
বন্ধ কারখানা চালু, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ বিতরণে গতি নেই। চার মাসে ঋণ বিতরণ হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা; আর বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতের জন্য বরাদ্দ ২০ হাজার কোটি টাকা থেকে ঋণ বিতরণ হয়েছে মাত্র ৫০ কোটি টাকা। পুরো প্যাকেজে সরাসরি ঋণগ্রহীতাদের হাতে পৌঁছেছে এক হাজার কোটি টাকার কম।
ঋণগ্রহীতার পুরোনো রিট বা অন্য মামলা চলমান থাকলে প্রণোদনা, নীতিগত সহায়তা কিংবা বিশেষ সুবিধা দেওয়ার আগে মামলা প্রত্যাহারের শর্ত থাকাসহ নানা কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
ঋণ বিতরণে ধীরগতির জন্য ব্যবসায়ী ও ব্যাংকাররা পরস্পরকে দুষছেন। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে আগ্রহী নয়। অন্যদিকে ব্যাংকারদের দাবি, খেলাপি ঋণের চাপ, জামানতের ঘাটতি এবং উদ্যোক্তাদের অসম্পূর্ণ কাগজপত্রের কারণে ঋণ অনুমোদনে সময় লাগছে। এই পরিস্থিতিতে ঋণের শর্ত শিথিল এবং সুদের হার কমানোর উপায় খুঁজছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এই প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৭ শতাংশ। এর মাধ্যমে ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে কুটির, ছোট, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই), কৃষি এবং উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতির জন্য বরাদ্দ তহবিল থেকেও এখন পর্যন্ত ঋণ বিতরণ হয়নি।
ঋণ বিতরণে গতি আনতে ৬ অক্টোবর শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে অর্থনীতিবিদ ও সাবেক ব্যাংকারদের সঙ্গেও আলোচনা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলতি মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংকার ও ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
খেলাপি ঋণ থাকলে প্রণোদনার ঋণের জন্য আবেদন করতে না পারার শর্ত শিথিলের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, ঋণ নিয়মিত করতে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দেওয়ার মতো অর্থ থাকলে অনেক উদ্যোক্তার পক্ষে কারখানা চালু রাখাই সহজ হতো। এ ছাড়া বন্ধ বা আংশিক বন্ধ কারখানা পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনা যাচাই করে অর্থায়ন, প্রকল্পভিত্তিক ঋণ, একই গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংকিং সুবিধা চালু রাখা এবং দ্রুত ঋণ অনুমোদন ও অর্থছাড়ের প্রস্তাব দিয়েছেন তাঁরা।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, বন্ধ কারখানায় ঋণ দিয়ে ব্যাংকগুলো ঝুঁকি নিতে চায় না। ঋণের জন্য গেলে জামানত চাওয়া হচ্ছে। অথচ জামানত দেওয়ার সক্ষমতা থাকলে উদ্যোক্তারা এককালীন ঋণ নিষ্পত্তির সুবিধা নিতে পারতেন। বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা এবং চলতি মূলধনের সংকটে ভোগা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সহায়তা দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, নতুন কারখানা তৈরি করতে কয়েক বছর সময় লাগে। তুলনামূলক কম সময়ে বন্ধ কারখানা চালু করা সম্ভব। তাই প্রণোদনার ঋণ বিতরণ বাড়াতে কিছু শর্ত শিথিল করা প্রয়োজন।
নারায়ণগঞ্জের উদ্যোক্তা আর বি নিটওয়্যারসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুর রহমানের দাবি, তিনি ঋণের জন্য আবেদন করেছিলেন। বিকেএমইএর সুপারিশ থাকলেও ঋণ পাননি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১-এর গত ২৯ জুলাইয়ের সার্কুলার লেটার ২৫ অনুযায়ী, ঋণগ্রহীতার পুরোনো রিট বা অন্য মামলা চলমান থাকলে প্রণোদনা, নীতিগত সহায়তা কিংবা বিশেষ সুবিধা দেওয়ার আগে মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রত্যাহার করা মামলার তালিকা এবং সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে কোনো মামলা চলমান নেই—এ মর্মে হলফনামা দিতে হবে।
অন্যদিকে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গত ১৭ আগস্টের সার্কুলার লেটার ১৬-তে প্রথমে আবেদন পর্যালোচনা করে সন্তোষজনক হলে ‘নীতিগত সম্মতিপত্র’ দেওয়ার বিধান রয়েছে। ওই সম্মতিপত্রের ভিত্তিতে মামলা প্রত্যাহার ও হলফনামা দেওয়ার পর সহায়তা বাস্তবায়ন করতে হবে। হলফনামা দেওয়ার পর অনুমোদিত সহায়তার শর্ত পরিবর্তন করা যাবে না।
দুটি নির্দেশনার পার্থক্য হলো, ব্যাংকের ক্ষেত্রে মামলা প্রত্যাহারের আগে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন বা লিখিত নীতিগত সম্মতির বিষয়টি স্পষ্ট নয়। ফলে মামলা প্রত্যাহারের পর আবেদন বাতিল হলে কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে অর্থঋণ আদালতসহ বিভিন্ন মামলায় আটকে থাকা মন্দ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৮ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ৩ লাখ ২০ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে মামলায় আটকে থাকা অর্থ বেড়েছে ৩ লাখ ২৭ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা, যা দ্বিগুণের বেশি। একই সময়ে মামলার সংখ্যা ২ লাখ ১৯ হাজার ৬৩৩ থেকে বেড়ে ২ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৫টিতে দাঁড়িয়েছে।
এই বিষয়ে বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ব্যাংকের অসহযোগিতার কারণে অনেক উদ্যোক্তা আবেদন করতে পারছেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিপত্রের জটিলতা দূর করে মামলা প্রত্যাহারের আগে ব্যাংকের পক্ষ থেকে নিশ্চয়তা দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে জমা পড়া আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, যথাযথ যাচাই-বাছাই করে যোগ্য উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে হবে। শুধু লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য ঋণ দেওয়া হলে ব্যাংক খাতে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে। বর্তমানে দেশে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৩ শতাংশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোকে চাপ না দিয়ে তদারকি বাড়ানো উচিত। মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে তিনি বলেন, দুটি সার্কুলারেই মামলা প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে। তবে আগে না পরে মামলা প্রত্যাহার করতে হবে, তা বাংলাদেশ ব্যাংকই ভালো বলতে পারবে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে ঝুঁকি বিবেচনা করে ঋণ দিতে হবে। সে অনুযায়ী আবেদন যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। খেলাপি ঋণের চাপে থাকা ব্যাংকগুলোকে নতুন ঋণ দেওয়ার আগে আবেদন এবং বন্ধ কারখানার পরিচালন সক্ষমতা মূল্যায়ন করতে হচ্ছে।
প্যাকেজের ৪১ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তহবিল থেকে এবং ২১ হাজার কোটি টাকা পুনঃ অর্থায়ন তহবিল থেকে বিতরণের কথা। বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতে ২০ হাজার কোটি, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ১০ হাজার কোটি, সিএমএসএমই খাতে ৫ হাজার কোটি, রপ্তানি বহুমুখীকরণে ৩ হাজার কোটি এবং উত্তরাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক হাব গড়তে ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। বাকি অর্থ বিভিন্ন রপ্তানি, ক্ষুদ্র উদ্যোগ, কর্মসংস্থান ও পরিবেশবান্ধব খাতে নির্ধারিত।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ বিতরণ চলছে। যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদন ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠাচ্ছে, যা যাচাই করে দ্রুত নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। মামলা প্রত্যাহারের পর আবেদন বাতিল হলে পুনরায় মামলা করার সুযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সার্কুলারে পার্থক্যের বিষয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানান।

বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়ালেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে আরও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আগের ৪ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। একই সময়ে
১ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে দেওয়া কোনো সংস্থার পূর্বাভাসকে বিতর্কিত করতে চায় না সরকার। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভায় বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেওয়া অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের এ-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে এমন মন্তব্য করেছেন।
১ ঘণ্টা আগে
ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনরুদ্ধারে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে অর্থ দেওয়া হবে বলে সোনালী ব্যাংকের কোনো ঝুঁকি নেই। এর আগেও এ ধরনের কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে ব্যাংকটি। দু-একটি ব্যাংক অর্থ ফেরত দিতে না পারলেও বাংলাদেশ ব্যাংক তা পরিশোধ করেছে...
৭ ঘণ্টা আগে
ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন আরও সহজ, দ্রুত ও নিরাপদ করতে নতুন অ্যাপ চালু করেছে মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান নগদ। গ্রাহকবান্ধব ইন্টারফেস এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি নতুন এই অ্যাপ মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক চাহিদাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
৮ ঘণ্টা আগে