Ajker Patrika

গ্যাস-সংকট: চট্টগ্রামে সবখানে গ্যাসে টান

  • টানা ১০ দিন এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটিতে এই পরিস্থিতি।
  • চাহিদার বিপরীতে ৪৪% কম গ্যাস পাচ্ছে চট্টগ্রাম।
  • শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমেছে অন্তত ৩০%, উদ্বেগ ব্যবসায়ীদের।
  • সিএনজি স্টেশনগুলোতে ৫-৬ ঘণ্টার দীর্ঘ লাইন।
  • কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, জানে না পেট্রোবাংলা।
সবুর শুভ, চট্টগ্রাম 
আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৮: ৫৯
গ্যাস-সংকট: চট্টগ্রামে সবখানে গ্যাসে টান
ফাইল ছবি

কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির জেরে দেশে টানা ১০ দিন ধরে তীব্র গ্যাস-সংকট চলছে। এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামে। কারণ এ অঞ্চলে নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র থেকে সরবরাহ না থাকায় পুরো ব্যবস্থাই এলএনজিনির্ভর। ফলে বাসাবাড়ির চুলা থেকে শুরু করে শিল্প-কারখানা, সিএনজি ফিলিং স্টেশন, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানায় গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দিন-রাতের প্রায় সময়ই রান্নার চুলা জ্বলছে মিটমিট করে। গ্যাসের চাপ কখনো আসছে আবার কখনো হঠাৎ চলে যাচ্ছে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে মারাত্মভাবে। ব্যবসায়ী নেতা ও শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাসের কারণে চট্টগ্রামে শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদন কমেছে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ। ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের জন্য সারা দিন লেগে আছে দীর্ঘ লাইন। চট্টগ্রামে গ্যাসনির্ভর দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ওই দুটি কেন্দ্রে ২১০ মেগাওয়াট করে ৪২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হতো। কাফকো সার কারখানায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বাকি দুই কারখানা সিইউএফএল এবং ড্যাপও বন্ধ রয়েছে কারিগরি ত্রুটি ও কাঁচামাল সংকটের আবর্তে পড়ে। সংকটের কারণে চাহিদার ৪৪ শতাংশ কম গ্যাস পাচ্ছে চট্টগ্রাম; এমনটা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

কখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা দ্রুত ত্রুটি সারিয়ে টার্মিনালটি পুরোপুরি সচলের চেষ্টা করছি। তবে দিনক্ষণ বলা খুব কঠিন।’

কবে নাগাদ টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল হবে, সেই প্রশ্নে নির্দিষ্ট দিনক্ষণ দিতে চান না জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম। গত সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, ‘এর আগেও তাঁরা (প্রকৌশলীরা) সময়সীমা দিয়েছিলেন, কিন্তু প্রযুক্তিগত কারণে তা সম্ভব হয়নি। তাই এবার আমরা নির্দিষ্ট দিন-তারিখ বলছি না।’

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্রে জানা গেছে, ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়। এতে দুটি টার্মিনালে নিয়মিত ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে ৬০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে আসে। ফলে পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে গিয়ে সারা দেশে সংকট দেখা দেয়। দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের ৩৫-৪০ শতাংশই আমদানি করা এলএনজি থেকে আসে। তাই এলএনজির সরবরাহ কমে যাওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

এই বিষয়ে নগরীর বাকলিয়া এক্সেস রোড এলাকার আবাসিক গ্রাহক রোকসানা আনোয়ার বলেন, ‘রাতে দিনে গ্যাস-সংকটের কারণে রান্না-বান্নায় ব্যাঘত ঘটছে। গ্যাস আসা যাওয়া করছে ঠিকই, কিন্তু চাপ কম।’

নগরীর কদমতলী এলাকায় সিএনজি অটোরিকশাচালক আবদুল হালিম ও চকবাজার ডিসি রোড এলাকা মোহাম্মদ হারুন জানান, লাইনে দাঁড়িয়ে গ্যাস নিতেই ৫-৬ ঘণ্টা সময় চলে যায়। কোম্পানির ইনকাম কখন তুলব। নিজে কীভাবে চলব। যাত্রীদের কাছে বাড়তি ভাড়া চাইলে ঝগড়া লেগে যাচ্ছে।

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ও পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, চট্টগ্রাম থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামে দৈনিক প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ২২৫-২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট।

গ্যাস-সংকটের কারণে ব্যবসাবাণিজ্যে সার্বিক প্রভাবের বিষয়ে চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘গ্যাস-সংকটের কারণে চট্টগ্রামে শিল্পকারখানায় সার্বিকভাবে উৎপাদন কমেছে ৩০ শতাংশ। সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে ব্যবসাবাণিজ্যে সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে।’

তথ্যমতে, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমে যাওয়ায় এবং এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাচ্ছে প্রায় ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই অবস্থায় জাতীয় পর্যায়ে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ কমানো হচ্ছে।

এদিকে রাউজান তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র-১ ও ২-এ ৪২০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের এক মেগাওয়াটও উৎপাদন করা যাচ্ছে না। গ্যাস-সংকটের কারণে কর্ণফুলীর শিকলবাহা ২২৫ মেগাওয়াট কেন্দ্রের উৎপাদন নেমেছে ২১০ মেগাওয়াটে।

এই বিষয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), চট্টগ্রামের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকবর হোসেন বলেন, ‘গ্যাস-সংকটের কারণে গ্যাসনির্ভর কেন্দ্রগুলোর উৎপাদনে টান পড়েছে।’

অন্যদিকে গ্যাস-সংকটের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানায়। এর মধ্যে চট্টগ্রামে উৎপাদনে থাকা সাড়ে ৩০০ গার্মেন্টস কারখানায় সুদূরপ্রসারী প্রভাবের কথা জানালেন বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি কেডিএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম রহমান। তিনি জানান, এবারের সংকটে তো প্রভাব পড়লই। এটাকে যদি আমরা ভবিষ্যতের আরও বড় সংকটের ইঙ্গিত হিসেবে ধরে ব্যবস্থা গ্রহণ না করি, তাহলে সবকিছুই সংকটে পড়বে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত