Ajker Patrika

পাঁচ মাসের যুদ্ধ ও হরমুজ বন্ধ থাকার পরও তেলের দাম কেন আকাশ ছুঁচ্ছে না

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৬, ১০: ৫৯
পাঁচ মাসের যুদ্ধ ও হরমুজ বন্ধ থাকার পরও তেলের দাম কেন আকাশ ছুঁচ্ছে না
ছবি: এএফপি

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়াল যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তখন বিশ্লেষকেরা পূর্বাভাস দিয়েছিলেন—অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার, এমনকি ২০০ ডলার পর্যন্তও পৌঁছাতে পারে। কারণ, বিশ্বে সরবরাহ হওয়া মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, তা হঠাৎ করে বিশ্ববাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল।

কিন্তু বাস্তবে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম সর্বোচ্চ প্রায় ১২৬ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল, যা ২০০৮ সালের সর্বকালের সর্বোচ্চ ১৪৭ ডলারের চেয়ে অনেক কম। আর ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরু হওয়া থেকে ১১ জুন পর্যন্ত, যেদিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর হামলা বন্ধের ঘোষণা দেন, সেই সময়ে ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ১০১ ডলার। এরপর জুলাইয়ের শুরুতে দাম সাময়িকভাবে যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায়ে নেমে প্রায় ৭০ ডলারে পৌঁছে যায়।

নিচে তুলে ধরা হলো কেন তেলের দাম প্রত্যাশামতো অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়নি। অন্তত এখন পর্যন্ত।

১. চীনের অপ্রত্যাশিত ভূমিকা

সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ তেল আমদানিকারক দেশ চীন। জুন নাগাদ দেশটি প্রায় এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে অপরিশোধিত তেল আমদানি কমিয়ে আনে। চীন জ্বালানি রপ্তানি কমিয়ে দেয়, জনগণ ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে বৈদ্যুতিক ট্যাক্সি ব্যবহার শুরু করে এবং দেশটির পেট্রোকেমিক্যাল খাতও তেলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে।

২. যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন বৃদ্ধি

বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র অপরিশোধিত তেল উৎপাদন আরও বাড়ায়। এপ্রিল নাগাদ দেশটির উৎপাদন দৈনিক রেকর্ড ১ কোটি ৩৯ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছে যায়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)-এর সমন্বয়ে মার্চ মাসে রেকর্ড ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র তার স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (এসপিআর) থেকে তেল সরবরাহ করে, যা সরবরাহ বিঘ্নের প্রভাব অনেকটা সামাল দিতে সাহায্য করে।

৩. ট্রাম্পের বার্তায় এলোমেলো বাজারের হিসাব

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার শান্তি চুক্তি এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে আবারও তেল পরিবহন শুরু হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলে তেলের দাম আরও বাড়বে বলে বাজি ধরা বিনিয়োগকারীদের হিসাব এলোমেলো করে দেন। হঠাৎ বাজার ঘুরে যাওয়ার ঝুঁকির কারণে অনেক ব্যবসায়ী বড় ধরনের ঊর্ধ্বমুখী অবস্থান নিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েন, ফলে তেলবাজারের লেনদেনের তারল্যও কমে যায়।

অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজের ইলিয়া বুচুয়েভ বলেন, ‘এখন সবাই মনে করছে তেলের দাম বাড়বে, কিন্তু কেউই বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করছে না।’ আইস এক্সচেঞ্জের শুক্রবার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শুরুতে ব্রেন্ট ফিউচারে এ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ঊর্ধ্বমুখী অবস্থানে নেমে আসার পর, ১৪ জুলাই শেষ হওয়া সপ্তাহে বিভিন্ন তহবিল ছয় মাসের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিমাণে নতুন বিনিয়োগ যোগ করে।

তবে সোমবারের দামের হিসাবে এ অবস্থানের মূল্য ছিল প্রায় ১৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যা মার্চের শেষ দিকে ছয় বছরের সর্বোচ্চ অবস্থানের তুলনায় এখনও ৫০ শতাংশেরও বেশি কম। স্যাক্সো ব্যাংকের কমোডিটি কৌশল বিভাগের প্রধান ওলে হ্যানসেন বলেন, বাজার এখন ‘শিরোনাম ক্লান্তি (headline fatigue) ’–এ ভুগছে। ফলে নতুন কোনো ঘোষণা এলেও তার প্রভাব আগের মতো দামের ওপর পড়ছে না।

৪. হরমুজ প্রণালিতে পরিবহন আংশিক পুনরুদ্ধার

উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর থেকে তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়। এর ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব অনেকটাই পুষিয়ে যায়। জুন মাসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন সাময়িকভাবে আবার শুরু হওয়ায় অপরিশোধিত তেলের প্রাপ্যতা নিয়ে উদ্বেগ কমে আসে। তবে জুলাইয়ে যুদ্ধ পুনরায় তীব্র হওয়ার পর সেই পরিবহন আবারও কমে যায়।

৫. তাৎক্ষণিক সরবরাহের জন্য পর্যাপ্ত বাস্তব তেলের মজুত

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে সরাসরি সরবরাহযোগ্য বাস্তব তেলের (ফিজিক্যাল অয়েল) পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। ফলে সংঘাতের সর্বশেষ উত্তেজনা সত্ত্বেও তেলের দামে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।

ইউরোপে অপরিশোধিত তেলের মূল্য ব্যবধান (ক্রুড অয়েল ডিফারেনশিয়াল), যেমন নর্থ সি ফোর্টি, যা বৈশ্বিক ডেটেড ব্রেন্টের মূল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, এপ্রিল মাসে রেকর্ড প্রিমিয়ামে পৌঁছানোর পর এখন তা ডিসকাউন্টে নেমে এসেছে। অভিজ্ঞ তেল ব্যবসায়ী আদি ইমসিরোভিচ বলেন, ‘এই মুহূর্তে বাজারে তাৎক্ষণিক সরবরাহের জন্য প্রচুর অপরিশোধিত তেল রয়েছে। তবে এই পরিস্থিতি হয়তো বেশিদিন থাকবে না!’

তথ্যসূত্র: রয়টার্স

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত