ইউনিসেফ ও বিবিএসের এমআইসিএস জরিপ

অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি সত্ত্বেও অপুষ্টি দেশে এখনো বড় সমস্যা। অপুষ্টি নিরসনে দীর্ঘদিনের সরকারি-বেসরকারি কর্মসূচির পরও এ ক্ষেত্রে আশানুরূপ উন্নতি হয়নি। বিশেষ করে শিশুপুষ্টির অবস্থা নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দেশে ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে ৭ জন ‘ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য’ খাদ্য পাচ্ছে না। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক যৌথ জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।
শিশুদের ‘ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য’ খাদ্য না পাওয়ার অর্থ হচ্ছে খাদ্যবৈচিত্র্য ও দৈনিক খাদ্যগ্রহণের ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণ হচ্ছে না। জীবনের প্রথম দুই বছরে পর্যাপ্ত পুষ্টি না পাওয়া শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি, মানসিক বিকাশ ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে তারা খর্বাকৃতি, দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ও শিক্ষাগতভাবে পিছিয়ে পড়াসহ দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার ঝুঁকিতে পড়ছে।
দেশে শিশু ও নারীদের ওপর সবচেয়ে যে বিস্তৃত জরিপগুলো চালানো হয়, তার একটি হচ্ছে ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস)। ২০২৫ সালের এমআইসিএস জরিপের প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল গত নভেম্বরে। জরিপটি ইউনিসেফের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালনা করে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)।
জরিপের ফলে দেখা যায়, এত প্রচারের পরও জন্মের ১ ঘণ্টার মধ্যেই নবজাতককে বুকের দুধ খাওয়ানোর হার মাত্র ৩০ শতাংশ, যা শিশুর প্রাথমিক পুষ্টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় বাধা। শূন্য থেকে ৫ মাস বয়সী শিশুদের শুধু বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ৫৭ শতাংশ। ৬ থেকে ৮ মাস বয়সী শিশুদের কঠিন বা আধা কঠিন খাবার পাওয়ার হার ৭৮ শতাংশ। তবে ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সীদের মধ্যে মাত্র ৩৫ শতাংশ ‘ন্যূনতম খাদ্যবৈচিত্র্য’ এবং ৩০ শতাংশ ‘ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য’ খাদ্য পাচ্ছে। বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংখ্যকবার খাওয়ানোর হার ৭৪ শতাংশ।
জরিপে আরও দেখা যায়, মাতৃদুগ্ধ থেকে স্বাস্থ্যকর সম্পূরক খাদ্যে রূপান্তর অনেক ক্ষেত্রে সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে না। ফলে শিশুরা খর্বাকৃতি, ক্ষয় ও অপুষ্টিজনিত নানা রোগের ঝুঁকিতে পড়ছে। গ্রামীণ ও দরিদ্র পরিবারে বসবাসকারী শিশুদের মধ্যে ন্যূনতম খাদ্য বৈচিত্র্যের হার তুলনামূলকভাবে কম। তবে শহরাঞ্চল ও তুলনামূলকভাবে সচ্ছল পরিবারেও উল্লেখযোগ্য অংশের শিশু প্রস্তাবিত খাদ্যবৈচিত্র্য পাচ্ছে না।
ইউনিসেফ বলছে, শিশুর পুষ্টিসংকট কেবল খাদ্যের অভাব বা অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে হচ্ছে না, স্বাস্থ্যকর ও বৈচিত্র্যময় খাদ্য সম্পর্কে সচেতনতার অভাবও এর বড় কারণ। মা ও যত্নদাতাদের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীদের উপযুক্ত সম্পূরক খাদ্যের বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান দেওয়া জরুরি।
ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য খাদ্য বলতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ইউনিসেফ নির্ধারিত মানদণ্ডে দুটি বিষয় রয়েছে। ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুকে ৮টি খাদ্যগোষ্ঠীর মধ্যে অন্তত ৫টি খাদ্যগোষ্ঠীর খাবার দিতে হবে। খাদ্যগোষ্ঠীগুলো হলো শস্য, দানাশস্য, মূল-কন্দ; ডাল-বীজজাতীয় খাবার; দুগ্ধজাত খাবার; মাংস, মাছ ও ডিম; ভিটামিন ‘এ’সমৃদ্ধ ফল ও সবজি; অন্যান্য ফল ও সবজি; ফ্যাট ও তেল এবং শিশুদের বিশেষ খাবার। দিনে খাওয়ানোর প্রত্যাশিত ঘনত্ব বয়সভেদে ভিন্ন। মায়ের দুধের পাশাপাশি ৬ থেকে ৮ মাস বয়সী শিশুদের দিনে অন্তত দুবার এবং ৯ থেকে ২৩ মাস বয়সীদের দিনে তিনবার সঙ্গে ১ থেকে ২টি হালকা খাবার দিতে হবে।
বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে শিশুর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় জন্মের পর প্রথম দুই বছর। চিকিৎসাবিদেরা একে ইংরেজিতে ‘ক্রিটিক্যাল গ্রোথ উইন্ডো’ (বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ সময়) বলে থাকেন। এ সময়ে পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেলে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয় (খর্বাকৃতি), ওজন কমে যায় (ওজনস্বল্পতা), রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মেধা, স্মৃতি ও শেখার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস ও স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ২৪ শতাংশ শিশু খর্বাকৃতি, যা শিশুদের সুস্থ বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। পুষ্টিবিদেরা বলছেন, ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য খাদ্য না পাওয়াই শিশুদের অপুষ্টির অন্যতম কারণ।
বিশ্বব্যাপী পুষ্টি পরিস্থিতির শীর্ষ স্বাধীন মূল্যায়ন ‘দ্য গ্লোবাল নিউট্রিশন রিপোর্ট’ অনুযায়ী, শিশুদের ‘বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ সময়’ সাধারণত জন্মের পরের প্রথম ১০০০ দিন হিসেবে ধরা হয়। অর্থাৎ গর্ভধারণ থেকে শিশুর জন্মের পর প্রায় দুই বছর পর্যন্ত। এ সময় শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা পুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত উপাদানের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল থাকে।
এমআইসিএসের (২০২৫) তথ্য অনুযায়ী, দেশে শিশুদের খাদ্যবৈচিত্র্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শহর-গ্রাম ও ধনী-গরিব সব ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়েছে। শহরে ৪২ শতাংশ এবং গ্রামে ৩৩ শতাংশ শিশু প্রস্তাবিত ন্যূনতম খাদ্যবৈচিত্র্য পাচ্ছে। ধনী পরিবারের শিশুদের মধ্যেও এ হার খুব বেশি নয়, মাত্র ৪৭ শতাংশ। আর দরিদ্র পরিবারের ক্ষেত্রে তা ২৩ শতাংশ।
সাম্প্রতিক কয়েক বছর ধরে খাদ্যপণ্যসহ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে অনেক পরিবার শিশুর খাদ্যে প্রয়োজনীয় বৈচিত্র্য বজায় রাখতে পারছে না। তবে পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিশুর অপুষ্টির পেছনে দারিদ্র্য ছাড়াও অনুপযুক্ত খাদ্যাভ্যাস, পুষ্টি নিয়ে সচেতনতার অভাব এবং সীমিত পুষ্টি-সংস্কৃতি বড় ভূমিকা রাখছে।
জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, পুষ্টিবিষয়ক কর্মসূচির কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে সরকারি উদ্যোগের বাস্তবায়ন কীভাবে হচ্ছে, তার কঠোর নজরদারি দরকার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. সায়েদুল আরেফিন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘দুই-তৃতীয়াংশ শিশু ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য খাবার না পাওয়া উদ্বেগজনক। দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ। পুষ্টি খাতে যুক্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং দুর্বল পরিকল্পনা অপুষ্টি দূর করতে কার্যকর অগ্রগতির বড় বাধা।’
দেশে পুষ্টি-সংক্রান্ত কার্যক্রমে অন্তত ২৫টি মন্ত্রণালয় যুক্ত রয়েছে বলে জানিয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদ (বিএনএনসি)। জাতীয় পুষ্টিনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম সমন্বয় এবং পুষ্টি খাতের নীতি উন্নয়নে কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি। এর তথ্য অনুযায়ী, এসব মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ১৩টি সরাসরি পুষ্টিসম্পর্কিত কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ কাজে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে, যার অধীনে মাঠপর্যায়ে কাজ করে জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান।
বিএনএনসির মহাপরিচালক ডা. মো. রিজওয়ানুর রহমান বলেন, ‘শিশুদের পুষ্টি আমাদের অগ্রাধিকার। সরকারের পাশাপাশি উন্নয়ন সহযোগীরাও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে—বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ ও উপকূলে—পুষ্টি কার্যক্রম চালাচ্ছে। এখন ২০১৫ সালের জাতীয় পুষ্টিনীতি আধুনিকায়নে কাজ চলছে।’
ডা. মো. রিজওয়ানুর রহমান জানান, শিশুদের খর্বাকৃতি এবং ওজনস্বল্পতা কমানোর ক্ষেত্রে সরকারের লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়নি।
সমন্বয়ের সমস্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কিছু ঘাটতি রয়েছে। আমরা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করি এবং সমন্বয় আরও জোরদার করার চেষ্টা করছি।’

সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হামে আক্রান্ত হয়ে একজন ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
১০ ঘণ্টা আগে
দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুই শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে ও এক শিশুর হামে মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আজ সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সবশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। এই হিসাব গতকাল রোববার...
১ দিন আগে
হামের প্রাদুর্ভাব রোধে সারা দেশে শুরু হওয়া টিকাদান কর্মসূচিতে জনবল ও চিকিৎসাসামগ্রী দিচ্ছে ব্র্যাক। এই টিকাদান কর্মসূচিতে ব্র্যাকের পক্ষ থেকে ১৫ লাখ সিরিঞ্জ সরবরাহ করা হচ্ছে। দেশের ৩৬টি জেলায় ব্র্যাকের ২৪ হাজারের বেশি স্বাস্থ্যসেবিকা শিশুদের টিকাকেন্দ্রে নিয়ে আসতে সহায়তা করবেন।
১ দিন আগে
হামের কারণে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করতে হবে, এমন পরিস্থিতি নেই বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, এখন যে অবস্থা, সেটাকে মহামারি বলা যাবে না। হামে প্রথম শিশু মৃত্যুর পর পরই সরকার আইসিইউর ব্যবস্থা করেছে।
২ দিন আগে