Ajker Patrika

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের নিবন্ধ

মোদির অর্থনৈতিক মডেল কেন তরুণদের কাজে আসছে না

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
মোদির অর্থনৈতিক মডেল কেন তরুণদের কাজে আসছে না
দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকে তরুণদের বিক্ষোভ। ছবি: এএফপি

বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি হিসেবে ভারত নিজেদের তুলে ধরলেও, দেশটির কোটি কোটি তরুণ-তরুণীর জীবনে সেই প্রবৃদ্ধির সুফল পৌঁছাচ্ছে না। সম্প্রতি প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া জেন-জিদের বিক্ষোভ দ্রুতই তীব্র সামাজিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষে রূপ নিয়েছে। এই বিক্ষোভ শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে নজিরবিহীন নীতিগত পিছু হটতে বাধ্য করেছে।

২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। তবে গত মাসে রাস্তায় নেমে আসা শত শত তরুণ আন্দোলনকারীর অভিযোগ, বিশ্ব জনসংখ্যার শীর্ষে থাকা দেশটির বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্ব তরুণদের কর্মসংস্থান ও সুযোগ সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়েছে। আন্দোলনের মুখে ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীকে পরিবর্তন করেছে দিল্লি এবং উচ্চশিক্ষার তীব্র প্রতিযোগিতামূলক প্রবেশিকা পরীক্ষা সংস্কারে গঠন করা হয়েছে বিশেষ কমিশন।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, চলমান যুব অসন্তোষ ভারতের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কাঠামোর গভীর সংকটেরই বহিঃপ্রকাশ।

প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন প্রবেশিকা পরীক্ষায় অনিয়ম ও প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা ‘কাকরোচ জনতা পার্টি’ নামে শুরু হলেও, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তা ভারতের তরুণ প্রজন্মের বঞ্চিত বোধের বড় প্রতীকে পরিণত হয়। প্রাথমিকভাবে এই বিক্ষোভ উপেক্ষা করা এবং পরবর্তীতে তা কঠোর হস্তে দমনের চেষ্টা চালানো হলেও, তীব্র জনমতের মুখে কৌশল বদলাতে বাধ্য হয় কেন্দ্র।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দীর্ঘদিন এ বিষয়ে নীরব থাকলেও সম্প্রতি তরুণদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে ভিডিও বার্তা দিয়েছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের কাছে পৌঁছাতে মন্ত্রিসভার সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছেন।

প্রশাসনিক সূত্রের খবর, ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নীতি নির্ধারকেরা এখন ‘কর্মসংস্থান-সংযুক্ত প্রণোদনা’ সংক্রান্ত নতুন নীতি তৈরিতে কাজ করছেন।

বেসরকারি অর্থনৈতিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমি’র (সিএমআইই) প্রধান নির্বাহী মহেশ ব্যাস জানান, দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও ভারতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। ব্যাস বলেন, ‘ভারত তার জনসংখ্যাগত লভ্যাংশের (তরুণ কর্মক্ষম জনগণ) সুযোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তরুণ স্নাতকদের জন্য ভালো মানের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি সরকার।’

ভারতে বর্তমানে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী জনসংখ্যা প্রায় ৩৭ কোটি, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। শিক্ষাগ্রহণের হার বাড়লেও বহু তরুণের ক্ষেত্রে উচ্চমানের এবং ব্যয়বহুল ডিগ্রি পাওয়ার পরও উপযুক্ত চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। সিএমআইই-এর তথ্যানুযায়ী:, গত অর্থবছরে ভারতে সামগ্রিক বেকারত্বের হার ছিল ৬ দশমিক ৯ শতাংশ। কিন্তু উচ্চশিক্ষিত বা স্নাতকদের ক্ষেত্রে এই বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ দশমিক ৫ শতাংশে। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার পৌঁছায় ৩৬ শতাংশে।

বিহারের বাসিন্দা ৩২ বছর বয়সী রঞ্জিত কুমার দাস এক দশক আগে বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। তবে আট বছর ধরে একটি ডেন্টাল ক্লিনিকে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কাজ করার পর তাঁর সর্বোচ্চ বেতন দাঁড়ায় মাত্র ১৬ হাজার রুপি (প্রায় ১৭০ মার্কিন ডলার)।

রঞ্জিত বলেন, ‘আমার দুই বড় ভাই পড়ালেখা করেননি—একজন রাজমিস্ত্রি, অন্যজন ড্রাইভার। তারা আমার চেয়ে বেশি আয় করেন। আমাদের বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় কাজের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।’

অর্থনীতিবিদ এবং ‘ইন্ডিয়া আউট অব ওয়ার্ক’ বইয়ের লেখক সন্তোষ মেহরোত্রা জানান, তরুণদের জন্য ভালো মানের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে অনেক দেশ হিমশিম খেলেও, ভারতে এই পরিস্থিতি সরকারের নীতিগত ভুলের কারণে আরও জটিল হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে ভারতের বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৮ শতাংশ থাকলেও, মোদী সরকারের আমলে তা কমে ৬ থেকে ৭ শতাংশে নেমে এসেছে—অথচ একই সময়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে।

মেহরোত্রা বলেন, ‘অর্থনীতির বর্তমান গাঠনিক সংকট মূলত সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের ভুলের কারণেই তৈরি হয়েছে।’

পর্যবেক্ষকদের মতে, মোদী সরকার সাম্প্রতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরির দীর্ঘমেয়াদি সংকট সমাধান করা ভারতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই থাকছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত