Ajker Patrika

আমাদের ভূখণ্ড ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না: মিয়ানমার

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০২ জুন ২০২৬, ১০: ৫২
আমাদের ভূখণ্ড ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না: মিয়ানমার
নরেন্দ্র মোদি ও মিন অং হ্লাইং। ছবি: সংগৃহীত

মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আশ্বস্ত করেছেন যে মিয়ানমারের ভূখণ্ড ‘ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে না। গতকাল সোমবার ভারত সফররত মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট এই আশ্বাস দেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

অতীতে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো মিয়ানমারের ভেতরে ঘাঁটি গেড়ে কার্যক্রম চালানোর বিষয়ে ভারত বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মোদি–মিনের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর সাংবাদিকদের ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি জোর দিয়ে বলেন, ‘মিয়ানমারে স্থিতিশীলতা ও শান্তি ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের বিষয়।’

গত ৩০ মে পাঁচ দিনের সফরে ভারত পৌঁছান মিন অং হ্লাইং। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি তাঁর প্রথম বিদেশ সফর। সাবেক সামরিক জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং গত ৩ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এর পাঁচ বছর আগে তিনি এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করেছিলেন।

মিশ্রি বলেন, দুই নেতা প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও বিরল মাটির খনিজ (রেয়ার আর্থ) এবং সংযোগ অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করেছেন। মোদি একই সঙ্গে নোবেলজয়ী অং সান সু চির বিষয়টিও উত্থাপন করেন। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে সু চি মিয়ানমারে আটক রয়েছেন।

মিশ্রি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী (মোদি) মিয়ানমার ইউনিয়ন প্রজাতন্ত্রের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি ভারতের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। উভয় পক্ষই জোর দিয়েছে, কোনো দেশের সার্বভৌম ভূখণ্ড যেন এমন কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত না হয়, যা তাদের নিরাপত্তা স্বার্থের পরিপন্থী। বিশেষ করে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট পুনরায় আশ্বাস দিয়েছেন, মিয়ানমারের ভূখণ্ড ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।

তিনি আরও বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয়টি মূলত মিয়ানমার রাষ্ট্রের সেই প্রচেষ্টার সঙ্গে সম্পর্কিত, যার মাধ্যমে তারা সব জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন ও গোষ্ঠীকে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এনে শান্তি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে চায়। এ বিষয়ে আমাদের স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ রয়েছে। কারণ, মিয়ানমারে স্থিতিশীলতা ও শান্তি ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা কিংবা আমাদের সঙ্গে থাকা ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তে বসবাসকারী মানুষের সুরক্ষার জন্যই নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে আমাদের সংযোগ-স্বার্থের কারণেও এটি গুরুত্বপূর্ণ।’

মিশ্রি বলেন, ‘মিয়ানমারের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা পুরো আসিয়ানের সংহতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আসিয়ান কাঠামোর মধ্যে মিয়ানমার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহৎ দেশ।’

আঞ্চলিক গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘এ ছাড়া সীমান্তসংলগ্ন মিয়ানমার এলাকায় ভারতীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলেছেন। প্রেসিডেন্ট আবারও আশ্বাস দিয়েছেন, মিয়ানমার এ উদ্বেগ সম্পর্কে সংবেদনশীল এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে, যাতে এসব কর্মকাণ্ড ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকির কারণ হয়ে না ওঠে।’

মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের সম্পৃক্ততা ‘সেখানে বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর কোনো মন্তব্য করার উদ্দেশ্যে নয়’ উল্লেখ করে মিশ্রি বলেন, ‘আমরা সব সময় বিশ্বাস করেছি যে ধারাবাহিক সংলাপই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের জন্য এটি একটি অপরিহার্য বিষয়। এর সমাধান বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মধ্যে নেই। তাই আমরা ধারাবাহিকভাবে সম্পৃক্ত থেকেছি এবং সম্পৃক্ত থাকার পাশাপাশি গণতন্ত্র, শান্তি প্রক্রিয়া, অন্তর্ভুক্তি এবং আলোচনায় সব অংশীজনের উপস্থিতির অপরিহার্যতার বিষয়ে আমাদের মতামত তুলে ধরেছি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা সব সময় বিশ্বাস করেছি, মিয়ানমারের সামনে যে সংকটগুলো রয়েছে, সেগুলোর সমাধান শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারের জনগণকেই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে বের করতে হবে। এটি মিয়ানমারের নেতৃত্বে পরিচালিত এবং মিয়ানমারের নিজস্ব সমাধান হতে হবে।’

প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্পর্কে মিশ্রি বলেন, এর মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রতিষ্ঠান গঠন এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম। তিনি বলেন, ‘আমাদের মধ্যে ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এ সীমান্তকে ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত স্বার্থ রয়েছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা-সংক্রান্ত বিভিন্ন ব্যবস্থার বৈঠকগুলোতে এসব বিষয়ও আলোচনা হয়।’

ভারত-মিয়ানমার সংযোগ প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রকল্প হলো কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রকল্প এবং ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিপক্ষীয় মহাসড়ক প্রকল্প। এ বিষয়ে মিশ্রি বলেন, ‘প্রকল্প দুটি বহু বছর ধরে চলমান এবং বিভিন্ন কারণে বিলম্বিত হয়েছে। বর্তমানে সবচেয়ে বড় বাধা হলো মিয়ানমারের নিরাপত্তা পরিস্থিতি। কালাদান মহাসড়ক এমন এলাকায় অবস্থিত, যেখানে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও জাতিগত সশস্ত্র বাহিনীগুলোর মধ্যে সক্রিয় সংঘাত চলছে। একইভাবে ত্রিপক্ষীয় মহাসড়কের যে অংশে কাজ চলছিল, সেটিও এমন এলাকায়, যেখানে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা প্রবল।’

তিনি বলেন, ‘তবুও আমরা মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছি। যেখানে যুদ্ধবিরতির সাময়িক সুযোগ তৈরি হয়েছে কিংবা শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে, সেখানে আমরা কাজ এগিয়ে নিতে পেরেছি। তবুও এটি আমাদের জন্য একটি বড় অগ্রাধিকার হিসেবে রয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী আজ বিষয়টি উত্থাপন করেছেন এবং প্রেসিডেন্ট আবারও আশ্বাস দিয়েছেন যে, প্রকল্পগুলো সম্পন্ন করার জন্য মিয়ানমার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে।’

এর আগে, গত শনিবার বিহার রাজ্যে বুদ্ধগয়া সফর শেষে দিল্লিতে পৌঁছান মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট। সফরকালে তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন। আজ মঙ্গলবার তাঁর মুম্বাই যাওয়ার কথা রয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত