Ajker Patrika

এডিপি বাস্তবায়ন: নেপাল-ভুটানের চেয়েও পিছিয়ে বাংলাদেশ

মাহফুজুল ইসলাম, ঢাকা
এডিপি বাস্তবায়ন: নেপাল-ভুটানের চেয়েও 
পিছিয়ে বাংলাদেশ
গ্রাফিক্স: আজকের পত্রিকা

চলতি অর্থবছরের জন্য রেকর্ড ৩ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ঘোষণা করেছে সরকার। জাতীয় বাজেটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উন্নয়ন বাজেটের আকার, কিন্তু বাড়ছে না বাস্তবায়নের সক্ষমতা। বরং এডিপি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ এখন শুধু ভারত বা ভিয়েতনামের তুলনায় নয়, নেপাল ও ভুটানের মতো ছোট অর্থনীতির দেশগুলোর চেয়েও পিছিয়ে। অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়ন বাজেটের আকার যত বড়ই হোক, সময়মতো ও মানসম্মত বাস্তবায়ন নিশ্চিত না হলে এর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে সাধারণ মানুষের।

পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকার এডিপি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বেড়ে হয়েছে ৩ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে জাতীয় বাজেটও ৪ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায়।

তবে বাস্তবায়নের চিত্র উল্টো। আইএমইডির তথ্য বলছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৯২ শতাংশ। এরপর তা কমে ২০২১-২২ সালে ৮৬ শতাংশ, ২০২২-২৩ সালে ৭৮ দশমিক ৭০ শতাংশ, ২০২৩-২৪ সালে ৭৪ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ সালে ৫৫ দশমিক ৪১ শতাংশে নেমে আসে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এডিপির বিপরীতে প্রথম ১১ মাসে বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৪২ দশমিক ২১ শতাংশ, যা দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন।

সাবেক পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, শুরুতে প্রায় ১ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকার তুলনামূলক ছোট উন্নয়ন বাজেটের চিন্তা ছিল, যাতে বাস্তবায়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া যায়। তবে এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ ও প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখার প্রয়োজন বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত বড় এডিপিই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের তুলনায় এশিয়ার অনেক দেশ এডিপি বাস্তবায়নে অনেক এগিয়ে। পিআরএস লেজিসলেটিভ রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, ভারত উন্নয়ন বাজেটের ৯৫ থেকে ৯৮ শতাংশ বাস্তবায়ন করে। নেসডিসি ইকোনমিক রিপোর্ট বলছে, ভিয়েতনাম ২০২৬ সালে ১.০৮ কোয়াড্রিলিয়ন ডংয়ের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট বাজেটের ৯৫ শতাংশের বেশি বাস্তবায়ন করেছে। ব্যাংকক পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, থাইল্যান্ড উন্নয়ন বাজেটের প্রায় ৭৫ শতাংশ এবং কম্বোডিয়া ৮৫-৯০ শতাংশ বাস্তবায়ন করে।

এমনকি তুলনামূলক ছোট অর্থনীতির দেশ ভুটান ও নেপালও এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে। ভিয়েতনাম ইকোনমিক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ভুটান মোট বাজেটের ৫১ শতাংশ উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ দিয়ে ৮০ শতাংশের বেশি বাস্তবায়ন করে। দীর্ঘদিন দুর্বল পারফরম্যান্সের পরও নেপাল গত অর্থবছরে উন্নয়ন বাজেটের ৪৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে, যা বাংলাদেশের সদ্য সমাপ্ত ১১ মাসের বাস্তবায়ন হারকেও ছাড়িয়ে গেছে।

জানতে চাইলে সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, নতুন এডিপি বাস্তবায়ন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে উদ্ভাবনী উদ্যোগ প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জমি অধিগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা, প্রকল্পের নকশা পরিবর্তন, দরপত্রে বিলম্ব, প্রকল্প পরিচালকদের ঘন ঘন বদলি, প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতি, বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড়ে ধীরগতি এবং অর্থবছরের শেষ দিকে তড়িঘড়ি করে ব্যয়ের প্রবণতা বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজস্ব ঘাটতির কারণে উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থছাড়ের বিলম্ব।

অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করে বলছেন, উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়িত না হলে তার প্রভাব শুধু সরকারি হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। নতুন সড়ক, সেতু, হাসপাতাল ও বিদ্যুৎ প্রকল্পের সুবিধা পেতে দেরি হবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হবে, বেসরকারি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং নির্মাণ ব্যয় ও মুদ্রাস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে। সবচেয়ে বড় বিষয়, জনগণের করের অর্থের কার্যকারিতা কমে যাবে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, একসঙ্গে অসংখ্য প্রকল্প নেওয়ার পরিবর্তে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প দ্রুত শেষ করলে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উন্নয়নের সুফলও দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছাবে।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান সতর্ক করে বলেন, বাস্তবায়ন সক্ষমতা না বাড়িয়ে শুধু বরাদ্দ বাড়ালে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত