Ajker Patrika

জাতীয় বাজেট ও কৃষকের প্রত্যাশা

শাইখ সিরাজ
জাতীয় বাজেট ও কৃষকের প্রত্যাশা
সরকার কৃষিযন্ত্রে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিলেও মাঠপর্যায়ের চিত্রটি একটু ভিন্ন। ছবি: আজকের পত্রিকা আর্কাইভ

আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি হলেও জাতীয় বাজেট প্রণয়নের সময় নীতিনির্ধারকদের ভাবনায় কৃষকের প্রকৃত প্রয়োজনের প্রতিফলন অনেক সময়ই আংশিক থেকে যায়। কৃষিকে আধুনিক, যুগোপযোগী ও লাভজনক করতে বর্তমান সরকারের নানা কার্যকর ভূমিকা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। বিশেষ করে কৃষক কার্ড এবং কৃষকের ঋণ মওকুফের মতো বিষয়গুলো আশাজাগানিয়া। তবে বৈশ্বিক মহামারি, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা আর জলবায়ু পরিবর্তনের কশাঘাত—সবকিছুর মাঝেও ২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমাদের ভাবতে হচ্ছে নতুন করে। সামনেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। বছর ধরে তৃণমূলের কৃষক, খামারি এবং কৃষি-উদ্যোক্তাদের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপের নির্যাস থেকে আমি মনে করি, আসন্ন বাজেটে কৃষিকে কেবল প্রথাগত উৎপাদন নয়, বরং একটি উচ্চ-প্রযুক্তিনির্ভর ‘স্মার্ট শিল্প’ হিসেবে গড়ে তোলার রূপরেখা থাকা চাই।

সরকার কৃষিযন্ত্রে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিচ্ছে সত্য, কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্রটি একটু ভিন্ন। ভর্তুকি দেওয়ার পরও একটি বড় বা আধুনিক কৃষিযন্ত্রের যে অবশিষ্ট মূল্য থাকে, তা মেটানোর আর্থিক সক্ষমতা আমাদের দেশের অধিকাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকের নেই। এর ওপর আরেকটি বড় সংকট হলো আমাদের চাষের জমির খণ্ডবিখণ্ডতা। উত্তরাধিকার সূত্রে জমি ভাগ হতে হতে এত ছোট হয়ে গেছে যে, সেখানে বড় আকারের কম্বাইন হারভেস্টার বা আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

কৃষকের দাবি, আমাদের দেশের ভূপ্রকৃতি ও চাষপদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের কৃষিযন্ত্র আমদানি কিংবা দেশেই তা তৈরির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হোক। একই সঙ্গে এই ভর্তুকির সুফল যেন কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর পকেটে না গিয়ে সরাসরি প্রকৃত প্রান্তিক কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছায়, বাজেটে তার একটি সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন বা দিকনির্দেশনা থাকা অত্যন্ত জরুরি।

উন্নত বিশ্বে কৃষিকে শতভাগ যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে একটি বিশাল শিল্পে রূপান্তর করা হয়েছে। আমাদের রয়েছে অফুরন্ত জনসম্পদ, উর্বর পলিমাটি এবং চাষোপযোগী চমৎকার আবহাওয়া। আনন্দের কথা হলো, গত কয়েক বছরে আমাদের দেশের শিল্পোদ্যোক্তারাও কৃষির প্রতি ব্যাপকভাবে আগ্রহী হয়ে উঠছেন, যার বহু ইতিবাচক নজির আমি ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানে তুলে ধরেছি।

আমাদের দেশে প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণ খাদ্যশস্য, ফলমূল ও শাকসবজি উৎপাদিত হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সঠিক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে মৌসুমের সময় উৎপাদিত উদ্বৃত্ত ফসলের একটা বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়। এই অপচয় রোধে অ্যাগ্রো প্রসেসিং বা কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। সরকার যদি অনুকূল কর-অবকাঠামো, উপযুক্ত পরিবেশ এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের নিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে, তবে দেশের বড় ব্যবসায়ীরা এই খাতে বিপুল বিনিয়োগ করবেন, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ, কৃষিতে অর্থ বিনিয়োগ করলে তা যে সুনিশ্চিতভাবে ফেরত আসে, সেটা আজ প্রমাণিত।

একই সঙ্গে, উপযুক্ত বাণিজ্যিক পরিবেশ তৈরি হলে এই খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করাও সম্ভব। আমাদের মনে রাখতে হবে, ভবিষ্যতের বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হতে যাচ্ছে কৃষি। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১৭টি লক্ষ্যের মধ্যে ১০টি লক্ষ্য এবং এর অন্তর্গত ৩৩টি টার্গেটের সঙ্গে কৃষি খাত সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই আমাদের মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, কৃষিজ উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং ক্ষুদ্র খাদ্য উৎপাদকদের আয় দ্বিগুণ করা। এবারের বাজেটে কৃষির জন্য শুধু প্রথাগত থোক বরাদ্দ দিলেই চলবে না; ১০ থেকে ১৫ বছর পর আমাদের কৃষির গতি-প্রকৃতি কেমন হবে, তার একটি দীর্ঘমেয়াদি দূরদর্শী পরিকল্পনা এখনই বাজেটের কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

আমরা দীর্ঘকাল খাদ্যনিরাপত্তার কথা বলেছি এবং তাতে আমরা সফলও হয়েছি। কিন্তু বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের আসলে ‘পুষ্টিনিরাপত্তা’র দিকে তাকাতে হবে। আর পুষ্টিনিরাপত্তার কথা বলতে গেলে কৃষির উপখাত যেমন মৎস্য চাষ, গবাদিপশু পালন এবং হাঁস-মুরগি (পোলট্রি) পালনের মতো খাতগুলোর অবদানকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আমাদের জাতীয় অর্থনীতি এবং পুষ্টির মানদণ্ড উন্নত করার পেছনে মূল চালিকাশক্তি হলেন তৃণমূলের খামারিরা। তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণেই আজ পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে কম মূল্যে আমাদের দেশের মানুষ প্রাণিজ আমিষের জোগান পাচ্ছে। মৎস্য উৎপাদনে আমাদের বৈশ্বিক সাফল্য আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।

অথচ, এই অসামান্য সাফল্যের বিপরীতে এসব উপখাত জাতীয় বাজেট কিংবা রাষ্ট্রীয় নীতিতে চরমভাবে উপেক্ষিত। নানামুখী প্রতিকূলতা, খাদ্যের চড়া মূল্য এবং রোগবালাইয়ের ঝুঁকি মোকাবিলা করে খামারিরা টিকে আছেন। কৃষির এই উপখাতগুলোতে ব্যাংকঋণের সুবিধা নেই বললেই চলে। ব্যাংকগুলো এই খাতগুলোকে অত্যন্ত ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বিবেচনা করে ঋণ দিতে অনীহা প্রকাশ করে। অথচ, সহজ শর্তে ঋণসহায়তা দেওয়া হলে এই উপখাতগুলো থেকে বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব। তাই ফসলি কৃষির মতো মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও ভর্তুকি ও বিশেষ প্রণোদনার সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখা দরকার।

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে বাংলাদেশ আজ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম। অসময়ের বন্যা, তীব্র খরা, জলোচ্ছ্বাস কিংবা শিলাবৃষ্টির কারণে প্রতিবছর ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। জলবায়ুর এই বিরূপ প্রভাব শুধু ফসলেই নয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও মহামারি বা বিপর্যয় ডেকে আনছে। এই পরিস্থিতিতে কৃষক ও খামারিদের আত্মবিশ্বাস ও পুঁজি ধরে রাখার জন্য কৃষি ও এর উপখাতগুলোতে সর্বজনীন বিমাব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি।

আমাদের দেশে কৃষকের মধ্যে বিমা প্রিমিয়াম দেওয়ার ক্ষেত্রে একধরনের অনীহা বা সচেতনতার অভাব দেখা যায়। আমার প্রস্তাব হলো, শুরুতে সরকার নিজেই ভর্তুকি দিয়ে এই বিমার প্রিমিয়াম পরিশোধের ব্যবস্থা করুক। যখন কৃষকেরা বুঝতে পারবেন যে দুর্যোগে ফসল হারালেও বিমার কারণে তাঁরা দেউলিয়া হওয়া থেকে বেঁচে যাচ্ছেন, তখন তাঁরা স্বপ্রণোদিত হয়েই এই অনুশীলনের আওতায় চলে আসবেন। এ ছাড়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর আপৎকালীন পুনর্বাসনের পরিধি এবং এর বরাদ্দের পরিমাণ বর্তমানের চেয়ে আরও বাড়াতে হবে।

কৃষি গবেষণায় আমাদের বরাদ্দ এখনো চাহিদার তুলনায় অনেক কম। বর্তমানের জলবায়ু পরিবর্তন, মাটির স্বাস্থ্যের অবক্ষয়, মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন ইত্যাদির কথা মাথায় রেখে কৃষি গবেষণাকে শুধু ‘নতুন ফসলের জাত উদ্ভাবন’-এর চিরাচরিত গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এখন সময় এসেছে সামগ্রিক কৃষি গবেষণার দিকে নজর দেওয়ার। এর জন্য বাজেটে গবেষণার বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে হবে।

পাশাপাশি, দেশের শিক্ষিত তরুণদের কৃষিতে ধরে রাখার জন্য বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন। বর্তমান যুগ স্টার্টআপের যুগ। পৃথিবীর সর্বত্র স্টার্টআপের মাধ্যমেই কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক গতি ত্বরান্বিত হচ্ছে। আমাদের দেশে অন্যান্য প্রচলিত খাতে স্টার্টআপের সাফল্য আশানুরূপ না হওয়ার মূল কারণ বিনিয়োগের অভাব এবং বাজারের অনিশ্চয়তা। কিন্তু কৃষি খাতের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আজকের বাংলাদেশে হাজার হাজার শিক্ষিত তরুণ আধুনিক কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছেন এবং বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করছেন। তাঁদের এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে বাজেটে একটি ‘বিশেষ কৃষি উদ্যোগ প্যাকেজ’ বা ওপেন ইকোনমিক প্যাকেজ ঘোষণা করা দরকার, যা তাঁদের অর্থায়ন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত সব ধরনের নিরাপত্তা দেবে।

একই সঙ্গে আমাদের হাঁটতে হবে ‘স্মার্ট কৃষি’র পথে। আমাদের কৃষিতে এখন ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং রোবোটিক টেকনোলজির সমন্বয় ঘটাতে হবে এবং এর জন্য বাজেটে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা ও বরাদ্দ রাখা চাই।

কৃষিঋণের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি ঋণ পাওয়ার যোগ্য প্রকৃত কৃষককে শনাক্ত করা এবং ঋণপ্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজ করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় দেখা যায়, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে প্রকৃত কৃষক ঋণ পান না, অথচ মধ্যস্বত্বভোগীরা সেই সুবিধা লুটে নেয়।

আমাদের দেশের মোট আয়তনের ৮১ শতাংশের সমান বিশাল এক সমুদ্রসীমা রয়েছে বঙ্গোপসাগরে। এই বিশাল সমুদ্রসীমা আমাদের ‘ব্লু-ইকোনমি’ বা সমুদ্র অর্থনীতির এক অভূতপূর্ব দুয়ার খুলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষকেরা আমাদের এই সম্ভাবনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। ব্লু-ইকোনমির বিকাশে সরকারের পক্ষ থেকে উন্নত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং একটি সুসংহত আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবস্থাপনা তৈরি করা দরকার, যার জন্য বাজেটে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা থাকা চাই।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। আমাদের দেশের শহরগুলো, বিশেষ করে ঢাকা শহর আজ এক একটি ‘হিট আইল্যান্ড’ বা উত্তপ্ত দ্বীপে পরিণত হয়েছে। কলকারখানা আর গাড়ির কালো ধোঁয়ায় নগরবাসীর নাভিশ্বাস উঠছে। এই দমবন্ধ পরিস্থিতিতে ছাদকৃষি বা নগরকৃষি আমাদের শহরের জন্য ‘অক্সিজেন কারখানা’ হিসেবে কাজ করতে পারে। শহরের পরিবেশ উন্নয়ন, সবুজের হার বৃদ্ধি এবং নগরবাসীর পুষ্টির চাহিদা মেটাতে ছাদকৃষিকে একটি সমন্বিত ও বৃহৎ জাতীয় প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করার সময় এসেছে।

আসন্ন জাতীয় বাজেটে নীতিনির্ধারকেরা কৃষকের এই যৌক্তিক প্রত্যাশা ও দাবিগুলোর প্রতি সদয় দৃষ্টি দেবেন এবং একটি দূরদর্শী, কৃষকবান্ধব ও টেকসই বাজেট প্রণয়ন করবেন, এটাই দেশের কোটি কোটি কৃষকের পক্ষে আমার বিনীত প্রত্যাশা।

লেখক: পরিচালক ও বার্তাপ্রধান চ্যানেল আই

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত