Ajker Patrika

যুদ্ধাপরাধ নাকি প্রেসিডেন্টের আদেশ অমান্য—কোন পথে যাবেন মার্কিন জেনারেলরা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৭: ৫৮
যুদ্ধাপরাধ নাকি প্রেসিডেন্টের আদেশ অমান্য—কোন পথে যাবেন মার্কিন জেনারেলরা
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকমের শীর্ষ জেনারেল এবং কর্মকর্তাদের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সেন্টকম

ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোতে ব্যাপক বোমা হামলার হুমকি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তাদের সামনে এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন—আদেশ অমান্য করবেন, নাকি যুদ্ধাপরাধে অংশ নেবেন?

এটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কমান্ডের জন্য এক জরুরি সংকট। গালিগালাজে ভরা এক হুমকিতে ট্রাম্প ওয়াশিংটন সময় আজ মঙ্গলবার রাত ৮টার মধ্যে ইরানকে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার আলটিমেটাম দিয়েছেন। নইলে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে ‘পাওয়ার প্ল্যান্ট ডে, আর ব্রিজ ডে—সব একসঙ্গে।’

গত রোববার নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, ‘এ রকম কিছু আর কখনো দেখা যাবে না!!!’ এফ বর্গীয় গালি দিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘ওই প্রণালিটা খুলে দাও, পাগল হারামির দল, না হলে নরকবাস করতে হবে তোমাদের।’ এর তিন দিন আগে ট্রাম্প পরিষ্কার করে দেন, ‘পাওয়ার ডে’ বলতে তিনি কী বোঝাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের প্রতিটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রকে খুব শক্তভাবে আঘাত করব, এবং সম্ভবত একসঙ্গেই।’

এসব বক্তব্য পরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকেও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এ নিয়ে তেমন কোনো দ্বিমত নেই যে,৯ কোটি ৩০ লাখ ইরানির জীবনধারণের জন্য জরুরি অবকাঠামোর ওপর এমন হামলা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

সাবেক দুই বিচারপতি অ্যাডভোকেট জেনারেল কর্মকর্তা মার্গারেট ডোনোভান ও র‍্যাচেল ভ্যানল্যান্ডিংহ্যাম সোমবার লেখেন, ‘এ ধরনের বক্তব্য—যদি বাস্তবে রূপ পায়—তাহলে তা হবে সবচেয়ে গুরুতর যুদ্ধাপরাধের শামিল। আর এতে করে প্রেসিডেন্টের মন্তব্যগুলো সেনাসদস্যদের অত্যন্ত জটিল এক পরিস্থিতিতে ঠেলে দিচ্ছে।’

তাঁরা আরও বলেন, ‘আমরা ইউনিফর্ম পরিহিত সাবেক সামরিক আইনজীবী হিসেবে—যারা টার্গেটিং অপারেশনে পরামর্শ দিয়েছি—জানি প্রেসিডেন্টের এসব কথা কয়েক দশকের সামরিক আইনি প্রশিক্ষণের পরিপন্থী এবং আমাদের যোদ্ধাদের এমন এক পথে ঠেলে দিচ্ছে, যেখান থেকে ফেরার সুযোগ নেই।’

তাঁরা উল্লেখ করেন, ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেওয়া’র ট্রাম্পের দম্ভোক্তি এবং তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ‘দয়ামায়াহীন’ নির্দেশ কেবল ‘স্পষ্টতই অবৈধ’ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সদস্যদের সারা জীবন ধরে শেখানো নৈতিক ও আইনি নীতিমালার সঙ্গে একেবারেই বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে।

ম্যাসাচুসেটস অ্যামহার্স্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক চার্লি কার্পেন্টার বলেন, ইতিহাসে এমন অনেক উদাহরণ আছে যেখানে সেনাসদস্যরা আদেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তা মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, নীরবে অমান্য করেছেন বা এমনকি যুদ্ধাপরাধ ঠেকাতে হস্তক্ষেপ করেছেন। তিনি উদাহরণ হিসেবে ১৯৬৮ সালে ভিয়েতনামে মাই লাই গণহত্যার কথা উল্লেখ করেন। যেখানে কিছু মার্কিন সেনা অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এমনকি এক হেলিকপ্টার পাইলট হামলাকারীদের ওপর গুলি চালানোর হুমকিও দিয়েছিলেন।

নিজের কোর্ট মার্শালের শুনানির সময় শত শত ভিয়েতনামিকে গুলি করে হত্যার নির্দেশদাতা কর্মকর্তা সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট উইলিয়াম ক্যালি যুক্তি দিয়েছিলেন, তিনি শুধু আদেশ পালন করছিলেন। কিন্তু আদালত রায় দেয়, এটি কোনো গ্রহণযোগ্য প্রতিরক্ষা নয়, কারণ সেই আদেশগুলো ছিল ‘স্পষ্টতই অবৈধ।’ এখন প্রশ্ন হলো—ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলোতে বোমা হামলার নির্দেশ পালন করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কি বলতে পারবেন যে তারা বুঝতে পারেননি এটি ‘স্পষ্টতই অবৈধ?’

নভেম্বরে ডেমোক্র্যাট সদস্যরা এক ভিডিও বার্তায় মার্কিন সেনাদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আপনারা অবৈধ আদেশ প্রত্যাখ্যান করতে পারেন, আপনাদের তা করতেই হবে।’ প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে তাদের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী আচরণের’ বলে অভিযোগ তোলেন। কার্পেন্টার বলেন, ‘অনেক কারণ রয়েছে যা ‘না’ বলা বা যুদ্ধাপরাধ ঠেকাতে দাঁড়িয়ে যাওয়াকে কঠিন করে তোলে, বিশেষ করে যখন আইনের গ্রে এরিয়ায় থাকে।’

তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘আইন অনুযায়ী সাধারণ সেনাদের কেবল স্পষ্টতই অবৈধ আদেশ অমান্য করতে হয়—অর্থাৎ এমন আদেশ, যা এতটাই জঘন্যভাবে অবৈধ যে সাধারণ বোধসম্পন্ন যে কেউ বুঝতে পারবে এটি ভুল। কিন্তু এই দক্ষতা ও নৈতিক বিচারবোধ সেনাদের মধ্যে একইভাবে গড়ে তোলা হয় না, যেভাবে তাদের শৃঙ্খল মেনে চলা ও নিজ নিজ ইউনিটের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে শেখানো হয়। আর ভুল সিদ্ধান্ত নিলে অবাধ্যতার জন্য তাদের কোর্ট মার্শালও করা হতে পারে।’

গত বছর মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে হেগসেথ কমান্ড চেইনের কর্মকর্তাদের জন্য আইনি পরামর্শ পাওয়া আরও কঠিন করে তুলেছেন। তিনি পেন্টাগনের শীর্ষ জাজ অ্যাডভোকেট জেনারেলদের বরখাস্ত করেছেন এবং বাইডেন প্রশাসন গঠিত বেসামরিক ক্ষতি প্রশমন ও প্রতিক্রিয়া ইউনিট ভেঙে দিয়েছেন। সাধারণ সৈন্যদের জন্য শেষ আশ্রয় হিসেবে একটি ‘জিআই রাইটস হটলাইন’ আছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় এই হটলাইনে ফোনকলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানা গেছে।

গত বছর কার্পেন্টারের নেতৃত্বে করা এক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ সেনাসদস্য বৈধ ও অবৈধ আদেশের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। তিনি বলেন, ‘তাদের বেশির ভাগই অবৈধ আদেশ অমান্য করার দায়িত্ব বোঝে এবং কোন পরিস্থিতিতে তা করা উচিত, তার নির্দিষ্ট উদাহরণও দিতে পারে। তবে বাস্তব সময়ে সেই পরিস্থিতি চিনে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া জরিপের তুলনায় কঠিন। কিন্তু আমরা একটি বিষয় জানি—যখন একজন দাঁড়ায়, তখন অন্যদের জন্যও দাঁড়ানো সহজ হয়ে যায়।’

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ট্রাম্প তার হুমকি আরও জোরালো করেছেন। এবিসির এক প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ইরান যদি তাঁর দাবি না মানে, ‘আমরা পুরো দেশটাকে উড়িয়ে দেব।’ কোনো কিছু নিষিদ্ধ সীমার মধ্যে আছে কি না জানতে চাইলে তিনি জবাব দেন, ‘খুব কম।’ সোমবার হুমকি আরও বাড়িয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘পুরো দেশটাকে এক রাতেই ধ্বংস করা সম্ভব, আর সেই রাতটা হয়তো আগামীকাল মঙ্গলবারের রাতই হতে পারে।’

ট্রাম্পের এই চরম হুমকি এবং সংঘাত থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে তার ক্রমবর্ধমান মরিয়া অবস্থান—সব মিলিয়ে আশঙ্কা বাড়িয়েছে যে, অস্থির মানসিকতার একজন প্রেসিডেন্ট পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের চেষ্টা করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের আইনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে এককভাবে পারমাণবিক হামলার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা থাকে। এ জন্য তিনি ন্যাশনাল মিলিটারি কমান্ড সেন্টারের একটি নিরাপত্তা কনফারেন্স আহ্বান করেন। সাধারণত এতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডারসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা থাকেন, তবে জরুরি মুহূর্তে কে কে উপস্থিত থাকবেন, তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।

প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সব সময় থাকা এক সামরিক সহকারী ‘নিউক্লিয়ার ফুটবল’ খুলে দেন। এটি একটি ব্রিফকেস, যেখানে পারমাণবিক হামলার বিকল্প পরিকল্পনা এবং প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা নিশ্চিত করার কোড থাকে। এই আদেশ থামানোর একমাত্র উপায় হলো, কমান্ড চেইনের সংশ্লিষ্টরা সেটিকে অবৈধ হিসেবে বিবেচনা করা।

২০২১ সালের জানুয়ারিতে, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের তৎকালীন চেয়ারম্যান জেনারেল মার্ক মিলি ট্রাম্পের অস্থির আচরণ নিয়ে এতটাই উদ্বিগ্ন ছিলেন যে, তিনি নাকি তাঁর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বলেছিলেন, যেকোনো পারমাণবিক সিদ্ধান্তে যেন তাঁকে অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

মন্টেরির মিডলবেরি ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞ জেফ্রি লুইস বলেন, অতীতে ট্রাম্প পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সম্মান দেখিয়েছেন। তবে তিনি যোগ করেন, ‘যখন তিনি একই সঙ্গে যুদ্ধ এবং নিজের মানসিক স্থিরতা হারাচ্ছেন, তখন সেই সম্মান কতটা শক্তিশালী থাকে, আমি জানি না।’

বর্তমান পরিস্থিতিতে কমান্ড চেইনের কেউ ট্রাম্পকে থামাতে হস্তক্ষেপ করবে—এমন আস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে লুইস সংক্ষেপে জবাব দেন, ‘কোনো আস্থা নেই।’ তিনি বলেন, ‘যারা তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে বা প্রতিরোধ করতে পারে বলে তিনি মনে করেন, এমন প্রায় সবাইকেই তিনি ধারাবাহিকভাবে সামরিক বাহিনী থেকে সরিয়ে দিয়েছেন।’

তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী গ্রেপ্তার, নেওয়া হয়েছে ডিবি কার্যালয়ে

খাবারের জন্য রক্ত বিক্রি করা এই বিলিয়নিয়ারের জীবনের ৬ শিক্ষা

অচেতন মোজতবার চিকিৎসা চলছে ইরানেই, জড়িত নেই সিদ্ধান্ত গ্রহণে—টাইমসের প্রতিবেদন

ঈশ্বর সংঘাত পছন্দ না করলেও ইরান যুদ্ধে আমাদের সঙ্গে আছেন: ট্রাম্প

ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ: ট্রেনের গতি বাড়াতে ডুয়েলগেজ

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত