Ajker Patrika

জনস্বাস্থ্যে আশার আলো

আবিষ্কৃত হয়েছে ডেঙ্গু ভ্যাকসিন

ডা. কাকলী হালদার
আবিষ্কৃত হয়েছে ডেঙ্গু ভ্যাকসিন
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

​প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম আসার আগে এশিয়ার বিভিন্ন দেশসহ বাংলাদেশে তৈরি হয় ডেঙ্গুর আতঙ্ক। মশার কামড় থেকে শুরু হওয়া সাধারণ এক জ্বর যে কত দ্রুত প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে, তা সাম্প্রতিক সময়ে চিকিৎসাব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট।

এডিস মশাবাহিত রোগটি এখন আর নিছক কোনো মৌসুমি সমস্যা নয়; এটি স্থায়ী জনস্বাস্থ্য-সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর হাজার হাজার রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, আইসিইউতে শয্যাসংকট দেখা দিচ্ছে এবং অকালে ঝরে যাচ্ছে বহু প্রাণ।

​এমন এক প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপী গবেষকদের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা এবং গবেষণার ফসল হিসেবে আশার আলো ছড়িয়েছে ডেঙ্গু ভ্যাকসিন। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন রয়েছে, এই ভ্যাকসিন কতটা কার্যকর, কার জন্য প্রযোজ্য এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি গ্রহণ করা কতটা জরুরি।

ডেঙ্গু ভাইরাস এবং ভ্যাকসিনের রূপরেখা

ডেঙ্গু একটি জটিল ভাইরাসজনিত রোগ, যার প্রধানত চারটি ধরন বা সেরোটাইপ রয়েছে। এগুলো হলো ডিইএন-১, ডিইএন-২, ডিইএন-৩ এবং ডিইএন-৪। একবার ডেঙ্গুর এই চার ধরনের কোনো একটিতে আক্রান্ত হলে, সেটির বিরুদ্ধে আজীবন প্রতিরোধক্ষমতা পাওয়া যায়। বাকি তিনটি ধরনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা পাওয়া যায় না; বরং পরবর্তী সময়ে অন্য কোনো ধরনে আক্রান্ত হলে রোগীর শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে ওঠার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। ডেঙ্গুর এই চার ধরনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে আবিষ্কার করা হয়েছে টেট্রাভ্যালেন্ট ডেঙ্গু ভ্যাকসিন। বিশ্বজুড়ে বর্তমানে অনুমোদিত ও ব্যবহৃত প্রধান ভ্যাকসিনগুলোর অন্যতম হলো টিকা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান তাকেদার কিউডেঙ্গা/টিএকে-০০৩ এবং সানোফি পাস্তুরের ডেংভ্যাক্সিয়া। এসব টিকা মানবদেহে অ্যান্টিবডি তৈরি করে এবং ডেঙ্গু ভাইরাসের আক্রমণ প্রতিরোধে কিংবা রোগের তীব্রতা কমাতে সহায়ক।

চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, শুধু মশা নিধন বা ব্যক্তিগত সচেতনতা দিয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ডেঙ্গু মহামারি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব। ভ্যাকসিনেশন কিংবা টিকাদান কর্মসূচির প্রবর্তন এখানে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। টিকা যা করবে—

মারাত্মক জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি কমাবে

ডেঙ্গু ভ্যাকসিনের বড় সাফল্য হলো, রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার কিংবা ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের মতো মারাত্মক জীবনঘাতী জটিলতা প্রতিরোধ করবে। তবে গবেষণা অনুযায়ী, অনুমোদিত ভ্যাকসিনগুলো হাসপাতালে ভর্তির ঝুঁকি ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে সক্ষম।

স্বাস্থ্যসেবা খাতের ওপর চাপ কমানো

ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের চূড়ান্ত সময়ে সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতালে শয্যা ও আইসিইউ এবং রক্তের প্লাটিলেট ও রক্তের উপাদানের সংকট কমাবে। ভ্যাকসিন প্রয়োগের মাধ্যমে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা এবং এর তীব্রতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলে স্বাস্থ্যসেবা খাতের ওপর এই অতিরিক্ত চাপ অনেকাংশে কমে আসবে।

পুনরায় সংক্রমণের ভয়াবহতা প্রতিরোধ

প্রথমবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার চেয়ে দ্বিতীয়বার নতুন সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে রক্তক্ষরণ এবং শক সিনড্রোমের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। ডেঙ্গু ভ্যাকসিন চতুর্মুখী সুরক্ষাবলয় তৈরি করে এই দ্বিতীয়বারের ঝুঁকির জটিলতা অনেকাংশে প্রশমিত করে।

অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা

একটি পরিবারে ডেঙ্গু চিকিৎসা ব্যয়, সঙ্গে থাকা ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া এবং মানসিক উদ্বেগের মাধ্যমে বিশাল অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করে। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা সম্ভব হলে ব্যক্তি ও রাষ্ট্র উভয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য খাতে বড় অঙ্কের অর্থ সাশ্রয় হবে।

যাদের জন্য প্রযোজ্য

ডেঙ্গু ভ্যাকসিন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও এটি সব মানুষের জন্য ঢালাওভাবে কিংবা যেকোনো বয়সে একভাবে প্রযোজ্য নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা অনুযায়ী ভ্যাকসিনের প্রয়োগ নির্ধারিত হয়।

ভ্যাকসিন প্রয়োগের বয়স ও যোগ্যতা

কিউডেঙ্গা: এটি সাধারণত ৪ থেকে ৬০ বছর বয়সী মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েছে। তবে বড় বিষয় হলো, কোনো ব্যক্তি আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন কি না, সেটি পরীক্ষা করা ছাড়াই ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা সম্ভব হবে।

ডেংভ্যাক্সিয়া: এটি সাধারণত ৯ থেকে ১৬ অথবা ৪৫ বছর বয়সী মানুষদের জন্য সুপারিশ করা হয়। তবে এটি নেওয়ার আগে ল্যাবে পরীক্ষা করার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে, টিকা গ্রহণকারী ব্যক্তি আগে অন্তত একবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন কি না।

ডেঙ্গু ভ্যাকসিন শতভাগ আক্রান্ত হওয়া বন্ধ করে না, তবে রোগের তীব্রতা এবং মৃত্যুর হার অনেক কমিয়ে আনে। করোনা কিংবা ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা রোগ সংক্রমণ পুরোপুরি না ঠেকালেও রোগীকে মারাত্মক পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করে, ডেঙ্গু ভ্যাকসিনের ভূমিকাও অনেকটা তেমনই। তাই ভ্যাকসিন জরুরি হলেও এটি একমাত্র বা একক সমাধান নয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও চ্যালেঞ্জ

ঘনবসতিপূর্ণ শহর, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং এডিস মশার প্রজননবান্ধব আবহাওয়া বাংলাদেশকে ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত করেছে। তাই দেশে ডেঙ্গু ভ্যাকসিন বাস্তবায়নে কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে:

ভ্যাকসিনের উচ্চ মূল্য এবং সহজলভ্যতা: বিশ্ববাজারে এই ভ্যাকসিনের দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ার কারণে তা সাধারণ মানুষের নাগালে আনা কঠিন।

সেরোটাইপ ট্র্যাকিং: দেশে বর্তমানে ডেঙ্গুর কোন সেরোটাইপ বেশি সক্রিয়, সেটি নিয়মিত বৈজ্ঞানিকভাবে পর্যবেক্ষণ এবং মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

জাতীয় টিকাদান নীতিতে সংযোজন: কোন বয়সের জনগোষ্ঠীকে আগে টিকা দেওয়া হবে, তার সঠিক জাতীয় কৌশল কিংবা রূপরেখা তৈরি করা।

ডেঙ্গু ভ্যাকসিন নিঃসন্দেহে ডেঙ্গু যুদ্ধের এক শক্তিশালী অস্ত্র। কিন্তু ভ্যাকসিন আসামাত্র মশা নিধন বা বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখার কাজ বন্ধ করে দেওয়া যাবে না। বিশেষজ্ঞরা সমন্বিত ভেক্টর ব্যবস্থাপনার ওপর খুব জোর দিচ্ছেন। অর্থাৎ মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করার সঙ্গে ব্যক্তিগত সচেতনতা এবং ব্যাপকভিত্তিক টিকাদান কর্মসূচি—এই তিনের সমন্বয়ে ডেঙ্গুমুক্ত একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত