Ajker Patrika

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক: প্রশাসনিক শূন্যতা কেটেছে, আস্থা ফেরেনি গ্রাহকদের

  • এক্সিম ব্যাংক থেকে আজ প্রশাসক সরিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
  • আগস্টেই বাকি চার ব্যাংকের প্রশাসককেও ফিরিয়ে নেওয়ার চিন্তা।
  • গ্রাহকদের অভিযোগ, এখনো চাহিদামতো টাকা তোলা যাচ্ছে না।
মৃত্তিকা সাহা, ঢাকা
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক: প্রশাসনিক শূন্যতা কেটেছে, আস্থা ফেরেনি গ্রাহকদের

শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে নতুন চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ হওয়ায় প্রশাসনিক শূন্যতা অনেকটাই কেটেছে। তবে আমানতকারীদের স্বস্তি এখনো ফেরেনি। তাঁদের অভিযোগ, বিভিন্ন শাখা থেকে তাঁরা এখনো চাহিদামতো আমানতের টাকা তুলতে পারছেন না। নগদ টাকা তোলায় সীমাবদ্ধতা, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠিত হয়েছে। এই ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে একীভূতকরণ এবং প্রশাসক নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান কাজী শায়রুল হাসান ও এমডি মো. আবেদুর রহমান সিকদার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকটির ওপর আরোপিত প্রশাসনিক তদারকি ধীরে ধীরে শিথিল করার উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এসব ব্যাংক থেকে পর্যায়ক্রমে প্রশাসক প্রত্যাহার এবং তাঁদের দায়িত্ব সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নিজস্ব পরিচালনা পর্ষদের কাছে হস্তান্তরের নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এই পাঁচ ব্যাংকের সব কটি থেকে একযোগে প্রশাসক সরানো হবে না। প্রথমে প্রতিটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা, তারল্য, পরিচালনাগত সক্ষমতা এবং পুনর্গঠনের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে। এরপর যে ব্যাংক দায়িত্ব গ্রহণের জন্য প্রস্তুত বলে বিবেচিত হবে, সেখান থেকে প্রশাসক প্রত্যাহার করা হবে। এর অংশ হিসেবে আজ বৃহস্পতিবার এক্সিম ব্যাংকের প্রশাসক মো. শওকাতুল আলমকে তাঁর চলতি দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে বাংলাদেশ ব্যাংকের আগের দায়িত্বে ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আগামী আগস্টের মধ্যেই বাকি চার ব্যাংকের প্রশাসককেও ফিরিয়ে নেওয়ার চিন্তা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আজকের পত্রিকাকে বলেন, ইতিমধ্যে এক্সিম ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা, তারল্য, পরিচালনাগত সক্ষমতা এবং পুনর্গঠনের অগ্রগতি সন্তোষজনক হওয়ায় এই ব্যাংকের প্রশাসককে আজ বাংলাদেশ ব্যাংকে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। তবে প্রশাসক প্রত্যাহার করলেও ব্যাংকটির কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

নতুন নেতৃত্ব, পুরোনো সংকট

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নতুন চেয়ারম্যান–এমডি পাওয়ার পর ব্যাংকের কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে গ্রাহকদের মধ্যে। তবে অর্থ উত্তোলন নিয়ে পুরোনো সংকট এখনো পুরোপুরি কাটেনি বলে অভিযোগ অনেক গ্রাহকের। ব্যাংকটির একাধিক শাখার বেশ কয়েকজন গ্রাহক অভিযোগ করেন, বড় অঙ্কের টাকা তুলতে হলে কয়েক দিন আগে আবেদন করতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও দৈনিক উত্তোলনের সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ফলে এই পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীরা চাহিদামতো টাকা তুলতে পারছেন না।

স্যোশাল ইসলামী ব্যাংকের নিউ ইস্কাটন শাখার গ্রাহক জিয়া উদ্দীন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার বাবা অসুস্থ। তাই বেতনের একটি অংশ বোনের বিয়ের জন্য সঞ্চয় করেছিলাম। এখন সেই টাকা তুলতে পারছি না, বোনের বিয়েও দিতে পারছি না।’ তিনি বলেন, ‘ব্যাংকে টাকা আছে। কিন্তু প্রয়োজনের সময় নিজের টাকাই তুলতে পারছি না। নতুন চেয়ারম্যান–এমডি এসেছেন। কিন্তু আমাদের সমস্যার কোনো পরিবর্তন হয়নি। কবে টাকা পাব, তাও জানি না।’

ভুক্তভোগী আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যসচিব মো. আলিফ রেজা আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও আমরা টাকা তুলতে পারছি না। এমনকি রেজল্যুশনে যে স্কিম ঘোষণা করেছে, সেই টাকাও দিচ্ছে না। যেমন চিকিৎসার জন্য ১০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক গ্রাহক অভিযোগ করছেন, তাঁরা সেই টাকা পাচ্ছেন না।’ তিনি বলেন, আগামী ১৫ আগস্টের মধ্যে আমানতকারীদের টাকা ফেরত না দিলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সব শাখা অবরোধ করা হবে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকেরা এখন চিকিৎসার পাশাপাশি অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা তুলতে পারবেন। আগে শুধু নিজের চিকিৎসার জন্য এ সুবিধা থাকলেও এখন মা-বাবা, ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন ও স্বামী-স্ত্রীর চিকিৎসাসহ অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনেও টাকা তোলার সুযোগ থাকবে।

সামনে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ

ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সামনে এখনো কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এগুলো হলো তারল্য সংকট কাটিয়ে ওঠা, আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, খেলাপি ঋণ আদায়ে গতি আনা এবং দৈনন্দিন ব্যাংকিং কার্যক্রম স্বাভাবিক করা। নেতৃত্ব পরিবর্তন একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ব্যাংকের তারল্য বৃদ্ধি এবং গ্রাহকদের অর্থপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা। অন্যথায় শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তনে আস্থার সংকট দূর হবে না। আমানতকারীরা যখন অবাধে টাকা তুলতে পারবেন, তখনই প্রকৃত অর্থে আস্থা ফিরে আসবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, সক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া ব্যাংক খাতের সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। আগে ব্যাংকগুলোকে কার্যকর ও সক্ষম করে তুলতে হবে, যাতে তারা আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারে। মানুষের আস্থা ফিরিয়ে এনে নতুন আমানত বাড়াতে হবে। কারণ, আমানতই ব্যাংকের সক্ষমতা বৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি। গ্রাহকেরা প্রয়োজনে সহজে টাকা তুলতে পারার বিষয়ে নিশ্চিত হলেই আবার ব্যাংকে টাকা রাখবেন। শুধু সরকারি অর্থ সহায়তা দিয়ে সমস্যা মিটবে না। বরং ব্যাংকগুলোর দুর্বলতার মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর সংস্কার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, প্রশাসক প্রত্যাহার মানেই পুনর্গঠন শেষ হয়ে গেছে—এমন নয়। বরং এটি পুনর্গঠনের একটি নতুন ধাপ। ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম স্বাভাবিক করা, গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং নিয়মিত ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করাই এখন মূল লক্ষ্য। পরিস্থিতির উন্নতি হলে আমানতকারীরা স্বাভাবিকভাবে ব্যাংকিং সেবা ও তাঁদের অর্থ ব্যবহারের সুযোগ আরও সহজভাবে পাবেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক সব সময়ই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পাশে থাকবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত