Ajker Patrika

দেশের অর্থনীতি: সব খাতে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ক্ষত

  • জ্বালানির সংকট ও মূল্যবৃদ্ধিতে ব্যয় বেড়েছে সবখানে।
  • রেমিট্যান্স আপাতত না কমলেও কমেছে বিদেশে কর্মী যাওয়া।
  • জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কা বিশ্বব্যাংকের।
  • দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
শাহ আলম খান, ঢাকা 
দেশের অর্থনীতি: সব খাতে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ক্ষত

মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের কালো ছায়া পড়েছে বিশ্বের দেশে দেশে। নানা সংকটে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। বাংলাদেশও এর বাইরে নেই। অনিশ্চয়তার ছাপ এসে পড়েছে দেশের অর্থনীতির প্রতিটি খাতে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পরিবহন ব্যয় থেকে বাজারদর, শিল্প উৎপাদন থেকে আমদানি-রপ্তানিতে। সব জায়গায় বেড়ে যাচ্ছে ব্যয়। আর তাতে শেষ পর্যন্ত ভুগতে হচ্ছে মানুষকেই।

অর্থনীতির এই অবস্থা নিয়ে এরই মধ্যে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি বলছে, যুদ্ধকেন্দ্রিক সংকটের কারণে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে। পাশাপাশি প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচেই থেকে যেতে পারে।

এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দু জ্বালানি খাত। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সম্প্রতি জানিয়েছেন, যুদ্ধের আগে বিশ্ববাজারে যে দামে জ্বালানি আমদানি করা হতো, এখন তা প্রায় দ্বিগুণ। এরই মধ্যে জ্বালানি আমদানিতে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার।

তবে বেসরকারি আর্থিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হানের মতে, এ ধাক্কা শুধু জ্বালানিতে সীমাবদ্ধ নেই, এটি অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০ ডলার বাড়লে আমদানি ব্যয় গড়ে ৮০০ থেকে ১,০০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বাড়ে। সাম্প্রতিক দুই মাসে এই চাপ মিলিয়ে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকায়।

এই বাড়তি ব্যয়ের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। তেল, কয়লা ও এলএনজি থেকে পাওয়া দেশের মোট বিদ্যুতের প্রায় ৬৫ শতাংশই আসে আমদানি করা জ্বালানিনির্ভরতা থেকে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়ার কারণে গত এক বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ১২ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়েছে, আর সাম্প্রতিক দুই মাসে সেই চাপ আরও তীব্র হয়েছে। ফলে ভর্তুকির চাপ বাড়ছে, যা সরাসরি সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় প্রতিফলিত হচ্ছে।

বাণিজ্য খাতে এই সংকটের আরেকটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি জানায়, আমদানির পরিমাণ কমলেও ব্যয় কমছে না, বরং বাড়ছে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এটি ‘কম ভলিউম, বেশি ব্যয়’—আমদানি করা মুদ্রাস্ফীতির সবচেয়ে স্পষ্ট লক্ষণ।

এই পরিস্থিতির সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব তুলে ধরেছে সানেম। তাদের ‘সিজিই’ মডেল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তেলের দাম ৪০ শতাংশ এবং এলএনজি ৫০ শতাংশ বাড়লে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রায় ১.২ শতাংশ কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে রপ্তানি ২ শতাংশ এবং আমদানি ১.৫ শতাংশ কমতে পারে। মূল্যস্ফীতি বর্তমানের চেয়ে বাড়তে পারে আরও ৪ শতাংশের মতো, যা সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াবে এবং প্রকৃত মজুরি কমাবে। গত মার্চ মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৭১ শতাংশ।

ব্যবসায়ীদের কাছে গেলে সংকটের আরও কঠিন বাস্তবতা পাওয়া যাবে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, ‘জ্বালানির দাম বাড়লে এর প্রভাব সরাসরি উৎপাদন খরচে পড়ে। পরিবহন থেকে কাঁচামাল—সব খরচ একসঙ্গে বাড়ে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম চাইলেই বাড়ানো যায় না, ফলে ব্যবসার লাভের মার্জিন কমে যাচ্ছে।’

এ ছাড়া সরবরাহ ব্যবস্থায়ও চাপ স্পষ্ট। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে কনটেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ গড়ে সাড়ে ৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে সমুদ্রপথে শিপিং খরচ ৩৫-৪৫ শতাংশ এবং বিমা প্রিমিয়াম ৫০-৬০ শতাংশ বাড়ায় আমদানি-রপ্তানি উভয় খাতে ব্যয় বেড়েছে। ফলে কাঁচামাল আমদানির খরচ বাড়ছে, আবার রপ্তানি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির গত সপ্তাহে জাতীয় সংসদে বলেছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে আমদানি ব্যয়, শিপিং ও বিমা খরচ বেড়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে রপ্তানি কমেছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

রেমিট্যান্স খাতে আপাত-ইতিবাচক প্রবণতা থাকলেও এর ভেতরে রয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার স্বার্থে অনেক প্রবাসী তাঁদের সঞ্চিত অর্থের একটা বড় দেশে পাঠিয়েছেন। যার ওপর ভর করে গত দুই মাসে দেশে প্রবাসী আয় কিছুটা বেড়েছে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে এই সময়ে নতুন নিয়োগ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘বর্তমান প্রবাহ কিছুটা স্থিতিশীল মনে হলেও এটি দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই না-ও হতে পারে। শ্রমবাজার সংকুচিত হলে রেমিট্যান্সেও ধাক্কা লাগবে।’

অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও গভীর। খাদ্য, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় একসঙ্গে বাড়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। কৃষি খাতে সেচ, সার পরিবহন ও বাজারজাতকরণ ব্যয় বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে, কিন্তু কৃষকের লাভ সেই হারে বাড়েনি। পরিবহন খাতে ভাড়া বৃদ্ধি সরবরাহ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।

শিল্প খাতে সংকট আরও প্রকট। গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ অনিশ্চয়তায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। বাংলাদেশ রি-রোলিং মিলস অ্যাসোসিয়েশনের একাধিক সদস্য জানান, গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকট এবং দাম বাড়ার কারণে উৎপাদন খরচ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এতে ছোট ও মাঝারি শিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক কারখানা উৎপাদন সময় কমিয়েছে, কেউ কেউ অর্ডার সীমিত করেছে; যা সামগ্রিক শিল্প উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সব মিলিয়ে গত দুই মাসে বাংলাদেশ এমন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে, যেখানে বৈশ্বিক অস্থিরতা সরাসরি অভ্যন্তরীণ সংকটে রূপ নিচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের পরামর্শ, এই পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। জ্বালানির বিকল্প উৎস নিশ্চিত করা, সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো, নতুন রপ্তানি ও শ্রমবাজার অনুসন্ধান এবং বাজার তদারকি জোরদার করা—এই চারটি ক্ষেত্রেই এখন কৌশলগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। কারণ, সংকট যত দীর্ঘ হবে, অর্থনীতির ওপর তার ক্ষতও তত গভীর হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ভরপেট বিরিয়ানির পর তরমুজ, একে একে প্রাণ হারাল একই পরিবারের ৪ সদস্য

মূল বেতনের সমপরিমাণ উৎসাহ ভাতা পেতে যাচ্ছেন ব্যাংকাররা

সরকারের হস্তক্ষেপে ভেঙে গেল শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট বোর্ড

নিউমার্কেট এলাকায় গুলিতে নিহত ব্যক্তি শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের সহযোগী টিটন

ইউনূস ভিভিআইপি এক বছরই, মেয়াদ শেষে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী ভিভিআইপি ৬ মাস

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত