Ajker Patrika

ইরানের ভয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ঘাঁটিগুলোকে ইসরায়েলে সরানোর পরামর্শ সাবেক মার্কিন জেনারেলের

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৬, ১২: ০৮
ইরানের ভয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ঘাঁটিগুলোকে ইসরায়েলে সরানোর পরামর্শ সাবেক মার্কিন জেনারেলের
কাতারের আল–উদেইদ ঘাঁটিতে মার্কিন গ্লোবমাস্টার পরিবহন বিমান। ছবি: এএফপি

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে মার্কিন সামরিক সম্পদ আরও ভালোভাবে সুরক্ষিত রাখতে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো ইসরায়েল ও আশপাশের দেশগুলোতে স্থানান্তর করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সাবেক প্রধান জেনারেল ফ্র্যাঙ্ক ম্যাকেঞ্জি। লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

গত সপ্তাহে জিউইশ ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি অব আমেরিকা আয়োজিত ওয়েবিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, কাতারে অবস্থিত আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিতে সেন্টকমের ফরোয়ার্ড সদর দপ্তর রাখা কৌশলগতভাবে যৌক্তিক নয়। ম্যাকেঞ্জি বলেন, ‘যে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষই ইরান থেকে মাত্র ১০০ মাইল দূরে, কাতারে সেন্টকমের ফরোয়ার্ড সদর দপ্তর রাখবে না। অথচ সেটিই এখন রয়েছে।’

২০১৯ সালের ২৮ মার্চ থেকে ২০২২ সালের ১ এপ্রিল পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীর সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ম্যাকেঞ্জি জানান, ২০২২ সালেই তিনি এবং আরও কয়েকজন কর্মকর্তা বাইডেন প্রশাসনকে সতর্ক করেছিলেন যে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো ইরানি হামলার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

তাঁদের প্রস্তাব ছিল, ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র যেন আরও পশ্চিমে অবস্থিত ঘাঁটি ব্যবহার করতে পারে। সম্ভাব্য স্থানগুলোর মধ্যে ছিল ইসরায়েল, মিশর এবং আরও কয়েকটি দেশ। ম্যাকেঞ্জির ভাষায়, ‘আমরা তখনকার বাইডেন প্রশাসনের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিলাম যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হলে আমরা যেন পশ্চিমে, ইসরায়েল ও মিশরসহ বিভিন্ন স্থানে ঘাঁটি ব্যবহার করার বিষয়টি বিবেচনা করি।’

তবে তাঁর দাবি, বাইডেন প্রশাসন ওই প্রস্তাব ‘আগ্রাসীভাবে’ প্রত্যাখ্যান করেছিল।

ম্যাকেঞ্জির মতে, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যে ঘাঁটি ব্যবস্থা রয়েছে, তা মূলত শীতল যুদ্ধের সময়কার একটি উত্তরাধিকার, যখন তেলসমৃদ্ধ আরব উপসাগরীয় দেশগুলোতে সম্ভাব্য সোভিয়েত আগ্রাসন ঠেকানো ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কৌশলগত লক্ষ্য। পরে ইরাক ও আফগানিস্তানে পরিচালিত বিদ্রোহবিরোধী যুদ্ধও এই কাঠামোকে টিকিয়ে রেখেছে। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান কৌশল এখন আর মাটির বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’

ম্যাকেঞ্জির এই মন্তব্য গত জুনে মিডল ইস্ট আই প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ওই প্রতিবেদনে সাবেক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল, সাম্প্রতিক যুদ্ধে ইরান যেভাবে মার্কিন ঘাঁটির দুর্বলতা উন্মোচন করেছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ঘাঁটি ব্যবস্থার পুনর্গঠন করতে হতে পারে।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, ইরান কার্যত যুক্তরাষ্ট্রকে উপসাগরীয় উপকূল থেকে সরে যেতে বাধ্য করেছে। মিডল ইস্ট আই প্রথম জানায়, রিয়াদের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানের ব্যাপক হামলার পর গত মার্চে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের তাইফ বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি লাভ করে।

একই সময়ে উপসাগরীয় উপকূলজুড়ে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোও ইরানের হামলায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ইরান বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর, কাতারে সেন্টকমের সদর দপ্তর এবং কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। ওপেন সোর্স বিশ্লেষক এবং কিছু কর্মকর্তা ইরান ঠিক কতটা ক্ষতি করতে পেরেছিল, তা নিয়ে বিতর্ক করলেও ম্যাকেঞ্জি বলেন, শুধু স্যাটেলাইট ছবি দেখে কোনো ঘাঁটি কার্যকর আছে কি না, তা নির্ধারণ করা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

তাঁর ব্যাখ্যায়, কোনো ঘাঁটির হ্যাঙ্গার, রাডার স্থাপনা ও সেনা ব্যারাক ধ্বংস হয়ে গেলেও ভূগর্ভস্থ জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং রানওয়ে অক্ষত থাকতে পারে। ফলে যুদ্ধবিমান সেখানে অবতরণ ও উড্ডয়ন চালিয়ে যেতে সক্ষম হবে। তিনি বলেন, ‘সম্ভাব্য শত্রুর কাছাকাছি থাকলে যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছাতে সময় কম লাগে, যা সুবিধাজনক। কিন্তু একই সঙ্গে সেটি বিপজ্জনকও, কারণ শত্রুও খুব দ্রুত আপনাকে আঘাত করতে পারে।’

ম্যাকেঞ্জি বলেন, আরব মিত্রদের প্রতি সংহতি প্রদর্শনের জন্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা উচিত। তাঁর মতে, ওই ঘাঁটিগুলো মূলত জ্বালানি ভরার মতো লজিস্টিক সহায়তায় ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি স্থানান্তর করা উচিত ইসরায়েল, মিশর এবং সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলীয় এলাকায়।

তিনি বলেন, ‘আমাদের পশ্চিম দিকে তাকাতে হবে। ইসরায়েলে ঘাঁটি স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। আমার মতে, এটি একটি চমৎকার ধারণা।’ ম্যাকেঞ্জির মতে, প্রবেশাধিকার, ঘাঁটি স্থাপন এবং আকাশপথ ব্যবহারের অনুমতি সংক্রান্ত বিধিনিষেধের দিক থেকে ইসরায়েল অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি সুবিধাজনক। তিনি আরও বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর তুলনায় ইসরায়েল উন্নততর আকাশ প্রতিরক্ষা সুবিধাও দিতে পারবে।

কারণ, মার্কিন বাহিনীকে যেসব দেশে ঘাঁটি আছে, অন্য দেশে হামলা চালাতে আগে সেসব দেশের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি নিতে হয়। যুদ্ধের শুরুতে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে তাদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। পরে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় অংশ নেয় এবং এবং নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয়।

ম্যাকেঞ্জি বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বাগতিক দেশ। কারণ তারা চাইবে, তাদের ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করা যুদ্ধবিমান কোথায় যাবে, সে বিষয়ে তাদেরও মতামত থাকুক। সম্ভবত ইসরায়েলই এমন একটি দেশ, যেখানে আপনার যুদ্ধবিমানগুলোর ওপর সবচেয়ে কম বিধিনিষেধ থাকবে। আর এ কারণেই ইসরায়েল বিশেষভাবে আকর্ষণীয় একটি অবস্থান।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত