Ajker Patrika

হরমুজ হয়ে জাহাজ চলাচল বেড়েছে ১০৫%, রুট নিয়ে দ্বন্দ্ব ইরান-ওমানের

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৬ জুন ২০২৬, ০৯: ৩১
হরমুজ হয়ে জাহাজ চলাচল বেড়েছে ১০৫%, রুট নিয়ে দ্বন্দ্ব ইরান-ওমানের
প্রতীকী ছবি

ইরান যুদ্ধ এবং দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে সৃষ্ট কয়েক মাসের অচলাবস্থা কাটিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ জুন এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ পারাপারের সংখ্যা ১০৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৭০টিতে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ৫৩টিই ছিল বাণিজ্যিক এবং কম ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজ।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান মাইন অপসারণ কার্যক্রমের মাধ্যমে ঝুঁকিমুক্ত করা রুট এবং ওমানের সহায়তায় তৈরি বিকল্প পথ ব্যবহার শুরু হওয়ায় জাহাজ চলাচলের এই বড় উত্থান ঘটেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অগ্রগতি মূলত মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা হ্রাসের সম্ভাব্য ইঙ্গিত দেয়, যা শিপিং অপারেটরদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পাদিত সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারক (MoU) এবং এই অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপকারী মার্কিন নৌ অবরোধের আপাত সমাপ্তির পরই এই ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক ট্রাফিক বা চলাচল পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি। ট্র্যাকিং এড়াতে কিছু জাহাজের অদৃশ্য থাকার বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার, মাইন অপসারণের কাজ অসম্পূর্ণ থাকা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও এই জলপথের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে এখনো গভীর উদ্বেগ রয়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নতুন হুঁশিয়ারি।

ইরানের হুঁশিয়ারি ও ওমানের করিডর নিয়ে দ্বিমত

আইআরজিসি বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছে, তেহরানের পূর্ব অনুমোদন ছাড়া হরমুজ প্রণালির কোনো রুটই ব্যবহার করা যাবে না। স্ট্র্যাটেজিক বা কৌশলগত এই জলপথটির স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান অত্যন্ত ভঙ্গুর আলোচনার মাঝেই এই হুঁশিয়ারি নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে।

এই হুঁশিয়ারির সূত্রপাত গত বুধবার, যখন ওমান এই প্রণালির মধ্য দিয়ে একটি নতুন শিপিং করিডর বা নৌপথের ঘোষণা দেয়। ওমান জানায়, সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে চলা অচলাবস্থার পর জাহাজ চলাচল নিরাপদ করতে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় করে এই রুটটি তৈরি করা হয়েছে। তবে আইআরজিসি এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করে দাবি করেছে, রুটটি ঘোষণার আগে ইরানের সঙ্গে কোনো পরামর্শ বা আলোচনা করা হয়নি।

আইআরজিসি এক বিবৃতিতে বলে, ‘কিছু কর্তৃপক্ষ ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে পূর্ব নোটিশ না দিয়ে বা কোনো সমন্বয় না করেই হরমুজ প্রণালিতে একটি নতুন শিপিং রুটের ঘোষণা দিয়েছে। এই প্রস্তাবিত রুটটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এটি মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে।’ বাহিনীটি স্পষ্ট করে জানায়, ‘হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের একমাত্র অনুমোদিত রুট হলো সেগুলোই, যা ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্র দ্বারা নির্ধারিত।’ একই সঙ্গে এই জলপথ দিয়ে যাওয়ার সময় সব জাহাজকে আইআরজিসি নেভির সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ওমানের অবস্থান ও ট্রানজিট ফি

এদিকে ওমান তাদের ঘোষিত নতুন রুটের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়ে বলেছে, নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই এটি তৈরি করা হয়েছে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি এক বিবৃতিতে বলেন, প্রণালিটি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজসমূহের যাতায়াতের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ওমান কাজ করে যাবে। তিনি আরও স্পষ্ট করে দেন, ‘এই প্রণালি-সংক্রান্ত ভবিষ্যৎ কোনো ব্যবস্থার বা করিডরের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ট্রানজিট ফি আরোপ করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত নেই।’

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই শিপিং রুটটি দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে যখন বাণিজ্যিক চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই রুট নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওমান ও ইরানের এই দ্বিমত সামনে এল।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি ও অনিশ্চয়তা

এই ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন এমন একসময়ে ঘটছে, যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ইরান যুদ্ধের স্থায়ী অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। এই অস্থায়ী চুক্তির অধীনে মূল বিষয়গুলো চূড়ান্ত করতে উভয় পক্ষ ৬০ দিনের একটি সময়সীমা পেয়েছে। তবে চুক্তির স্থায়িত্ব নিয়ে উভয় দেশের শীর্ষ নেতাদের পক্ষ থেকে আসা সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রকাশ্য ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এই ভঙ্গুর ব্যবস্থার চারপাশে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

কার্গো জাহাজে হামলা ও তেলের বাজার

উত্তেজনার পারদ আরও চড়েছে গত বৃহস্পতিবার, যখন হরমুজ প্রণালিতে জাতিসংঘ-সমর্থিত রুট দিয়ে যাওয়ার সময় একটি বাণিজ্যিক কার্গো জাহাজ প্রজেক্টাইল (ক্ষেপণাস্ত্র বা গোলা) দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়। ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর অধীনস্থ যুক্তরাজ্য মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) সেন্টার জানিয়েছে, হামলায় জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো হতাহত বা পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেনি। তেহরানের অনুমোদন ছাড়া প্রণালি ব্যবহার না করতে আইআরজিসির সতর্কবার্তা দেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় এই হামলার ঘটনা ঘটে। তবে এই হামলার পেছনে কারা ছিল এবং জাহাজটি ঠিক কোন দেশের, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

কূটনৈতিক মহলের মতে, এই জলপথে বিকল্প একটি রুট কার্যকর করা গেলে তা বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওপর থেকে চাপ কমাতে পারে এবং চূড়ান্ত শান্তিবর্তার আলোচনায় ইরানের একচেটিয়া দর-কষাকষির ক্ষমতাকে কিছুটা দুর্বল করতে পারে। উপসাগরীয় অঞ্চল সফরের সময় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, প্রণালিটি দিয়ে যেন আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল অব্যাহত থাকতে পারে—তা নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটন সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বৃহস্পতিবারের শুরুতে রুবিও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ‘যদি জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, তবে আমাদের বড় সমস্যায় পড়তে হবে।’

সামগ্রিকভাবে জাহাজ চলাচল ব্যবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও হরমুজের ট্রাফিকের পরিমাণ যুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতির চেয়ে এখনো বেশ কম। তবে আশার কথা হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম সাময়িকভাবে কমে যুদ্ধপূর্ব সময়ের মতো প্রতি ব্যারেলে প্রায় ৭৩ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এটি নির্দেশ করে যে বিশ্ববাজার এখন ধীরে ধীরে এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা করছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত