Ajker Patrika

চট্টগ্রামে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ: সূত্রপাত যেভাবে, একজনের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন, নেপথ্যে আধিপত্যের লড়াই

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ: সূত্রপাত যেভাবে, একজনের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন, নেপথ্যে আধিপত্যের লড়াই
দিনভর দফায় দফায় সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। ছবি: আজকের পত্রিকা

চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে গ্রাফিতিতে শব্দ পরিবর্তন এবং তা নিয়ে ফেসবুক লাইভকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটেছে। গতকাল মঙ্গলবার দিনভর দফায় দফায় চলা এই সংঘর্ষে একজনের পায়ের গোড়ালি প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং অন্তত ২০ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। বিকেলের দিকে নগরের ব্যস্ততম নিউমার্কেট মোড় এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

ঘটনার সূত্রপাত: একটি গ্রাফিতি ও ‘গুপ্ত’ বিতর্ক

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঘটনার মূলে ছিল জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলনের স্মরণে আঁকা একটি গ্রাফিতি। কলেজ ক্যাম্পাসের একটি ভবনের দেয়ালে লেখা ছিল— ‘ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রলীগমুক্ত ক্যাম্পাস’। গত সোমবার বা মঙ্গলবার সকালে কলেজ শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে একদল কর্মী ওই লেখার ‘ছাত্র’ শব্দটি মুছে তার ওপর ‘গুপ্ত’ লিখে দেন। এতে বাক্যটি দাঁড়ায়— ‘গুপ্তরাজনীতি ও ছাত্রলীগমুক্ত ক্যাম্পাস’।

দিনভর দফায় দফায় সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। ছবি: আজকের পত্রিকা
দিনভর দফায় দফায় সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। ছবি: আজকের পত্রিকা

এই শব্দ পরিবর্তনের বিষয়টি ভিডিও ধারণ করে মামুন তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করেন। ভিডিওটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা এটিকে তাঁদের সংগঠনের প্রতি উস্কানি ও অপমান হিসেবে গণ্য করেন। শিবিরের অভিযোগ, ছাত্রদল ইচ্ছাকৃতভাবে শিবিরকে ‘গুপ্ত’ রাজনীতির তকমা দিয়ে ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে।

সংঘর্ষের ঘটনাক্রম

প্রথম দফা (দুপুর ১২টা): মঙ্গলবার সকাল থেকেই ক্যাম্পাসে দুপক্ষের নেতাকর্মীরা জড়ো হতে থাকেন। দুপুর ১২টার দিকে উভয় পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে পাল্টাপাল্টি স্লোগান দিতে শুরু করলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এসময় কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতর ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে পুলিশ ও কলেজের শিক্ষকেরা হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত করেন।

দিনভর দফায় দফায় সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। ছবি: আজকের পত্রিকা
দিনভর দফায় দফায় সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। ছবি: আজকের পত্রিকা

দ্বিতীয় দফা (বিকেল ৪টা): বিকেল ৪টার দিকে নগরের নিউমার্কেট মোড়ে দ্বিতীয় দফায় বড় ধরনের সংঘর্ষ শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপক্ষই হেলমেট পরে দেশীয় ধারালো অস্ত্র, কিরিচ, রামদা ও লাঠিসোঁটা নিয়ে একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। দুপক্ষের মারমুখী অবস্থানে পথচারীরা দিকবিদিক ছোটাছুটি শুরু করেন এবং আশপাশের দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। সংঘর্ষের সময় বেশ কিছু ককটেল বিস্ফোরণের শব্দও শোনা গেছে বলে অনেকে দাবি করেছেন।

গোড়ালি বিচ্ছিন্নের ভিডিও

সংঘর্ষের সবচেয়ে মর্মান্তিক দৃশ্যটি ধরা পড়ে নিউমার্কেট মোড়ে। প্রতিপক্ষের ধারালো অস্ত্রের কোপে এক যুবকের পায়ের গোড়ালি প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে ঝুলে আছে— এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, আহত ওই যুবকের নাম মোহাম্মদ আশরাফ। তিনি পাহাড়তলী ওয়ার্ড শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি এবং সিটি কলেজের অনার্সের শিক্ষার্থী। তাঁকে উদ্ধার করে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ২২ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, রক্তাক্ত আশরাফ হাঁটতে পারছেন না, কয়েকজন তাঁকে পাঁজাকোলা করে সরিয়ে নিচ্ছেন।

দিনভর দফায় দফায় সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। ছবি: আজকের পত্রিকা
দিনভর দফায় দফায় সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। ছবি: আজকের পত্রিকা

পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও রাজনৈতিক সমীকরণ

চট্টগ্রাম মহানগর দক্ষিণ শাখা ছাত্রশিবিরের প্রচার সম্পাদক জাহিদুল আলম জয় বলেন, ‘ছাত্রদল আদর্শিকভাবে দেউলিয়া হয়ে এখন অস্ত্রের ভাষা ব্যবহার করছে। অস্ত্রধারী ছাত্রদল কর্মীদের হামলায় আমাদের অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। ভিডিও ফুটেজে রামদা হাতে ওমর গনি এমইএস কলেজ ছাত্রদলের সদস্য সচিব মির্জা ফারুককে স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা গেছে।’

অপর দিকে সরকারি সিটি কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক সোহেল ছিদ্দিকী রনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে শিবিরের নেতাকর্মীরা বহিরাগতদের নিয়ে আমাদের ওপর হামলা করেছে। তারা ক্যাম্পাসে “গুপ্ত” রাজনীতি কায়েম করতে চায়। আমাদের ৫ থেকে ৬ জন কর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন।’

একটি গ্রাফিতিতে শব্দ পরিবর্তনের জেরে শুরু হয় সংঘর্ষ। ছবি: আজকের পত্রিকা
একটি গ্রাফিতিতে শব্দ পরিবর্তনের জেরে শুরু হয় সংঘর্ষ। ছবি: আজকের পত্রিকা

বর্তমান পরিস্থিতি

সংঘর্ষের জেরে কলেজ কর্তৃপক্ষ দুপুরের পর থেকে সব ক্লাস ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান পরীক্ষা ব্যতিরেকে অন্যান্য অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করেছে। কলেজের অধ্যক্ষ আবু সালেহ মোহাম্মদ নঈম উদ্দিন বলেন, ‘আমরা শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করেছি যাতে কলেজের সুনাম ক্ষুণ্ণ না হয়।’

কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আফতাব উদ্দিন জানান, বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং নিউমার্কেট ও সিটি কলেজ এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও রায়ট গিয়ার মোতায়েন করা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ ও স্থিরচিত্র দেখে অস্ত্রধারীদের শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ ছাত্রলীগের একক নিয়ন্ত্রণে ছিল। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ছাত্রলীগ ক্যাম্পাস ছাড়া হলে সেখানে ছাত্রদল ও শিবির উভয়ই নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে সক্রিয় হয়। দীর্ঘদিনের এই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও আধিপত্যের লড়াই মূলত একটি গ্রাফিতিকে কেন্দ্র করে চূড়ান্ত বিস্ফোরণে রূপ নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

সংরক্ষিত নারী আসনের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন তাসনিম জারা

নওগাঁয় চার খুন: নেপথ্যে সম্পত্তির বিরোধ নাকি অন্য কিছু, পুলিশি হেফাজতে বাবা, দুই বোন ও ভাগনে

হলিউড তারকা হ্যাথাওয়ের ‘ইনশা আল্লাহ’ বলা নিয়ে নেট দুনিয়ায় ঝড়

মালয়েশিয়ায় নিখোঁজ হয়ে ১৫ বছর জঙ্গলে কাটানো আমির দেশে ফিরছেন

সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন নুসরাত

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত