Ajker Patrika

শিল্পের স্বনির্ভরতায় বাড়ছে শঙ্কা

শাহ আলম খান, ঢাকা 
শিল্পের স্বনির্ভরতায় বাড়ছে শঙ্কা
ফাইল ছবি

বিশ্ব অর্থনীতিতে যেখানে প্রতিযোগিতার মূল ভিত্তি হয়ে উঠেছে উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও উচ্চ মূল্য সংযোজন; সেখানে বাংলাদেশ যেন হাঁটছে উল্টো স্রোতে। প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সেই লক্ষ্য অর্জনে বেছে নেওয়া হয়েছে অপেক্ষাকৃত সহজ পথ—রপ্তানি বাড়াতে আমদানি নীতিতে বড় ধরনের শিথিলতা। এ জন্য রপ্তানি পণ্যে স্থানীয়ভাবে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব আনা হয়েছে, যা ইতিমধ্যে নীতিগত বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, রপ্তানিমুখী খাতে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হবে। ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে কাঁচামাল আনার প্রক্রিয়াও সহজ করা হবে, যাতে উৎপাদন ব্যয় কমে এবং দ্রুত রপ্তানি বাড়ে। সরকারের মতে, উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে এটিই হবে কার্যকর ও দ্রুত ফল পাওয়ার একটি কৌশল।

তবে অর্থনীতির ভেতরের বাস্তবতা ভিন্ন প্রশ্ন তুলছে। অর্থনীতিবিদ, শিল্প বিশ্লেষক ও উদ্যোক্তাদের একাংশ মনে করছেন, এই নীতি স্বল্প মেয়াদে রপ্তানি আয় ও প্রবৃদ্ধিতে গতি আনতে পারে। কিন্তু এর বিনিময়ে দীর্ঘ মেয়াদে শিল্পের নিজস্ব সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, উদ্ভাবনী শক্তি এবং স্বনির্ভর উৎপাদনভিত্তি দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। তাঁদের আশঙ্কা, এতে দেশীয় শিল্প আরও বেশি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়তে পারে এবং উচ্চ মূল্য সংযোজনভিত্তিক শিল্পায়নের পথ আরও দীর্ঘ হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, ‘বর্তমানে তৈরি পোশাক খাতে গড়ে প্রায় ৪০ শতাংশ মূল্য সংযোজন হয়। বাকি অংশ আমদানিনির্ভর। ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন শর্ত তুলে দেওয়ার নতুন নীতির একই ধারা অন্যান্য খাতে বিস্তৃত হলে সাময়িকভাবে সার্বিক রপ্তানি আয় বাড়তে পারে। কিন্তু এতে প্রকৃত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সক্ষমতা সীমিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো শিল্পের আপগ্রেডেশন থেমে যাওয়া।’

একই ধরনের সতর্কতা রেখেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র‍্যাপিড)। সংস্থাটির চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাক বলেন, ‘নীতি সহজীকরণ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেটি যদি শিল্পের প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে উৎসাহ না দেয়, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে দেশকে অ্যাসেম্বলিনির্ভর অর্থনীতিতে আটকে ফেলতে পারে।’

সরকারি নীতিনির্ধারণী পর্যায় অবশ্য ভিন্ন যুক্তি তুলে ধরছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য রপ্তানি সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো। অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যমান মূল্য সংযোজন শর্ত বাস্তব উৎপাদনকাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই শুল্কমুক্ত আমদানি সহজ করলে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং প্রতিযোগিতা বাড়বে।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্বল্প মেয়াদে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোই বর্তমান নীতির মূল উদ্দেশ্য।’

তবে সরকারের এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)। সংগঠনটির মতে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্য সংযোজনের শর্ত তুলে দেওয়ার উদ্যোগ দেশীয় প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্পের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এ বিষয়ে বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের প্রধান ভিত্তি হলো প্রাইমারি টেক্সটাইল খাত। এই খাত শক্তিশালী না হলে স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়ানো, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।’ তাই প্রস্তাবিত বাজেটের এ উদ্যোগ পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে দেশীয় শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করার আহ্বান জানান তিনি।

ব্যবসায়ী মহলের মধ্যেও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির এক শীর্ষ নেতা বলেন, ‘নীতি সহজ না হলে আমরা আন্তর্জাতিক বাজারে টিকতে পারব না, এটা সত্য। কিন্তু একই সঙ্গে দেশীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার দিকেও নজর দিতে হবে। না হলে আমরা শুধু অ্যাসেম্বলি হাবে পরিণত হব।’

অন্য এক রপ্তানিকারক উদ্যোক্তা বলেন, ‘বর্তমান কাঠামোয় লাভের বড় অংশ কাঁচামাল আমদানির খরচে চলে যায়। ফলে রপ্তানি বাড়লেও প্রকৃত আয় সীমিত থাকে। নতুন নীতিতে এই প্রবণতা আরও বাড়ার আশঙ্কা আছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত