Ajker Patrika

হরমুজ নিয়ে ট্রাম্পের আস্ফালন, ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে এশিয়ার দেশগুলো

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
হরমুজ নিয়ে ট্রাম্পের আস্ফালন, ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে এশিয়ার দেশগুলো
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল সোমবার হুমকি দেন যে, আজ মঙ্গলবার ওয়াশিংটন ডিসির স্থানীয় সময় রাত ৮টার মধ্যে যদি ইরান কোনো চুক্তিতে রাজি না হয়, তাহলে তিনি ‘এক রাতেই’ ইরানকে ধ্বংস করে দিতে পারেন। তাঁর শর্ত ছিল, হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দিতে হবে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

তবে তাঁর এই সর্বশেষ হুমকির আগেই কিছু দেশ তেহরানের সঙ্গে আলাদা চুক্তি করে ফেলেছে, যাতে তাদের জাহাজগুলো এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ব্যবহার করতে পারে। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো। সর্বশেষ দেশ হিসেবে ফিলিপাইন এমন চুক্তিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। কারণ, তাদের অর্থনীতি উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার জবাবে ইরান যখন হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার হুমকি দেয়, তখন থেকেই এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি বৈশ্বিক উত্তেজনার কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই সরু জলপথ দিয়ে সাধারণত বিশ্বের মোট জ্বালানি পরিবহনের এক-পঞ্চমাংশ যাতায়াত করে। কিন্তু চলাচল ব্যাহত হওয়ায় তেলের দাম ইতিমধ্যেই লাফিয়ে বেড়েছে।

গত সপ্তাহে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো তেলের প্রয়োজন নেই। তিনি বারবার এই অঞ্চলের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোকে আহ্বান জানিয়েছেন—তারা যেন যুদ্ধজাহাজ পাঠায় এবং নিজেরাই নেতৃত্ব দিয়ে তেল পরিবহন স্বাভাবিক করে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পাকিস্তান, ভারত ও ফিলিপাইনসহ বেশ কয়েকটি এশীয় দেশ ইরানের সঙ্গে সমঝোতা করেছে, যাতে কিছু জাহাজ নিরাপদে প্রণালিটি পার হতে পারে। চীনও স্বীকার করেছে, তাদের কিছু জাহাজ এই পথে চলাচল করেছে। তবে এসব গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার পরিধি কতটা এবং ইরানের সঙ্গে এই চুক্তিগুলো কত দিন টিকবে—তা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে।

শিপিং পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মারিস্কসের দিমিত্রিস মানিয়াতিস বলেন, ‘এই নিশ্চয়তাগুলো কি কেবল কিছু নির্দিষ্ট জাহাজের জন্য, নাকি কোনো দেশের পতাকাবাহী সব জাহাজের জন্য—এখনো আমরা জানি না।’ অন্যদিকে সিডনির ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির রক শি বলেন, উপসাগরের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে—সরবরাহ পুনরায় চালু করতে হলে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতেই হবে।

ফিলিপাইনই সর্বশেষ দেশ, যারা ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে। দেশটির পররাষ্ট্রসচিব তেরেসা লাজারো জানান, ইরানি কর্মকর্তারা ফিলিপাইনের পতাকাবাহী জাহাজগুলোকে ‘নিরাপদে, বাধাহীন ও দ্রুত’ চলাচলের নিশ্চয়তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার তেহরানের সঙ্গে ‘খুবই ফলপ্রসূ ফোনালাপের’ মাধ্যমে এই চুক্তি হয়েছে, যা জ্বালানি ও সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

ফিলিপাইন তাদের ৯৮ শতাংশ তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর দেশটিতে পেট্রোলের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যাওয়ায়, তারাই প্রথম জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এনার্জি স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের রজার ফুকেট বলেন, তেহরানের দাবি—যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ছাড়া সব দেশের জন্য প্রণালি খোলা—এ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা আছে।

ফিলিপাইনকে সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে দেখা হয়। এই প্রেক্ষাপটে এটি একটি আকর্ষণীয় উদাহরণ, যা ইঙ্গিত দেয়—ইরান ‘পরিস্থিতিকে আলাদা করে বিবেচনা করতে’ রাজি। তাঁর ভাষায়, ‘ইরান মনে হচ্ছে কোনো দেশের জোটগত অবস্থান আর সংঘাতে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ—এই দুটিকে আলাদা করে দেখছে।’

অন্যান্য দেশও ইরানের সঙ্গে আলোচনা করেছে। ২৮ মার্চ পাকিস্তান জানায়, ইরান তাদের ২০টি জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেন, ‘এটি ইরানের একটি স্বাগত ও গঠনমূলক পদক্ষেপ। সংলাপ, কূটনীতি এবং আস্থা তৈরির এই ধরনের উদ্যোগই সামনে এগোনোর একমাত্র পথ।’

ভারতের পতাকাবাহী জাহাজগুলোকেও প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে ইরান। ভারতে ইরানি দূতাবাস গত সপ্তাহে এক্সে লিখেছে, ‘আমাদের ভারতীয় বন্ধুরা নিরাপদ হাতে আছে, কোনো দুশ্চিন্তা নেই।’

এই বার্তাটি দেওয়া হয় দক্ষিণ আফ্রিকায় ইরানি দূতাবাসের একটি পোস্টের জবাবে, যেখানে বলা হয়েছিল—হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে ‘শুধু ইরান ও ওমান।’ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর মার্চে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, তাদের তেলবাহী জাহাজের চলাচল সম্ভব হয়েছে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফল হিসেবে।

ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীনও গত সপ্তাহে নিশ্চিত করে, তাদের কিছু জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে। তবে তারা ইরানের নাম উল্লেখ করেনি বা জাহাজগুলোর বিস্তারিত দেয়নি। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, ‘প্রাসঙ্গিক পক্ষগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের পর সম্প্রতি তিনটি চীনা জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। সহায়তার জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞ।’

জাহাজ চলাচলের তথ্য বলছে, যুদ্ধ চললেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানি তেলের কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল চীনে পৌঁছেছে। বেইজিংয়ের সঙ্গে তেহরানের বন্ধুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে মিলে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতার চেষ্টাও করছে।

কিছু জাহাজ কী শর্তে নিরাপদে চলাচলের অনুমতি পেয়েছে—তা এখনো স্পষ্ট নয়। তারা কোনো টোল বা অর্থ দিয়েছে কিনা, সেটিও অজানা। সপ্তাহান্তে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বহনকারী একটি জাপানি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে বলে জানায় শিপিং কোম্পানি মিতসুই ওএসকে লাইনস। কোম্পানিটি জানায়, ‘জাহাজ এবং সব ক্রু সদস্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।’ তবে তারা টোল দেওয়া হয়েছে কিনা বা কীভাবে নিরাপদ পথ নিশ্চিত হয়েছে—এ বিষয়ে কিছু বলেনি।

মার্চে মালয়েশিয়াও জানায়, তাদের কিছু তেলবাহী জাহাজকে তেহরান প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এজন্য ইরানের প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানান। মালয়েশিয়ার পরিবহনমন্ত্রী অ্যান্থনি লুক স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, এটি সম্ভব হয়েছে ‘ইরান সরকারের সঙ্গে ভালো কূটনৈতিক সম্পর্কের’ কারণে। তবে মালয়েশিয়ার অন্য পতাকাবাহী জাহাজগুলো একই ধরনের নিশ্চয়তা পাবে কিনা—তা পরিষ্কার নয়। মালয়েশিয়ার মোট তেল আমদানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে।

এই চুক্তিগুলোর প্রভাব অন্য দেশগুলোর জন্য কী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। যেমন—অন্যান্য দেশ কি তাদের জাহাজের পতাকা বদলে সেইসব দেশের পতাকা ব্যবহার করবে, যাদের জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে? বর্তমানে অনেক তেলবাহী জাহাজ পানামা ও মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের মতো দেশের পতাকা বহন করে। কিন্তু এসব দেশ এখনো নিরাপদ চলাচলের কোনো নিশ্চয়তা পায়নি বলে জানান মানিয়াতিস।

তবে জ্বালানি অর্থনীতিবিদ শি মনে করেন, এসব চুক্তি ‘কূটনৈতিক অগ্রগতি’ হলেও এটি সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান নয়। তিনি বলেন, এই নিশ্চয়তাগুলো কত দিন টিকবে এবং অঞ্চলের সামরিক পরিস্থিতি কীভাবে এগুলোর ওপর প্রভাব ফেলবে—তা এখনো অজানা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী গ্রেপ্তার, নেওয়া হয়েছে ডিবি কার্যালয়ে

ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, যুদ্ধ বন্ধে ইরানের পাল্টা ১০ দফা

খাবারের জন্য রক্ত বিক্রি করা এই বিলিয়নিয়ারের জীবনের ৬ শিক্ষা

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে বিচারকেরা ঐক্যবদ্ধ: বিবৃতি

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা শামছুল ইসলামের দায়িত্ব বাড়ল

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত