Ajker Patrika

সিপিডির বাজেট সংলাপ: সরকারের সামনে তিন সংকট

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
সিপিডির বাজেট সংলাপ: সরকারের সামনে তিন সংকট
রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত বাজেট সংলাপে অতিথিরা। ছবি: আজকের পত্রিকা

ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়ে যাত্রা শুরু করা বর্তমান সরকারের সামনে এখন তিনটি বড় সংকট—কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও জ্বালানি। এসব চ্যালেঞ্জ দক্ষতার সঙ্গে কার্যকরভাবে মোকাবিলা না করা গেলে বাজেট বাস্তবায়ন ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যেতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা।

গতকাল রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত বাজেট সংলাপে অংশ নিয়ে তাঁরা এমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। এর জবাবে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে সময় লাগবে। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা অর্থনীতি পেয়েছি ভঙ্গুর অবস্থায়। বাজেট তৈরি করতে যেখানে ছয় মাস সময় লাগে, সেখানে আমরা পেয়েছি মাত্র দেড় মাস। তাই এই বাজেট ষোলো আনা সুষম হয়েছে বলব না, সাধ্যের মধ্যে অনেক কিছু করার চেষ্টা হয়েছে। তবে এতেই দ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে না। বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় আমি মনে করি, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পর্যায়ে ফেরাতে সময় লাগতে পারে দুই বছর।’

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, বাজেট বাস্তবায়ন তদারকিতে আগামী ১ জুলাই থেকে ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড চালু করা হবে। পাশাপাশি রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য আনতে সব খাতে বন্ড লাইসেন্স সুবিধা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) পুনর্গঠন করে নীতি বিভাগ আলাদা করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

জ্বালানিসংকটকে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান এক দিনে সম্ভব নয়। বাইরে থেকে গ্যাস এনে সরবরাহ করতে অন্তত ১৮ মাস সময় লাগবে। তিনি আরও বলেন, সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য নিয়ে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।

সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনার জন্য তিন মাস অন্তর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা থাকা জরুরি। তাঁর মতে, দীর্ঘসূত্রতা ও প্রকল্প স্থবিরতা অর্থনৈতিক কার্যকারিতাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, প্রতিটি প্রকল্প দৈনিক ভিত্তিতে তদারকির জন্য ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড চালু করা হচ্ছে। একই সঙ্গে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নাগরিক ও ব্যবসায়ীরা নীতিগত হয়রানি বা বাধার অভিযোগ জানাতে পারবেন।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, বর্তমান বাজেট বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর মতে, এটি ঘাটতি ও ঋণনির্ভর, যা অর্থনীতিকে আরও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশে ঋণ এখন বিনিয়োগের মাধ্যম নয়, বরং টিকে থাকার উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি জানান, নিম্ন আয়ের মানুষ খাদ্য ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমিয়ে দিচ্ছে, যা সামাজিক চাপ বাড়াচ্ছে। তাঁর মতে, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও শিক্ষার মান—এই তিন ক্ষেত্রে সংকট এখন প্রকট।

র‌্যাপিড চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাক বলেন, দেশে সম্পদ বৈষম্য দ্রুত বাড়ছে। তাঁর গবেষণা অনুযায়ী, জনসংখ্যার ১ শতাংশের হাতে প্রায় ৫০ শতাংশ সম্পদ কেন্দ্রীভূত। তিনি সম্পদ কর ও উত্তরাধিকার কর চালুর পরামর্শ দেন।

বিজিএমইএ ও শিল্প সংগঠনের নেতারা বলেন, জ্বালানিসংকট ও উচ্চ সুদহার শিল্প খাতকে টিকিয়ে রাখার পথে বড় বাধা। তাঁদের মতে, প্রবৃদ্ধির চেয়ে বিদ্যমান শিল্প রক্ষা এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষ বলেন, শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে বাজেটে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। দীর্ঘদিনের রেশন সুবিধার দাবি উপেক্ষিত থাকায় শ্রমিকদের সংকট আরও বাড়ছে।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট রূপরেখা নেই। তাঁর মতে, চারটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ স্থবির বা হ্রাস পেয়েছে, যা কর্মসংস্থানের লক্ষ্য অর্জনে বড় বাধা।

ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য থাকলেও খাদ্য ও জ্বালানিসংকট নিয়ন্ত্রণ ছাড়া তা অর্জন কঠিন হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত