতে তালাক দেওয়ার সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো ‘তালাকে আহসান’। এর নিয়মগুলো হলো:

  1. পবিত্র অবস্থায় তালাক: স্ত্রী যখন হায়েজ (মাসিক ঋতুস্রাব) থেকে পবিত্র হবে, তখন সেই পবিত্রকালীন সময়ে (যাকে ফিকহের ভাষায় ‘তুহুর’ বলা হয়) তালাক দিতে হবে।
  2. সহবাস না করা: যে পবিত্র অবস্থায় তালাক দেওয়া হবে, সেই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনো শারীরিক মিলন বা সহবাস হওয়া যাবে না।
  3. স্পষ্ট এক তালাক: স্বামী সুস্পষ্ট শব্দে কেবল ‘এক তালাক’ দেবে।

কেন এটি সর্বোত্তম পদ্ধতি

  • ১. ফিরে আসার সুযোগ: এক তালাক দেওয়ার পর ইদ্দত চলাকালীন (তিন মাস বা তিন ঋতুস্রাব) স্বামী চাইলে স্ত্রীকে পুনরায় ফিরিয়ে নিতে পারে। এতে নতুন করে বিয়ের প্রয়োজন হয় না।
  • ২. অনুতাপের অবকাশ: অধিকাংশ ক্ষেত্রে তালাকের পর স্বামী-স্ত্রী উভয়ে অনুতপ্ত হয়। এক তালাক দিলে পুনরায় ঘর বাঁধার পথ খোলা থাকে। কিন্তু একসঙ্গে তিন তালাক দিলে সেই সুযোগ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
  • ৩. ধীরস্থির সিদ্ধান্ত: হুটহাট সিদ্ধান্ত না নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চিন্তা করার সুযোগ পাওয়া যায়।

তালাকে হাসান ও তালাকে বিদয়ি

  1. তালাকে হাসান: এটিও জায়েজ পদ্ধতি। এতে পরপর তিনটি পবিত্র অবস্থায় (তুহুর) একটি করে মোট তিনটি তালাক দেওয়া হয়।
  2. তালাকে বিদয়ি (নিষিদ্ধ পদ্ধতি): মাসিক অবস্থায় তালাক দেওয়া অথবা একসঙ্গে তিন তালাক দেওয়াকে ‘তালাকে বিদয়ি’ বলা হয়। এটি শরিয়তে নিষিদ্ধ ও গুনাহের কাজ। যদিও এভাবে তালাক দিলে তা কার্যকর হয়ে যায়, কিন্তু এর ফলে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য চিরতরে হারাম হয়ে যায় এবং ফিরে আসার সব পথ বন্ধ হয়ে যায়।

নারীদের বিচ্ছেদের অধিকার

ইসলামে তালাকের মূল অধিকার স্বামীর হাতে থাকলেও নারীদের একদম নিরুপায় করে রাখা হয়নি। নারীরা নিচের উপায়ে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে:

  1. তালাকে তাফভিজ: বিয়ের সময় স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার অধিকার দেয়।
  2. খোলা তালাক: স্বামী ও স্ত্রী আপসের মাধ্যমে বিনিময় বা অর্থের বিনিময়ে বিচ্ছেদ ঘটানো।
  3. আদালতের মাধ্যমে: স্বামী নিখোঁজ হলে, নপুংসক হলে বা ভরণপোষণ না দিলে বিচারকের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদ করা।

তালাক আল্লাহর কাছে বৈধ কাজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ঘৃণিত। তাই চরম অনিবার্য পরিস্থিতি ছাড়া এই পথে না যাওয়াই শ্রেয়। আর যদি দিতেই হয়, তবে অবশ্যই সুন্নাহ বা ‘আহসান’ পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত, যাতে পরে অনুতপ্ত হলে পুনরায় দাম্পত্যজীবন শুরুর পথ খোলা থাকে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত