Ajker Patrika

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ: যুদ্ধবিরতি কার্যকরে অনিশ্চয়তা

  • দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মধ্যেই লেবাননে ব্যাপক হামলা। নিহত অন্তত ১১২।
  • লেবাননে হামলার নিন্দা জানিয়ে হরমুজ আবারও বন্ধ করল ইরান।
  • ট্রাম্প ও পেন্টাগনের ইঙ্গিত, শর্ত না মানলে ইরানে আবারও হামলা।
  • লেবাননে হামলা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর।
আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ: যুদ্ধবিরতি কার্যকরে অনিশ্চয়তা
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর জাতীয় পতাকা উড়িয়ে ইরানিদের বিজয় উল্লাস। গতকাল তেহরান স্কয়ারে। ছবি: এএফপি

টানা ৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত আর চরম উত্তেজনার পর অবশেষে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে কিছুটা স্বস্তির বাতাস বইতে শুরু করেছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। গত মঙ্গলবার রাতে ট্রাম্পের এমন ঘোষণার পর দুই পক্ষ হামলাও বন্ধ করেছে। তবে গতকাল বুধবার লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রতিবাদে আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এতে যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় চাপের মুখে পড়েন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই যুদ্ধ থামাতে বা ইরানকে সমঝোতায় আসার জন্য তিনি (বাংলাদেশ সময়) গতকাল বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন। এই সময় শেষ হওয়ার আগেই গত মঙ্গলবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির সমঝোতা হয়েছে।

তবে এই সাময়িক যুদ্ধবিরতির পেছনে একটি কঠোর শর্ত জুড়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন, এই স্থগিতাদেশ তখনই কার্যকর থাকবে, যখন ইরান অবিলম্বে ‘সম্পূর্ণ এবং নিরাপদভাবে’ আন্তর্জাতিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেবে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের দেওয়া বিশেষ প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতেই ট্রাম্প এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ট্রাম্প তাঁর মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের বিশেষ অনুরোধে ইরানের ওপর পূর্বনির্ধারিত ‘বিধ্বংসী হামলা’ দুই সপ্তাহের জন্য তিনি স্থগিতে রাজি হয়েছেন। ইরান শর্ত না মানলে এই আবারও সংঘাত শুরু হতে পারে এমন ইঙ্গিত দেন ট্রাম্প।

এ ছাড়া মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও ঘোষণা দেন, তাদের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। এদিকে ইরানের পক্ষ থেকে এই তথ্য নিশ্চিত করে গতকাল ভোরে এক্সে এক বার্তায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানান, পাকিস্তানের মাধ্যমে তাদের কাছে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব এসেছিল। তারা এতে রাজি হয়েছে। তবে তিনি শর্ত জুড়ে দেন, তাদের ওপর হামলা বন্ধ হওয়া সাপেক্ষে তারা হামলা বন্ধ করবে।

ইসরায়েলের বাগড়া

তবে এই যুদ্ধবিরতিতে বাগড়া দেয় ইসরায়েল। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, তাঁরা শুধু ইরানের ক্ষেত্রে যুদ্ধবিরতি শর্ত মেনে চলবে, লেবাননে হামলা চালিয়ে যাবে। নেতানিয়াহুর এমন ঘোষণার আগে ও পরে লেবাননে ব্যাপক হামলা হয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির সমঝোতা হওয়ার পরও লেবাননে ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। এই যুদ্ধ শুরুর পর গতকাল বুধবার রাজধানী বৈরুতসহ দেশজুড়ে সবচেয়ে ভয়াবহ বোমা হামলা হয়েছে।

খবরে বলা হয়েছে, রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েলের স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ হামলায় দেশজুড়ে চরম আতঙ্ক ছড়িয়েছে। দেশজুড়ে ইসরায়েলি হামলায় কয়েক ডজন মানুষ নিহত এবং শত শত মানুষ আহত হয়েছেন। আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, এসব হামলায় অন্তত ৮৯ জন নিহত এবং ৭০০ জন আহত হয়েছে।

এএফপি টিভির সরাসরি সম্প্রচারে রাজধানী বৈরুত ও এর শহরতলি থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়তে দেখা যায়। এ ছাড়া লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অ্যাম্বুলেন্স চলাচলের সুবিধার্থে রাজধানীর রাস্তাগুলো দ্রুত ফাঁকা করার জরুরি নির্দেশ দেওয়ার আগেই রাস্তায় মানুষের মাঝে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, অত্যন্ত উদ্বেগজনকভাবে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো লেবাননের বেশ কয়েকটি এলাকায় একযোগে বিমান হামলা চালিয়েছে, যার প্রাথমিক হিসাবে কয়েক ডজন মানুষ নিহত এবং শত শত মানুষ আহত হয়েছে।

এমন হামলার পর ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দাবি করেছেন, তাঁদের সামরিক বাহিনী গতকাল লেবাননজুড়ে হিজবুল্লাহর শত শত সদস্যকে লক্ষ্য করে আকস্মিক হামলা চালিয়েছে। ২০২৪ সালের পেজার বোমা হামলার পর এটি হিজবুল্লাহর ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত বলে দাবি করেন তিনি।

এদিকে বৈরুত থেকে এএফপির সাংবাদিকেরা জানিয়েছেন, কোনো সতর্কবার্তা না দিয়েই বৈরুতে একযোগে হামলা চালানো হয়। প্রাণ বাঁচাতে রাস্তায় থাকা মানুষজন দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করে, আর গাড়িচালকেরা পথ পরিষ্কার করতে মরিয়া হয়ে হর্ন বাজাতে থাকেন।

বৈরুতের একটি দোকানে কর্মরত ইয়াসের আবদুল্লাহ এএফপিকে বলেন, ‘আমি বিস্ফোরণটি দেখেছি, এটি প্রচণ্ড শক্তিশালী ছিল। সেখানে বেশ কয়েকটি শিশু মারা গেছে। যাদের কারও কারও হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।’

যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হিজবুল্লাহর

ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পরও ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহও যুদ্ধবিরতি মেনে চলার ঘোষণা দেয়। গত মঙ্গলবার রাত ১টার পর থেকে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে কোনো হামলাও চালায়নি। তবে এরপরও লেবাননে হামলা চালায় ইসরায়েল। এই পরিস্থিতি প্রসঙ্গে হিজবুল্লাহর নেতা ও লেবাননের পার্লামেন্টের সদস্য ইব্রাহিম আল-মৌসাওই বলেন, তাঁদের জানানো হয়েছিল, হিজবুল্লাহও এই যুদ্ধবিরতির অংশীদার। এ কারণে তাঁরা আর হামলা চালাননি। তবে ইসরায়েলে বরাবরের মতো যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। ইসরায়েল এখনো লেবাননে গণহত্যা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

যুদ্ধবিরতি নিয়ে ধোঁয়াশা

গতকাল বুধবার সকালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এক্সে এক পোস্টে দাবি করেন, ‘তাঁর মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র লেবাননসহ সব রণাঙ্গনে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।’ কিন্তু এই ঘোষণার মাত্র চার ঘণ্টা পরেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি ইংরেজি বিবৃতি জারি করা হয়। সেখানে স্পষ্ট করে বলা হয়, দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতি লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়।

তবে গতকাল ট্রাম্পও দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যে যুদ্ধবিরতি হয়েছে, এর মধ্যে লেবানন নেই।

এ ছাড়া মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বলেন, ‘আমরা আশা করি, ইরান স্থায়ী শান্তির পথ বেছে নেবে। তবে মনে রাখতে হবে, এটি কেবল একটি বিরতি। আমাদের যৌথ বাহিনী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। যদি নির্দেশ দেওয়া হয়, তবে গত ৩৮ দিনে আমরা যে গতি ও নির্ভুলতা দেখিয়েছি, সেই একই শক্তিতে আবারও লড়াই শুরু করব।’

ট্রাম্প ও পেন্টাগন থেকে এমন ঘোষণা আসার পর ইরানও প্রতিক্রিয়া দেখায়। তারা জানায়, লেবাননে হামলার জেরে তারা হরমুজ বন্ধ করে দেবে।

তবে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ লেবাননের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি এই যুদ্ধবিরতির শর্তের মধ্যে লেবাননে হামলা বন্ধের বিষয়টি যুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

এই যুদ্ধবিরতি প্রসঙ্গে মার্কিন স্পেশাল অপারেশন ফোর্সের সাবেক উপদেষ্টা ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ সেথ জোনস বলেন, যখন কোনো পক্ষই তাদের ন্যূনতম লক্ষ্য অর্জন করতে পারে না, তখন সেই যুদ্ধবিরতি আসলে শুধু একটি ‘টাইম-আউট’ হিসেবে কাজ করে, যা পরবর্তী বড় সংঘাতের রসদ জোগায়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

আ.লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের অধ্যাদেশ: শেষ মুহূর্তে সময় চাইলেন বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার বললেন—সুযোগ নেই

ইরানের ১০ দফা প্রস্তাব—শান্তির রূপরেখা নাকি ট্রাম্পের জন্য কূটনৈতিক ফাঁদ

ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি ‘লঙ্ঘন’, ফের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করল ইরান

হরমুজ প্রণালিতে কি ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলো

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রেখেই সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ সংসদে পাস

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত