Ajker Patrika

থানচিতে এসএসসির ফল বিপর্যয়, জিপিএ-৫ নেই একটিও

থানচি (বান্দরবান) প্রতিনিধি 
আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২৬, ২১: ১৬
থানচিতে এসএসসির ফল বিপর্যয়, জিপিএ-৫ নেই একটিও
দুর্গম পাহাড়ের ছেলেমেয়েদের স্কুলে উপস্থিতি নিশ্চিত করাই চ্যালেঞ্জ। ছবি: আজকের পত্রিকা

বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি উপজেলা থানচিতে এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের বিপর্যয় হয়েছে। উপজেলার একটি কেন্দ্রে চারটি বিদ্যালয়ের মোট ২০৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২০৩ জন পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র ৫২ জন। সর্বোচ্চ অর্জিত জিপিএ-৪.০০ হলেও কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায়নি। সামগ্রিক পাসের হার ২৫ দশমিক ৬১ শতাংশ।

পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় এবার থানচিতে পাসের হার প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নানা সীমাবদ্ধতা, নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতির অভাব ও অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের পাঠদানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা ফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ।

চারটি বিদ্যালয়ের ফলাফল বিশ্লেষণে তুলনামূলকভাবে ভালো ফল করেছে থানচি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির ৬২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬১ জন পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ২৬ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। পাসের হার ৪২ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

বলীপাড়া উচ্চবিদ্যালয়ের ৫৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫৫ জন পরীক্ষায় অংশ নেয়। পাস করেছে ১০ জন। বিদ্যালয়টির পাসের হার ১৮ দশমিক ১৮ শতাংশ।

থানচি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ৭৪ জনের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১৫ জন। পাসের হার ২০ দশমিক ২৭ শতাংশ।

সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে দুর্গম রেমাক্রী উচ্চবিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির ১৩ জন পরীক্ষায় অংশ নিলেও উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র একজন। পাসের হার ৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ।

ফল বিপর্যয়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে থানচি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নূর মোহাম্মদ বলেন, অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ শুধু ফরম পূরণের সময় বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়। ফরম পূরণের পর পুরো একটি বছর তারা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে না। ফলে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধারাবাহিক যোগাযোগ তৈরি হয় না।

নূর মোহাম্মদ বলেন, অনিয়মিত শিক্ষার্থীরা ফরম ফিলআপ করে একটি বছর স্কুলগামী না থাকায় শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক থাকে না। এর প্রভাব পরীক্ষার ফলাফলে পড়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন অভিভাবক মনে করেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শিক্ষার মান উন্নয়নে বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁদের মতে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকেরা নিয়মিত ও গুরুত্ব দিয়ে পাঠদান করান, তাই সেখানে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।

অভিভাবকদের মতে, সরকারি-বেসরকারি বিভাজনের বাইরে উপজেলার চারটি বিদ্যালয়েই শিক্ষার পরিবেশ ও পাঠদানের মান উন্নয়ন প্রয়োজন। বিশেষ করে, দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়মুখী করা, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিশ্চিত করা ও বিদ্যালয়ভিত্তিক নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

থানচির বিস্তীর্ণ পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় অনেক শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে যাতায়াতই বড় চ্যালেঞ্জ। কোথাও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়, আবার বর্ষাকালে পাহাড়ি সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে রয়েছে শিক্ষক-সংকট, নিয়মিত উপস্থিতির সমস্যা, অভিভাবকদের আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার প্রবণতা।

সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ক্যহ্লাচিং মারমা বলেন, এসব বাস্তবতায় শুধু পরীক্ষার ফল প্রকাশ করে শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার দায় দেওয়া নয়, বরং কেন তারা কাঙ্ক্ষিত ফল করতে পারছে না, তা খুঁজে বের করা জরুরি।

ক্যহ্লাচিং মারমা বলেন, থানচির শিক্ষাব্যবস্থাকে ঘুরে দাঁড় করাতে বিদ্যালয়ভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ, দুর্বল বিষয়ে অতিরিক্ত পাঠদান, অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের নিয়মিত করার উদ্যোগ, অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা ও দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত