Ajker Patrika

দুই মণ ধানের দামে এক শ্রমিক

মাহিদুল ইসলাম, মৌলভীবাজারবিশ্বজিত রায়, সুনামগঞ্জ
দুই মণ ধানের দামে এক শ্রমিক
টানা বৃষ্টি ও ঢলে যে পানি জমেছে, তা এখনো কমেনি। তলিয়ে যাওয়া পাকা ধান কেটে তোলার চেষ্টা করছেন কৃষক। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে জামালগঞ্জের হালি হাওরের মামুদপুর এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

সুনামগঞ্জের করচার হাওর এলাকায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ধানের মুইট (আঁটি) নৌকা থেকে তীরে তুলছিলেন ষাটোর্ধ্ব কৃষক নিবারণ দেবনাথ। তিনি বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার পলাশ ইউনিয়নের আদুখালি গ্রামের বাসিন্দা। এবার তিনি বোরো জমি আবাদ করেছেন ২০ খানি (৩০ শতকে এক খানি)। এর মধ্যে ৭ খানি জমি পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়েছে। বাকি ১৩ খানির মধ্যে ৭ খানি কেটেছেন। কাটার বাকি আছে আরও ৬ খানি।

নিবারণ দেবনাথ অস্বস্তি প্রকাশ করে বলেন, ‘কামলার (শ্রমিক) রোজ এক থেকে দেড় হাজার টাকা। ধানের (মণ) দাম মাত্র ৭০০ টাকা। দুই মণ ধানের দামে কামলা পাওয়া যায় একজন। এর মধ্যে ধান তোলার নৌকাভাড়া প্রতিদিন আরও দেড় হাজার টাকা। এইখান থাইক্যা ধানের মুইট (আঁটি) বাড়ি নেওয়া পর্যন্ত গাড়ির লোকজনে নেয় ষোলো আনা ধানের এক আনা। ধান ভাঙাইয়া আরেক ভাগ মাড়াই মেশিনের লোকে নিয়া যায়। সবকিছু মিলাইয়া ঋণে ঋণ টানা অবস্থা আমরার।’

ধান তোলার ফাঁকে নিবারণ দেবনাথের কথায় সায় দিয়ে তাঁর ছেলে রানা দেবনাথ বলেন, ‘সবার অবস্থাই খারাপ। গোলায় তোলা পর্যন্ত খরচের হিসাব করলে ধান কাটা না কাটা সমান। মনটা মানে না, তাই পানিতে তলাইয়া যেটুকু আছে, এইডাই কাটতাছি।’

কৃষক ও হাওর-সংশ্লিষ্টদের দাবি, অতিবৃষ্টিতে ডুবে অন্তত ৪০ শতাংশ ধান আগেভাগেই নষ্ট হয়েছে। বাকি ৬০ ভাগের প্রায় ২০ ভাগ শুকাতে না পারায় স্তূপে থেকে অঙ্কুর গজিয়েছে এবং ৪০ শতাংশ পাকা ধান শ্রমিক দিয়ে বেশি টাকায় কাটতে বাধ্য হচ্ছেন বোরোচাষিরা।

করচার হাওরে ডুবে যাওয়া ধান কাটার পর নৌকায় এনে শুকনো জায়গায় রাখছিলেন কৃষক মো. ফজলু মিয়া। ফতেপুর ইউনিয়নের রাধানগর গ্রামের ওই কৃষক বলেন, ‘আমার পঞ্চাশ মণ ধান গুমা পইড়া নষ্ট হইছে। এইডি খাওয়া কিংবা বেচার উপযোগী রইছে না। এখন হাওরের মাঝে থাকা ডুইব্যা যাওয়া ধান নিজেই কাইট্যা আনতাছি। খানির (খাওয়ার) লাইগ্যা যতটুকুই পাওয়া যায়।’

জামালগঞ্জের হালি হাওরে প্রায় ৪০ কিয়ার জমিতে বোরো আবাদ করেছেন আছানপুর গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম। ডুবে যাওয়ায় কিছুটা ক্ষতি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ধান কাটতে শ্রমিক প্রতি দৈনিক ১ হাজার ২০০ টাকা। ধানমাড়াইয়ের পর ট্রলি দিয়া খলায় নিতে (দূরত্ব বোঝে) প্রতি বস্তা ৫০ থেকে ১০০ টাকা, খলা থেকে ঘরে নিতে ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত শ্রমিকদের দেওয়া লাগে। শুধু খরচ আর খরচ। জমি করতে গিয়ে অনেকে ঋণগ্রস্ত হবে।

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় কার্ডধারী কৃষক ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৭ জন। তাঁদের মধ্যে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক ২ লাখ ২৩ হাজার ৮০৭ জন। এ বছর ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। হাওরে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৭৫ দশমিক ১৬০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। এ পর্যন্ত ১ লাখ ৬৭ হাজার ৯৯১ হেক্টর জমির ধান কেটেছেন কৃষক।

জলাবদ্ধতায় কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে ২০ হাজার ১৬০ হেক্টর জমির ক্ষতি হয়েছে। টাকার অঙ্কে ধানের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা।

সুনামগঞ্জ জেলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি ইয়াকুব বখত বাহলুল বলেন, বোরো মৌসুম শুরুর প্রথম পর্যায়ে জলাবদ্ধতায় ফলনের ৪০ ভাগের বেশি ক্ষতি হয়েছে। বেশি টাকায় শ্রমিক নিয়ে ধান কাটা এবং আনা-নেওয়া ও মাড়াই শেষে ঘরে তোলা পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে বাড়তি খরচ। বিক্রি করতে গিয়েও ধানের দাম নেই। সরকার মণপ্রতি ১ হাজার ৪৪০ টাকা নির্ধারণ করলেও সিন্ডিকেটের কারণে কৃষক সেই মূল্যটা পাচ্ছে না। সরকার নজর না দিলে ঋণের চাপে অনেক কৃষক এলাকা ছাড়তে বাধ্য হবেন।

মৌলভীবাজারের হাওরেও শ্রমিক সংকটে ধান কাটতে পারছেন না কৃষকেরা। তাঁরা জানান, হাওরের যেসব এলাকা থেকে মেশিন দিয়ে ধান কাটা হতো, এসব এলাকায় এখন ১ বিঘা ধান কাটতে শুধু শ্রমিক মজুরি ৫ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। শ্রমিকের মজুরি এত বেশি হওয়ার পরেও কৃষকেরা কোনোভাবেই শ্রমিক পাচ্ছেন না। হাওরে শ্রমিকের তীব্র সংকট রয়েছে। যেসব কৃষক প্রতি বিঘায় ৫ হাজার টাকা মজুরি দিয়ে ধান কাটছেন, তাঁরা এই ধান বিক্রি করার সময় এই দাম পাচ্ছেন না।

কাউয়াদিঘী হাওরের কৃষক তনু মিয়া, কয়ছর মিয়া বলেন, হাওরের বেশির ভাগ ধান কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে কাটা হয়। যেখানে মেশিনে ধান কাটে এসব এলাকায় পানি বেশি থাকায় শ্রমিকেরা ধান কাটতে অনিচ্ছুক। আর যাঁরা ধান কেটে পাড়ে নিয়ে এসেছেন, সেসব কৃষক মাড়াই করতে পারছেন না শ্রমিক সংকটে। হাওরে এক বিঘা ধান কাটতে ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার হাকালুকি, কাউয়াদিঘী, হাইল হাওর, কেওলার হাওরসহ অনেক এলাকায় কিছু জমির ধান কাটা হচ্ছে না।

এদিকে প্রান্তিক কৃষকেরা আক্ষেপ নিয়ে বলেন, একজন কৃষক সরকারের কাছে ৭৫ মণ ধান বিক্রি করার নিয়ম রয়েছে। ৩৬ টাকা কেজি দরে ১ হাজার ৪৪০ টাকা মণ সরকারি দাম। তবে সরকারি গুদামে ধান বিক্রির কঠিন নিয়মের কারণে কৃষকের পক্ষে ধান বিক্রি করা প্রায় অসম্ভব। ফলে কৃষকেরা বাধ্য হয়ে পানির দামে ধান বিক্রি করছেন।

কৃষক ছনওয়ার মিয়া বলেন, প্রায় ১০ বিঘা জমি চাষ করেছিলাম। পানিতে সব তলিয়ে গেছে। ৪ হাজার ৫০০ টাকা শ্রমিক মজুরি দিয়ে দেড় বিঘা জমির ধান কেটেছি; যাতে অন্তত মাস দেড় মাস পরিবারের খাদ্যের সংকট না হয়। বাকি সব ধানের আশা ছেড়ে দিয়েছি। এত টাকা খরচ করে শূন্য হাতে ফিরলাম হাওর থেকে এই বছর। তিনি আরও বলেন, টাকা দিয়ে ধান কেটে কী লাভ। এই ধান বিক্রি করতে হয় ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা মণ।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, জেলায় প্রায় ৫ হাজার ৫০০ হেক্টর জমির ধান ডুবে ছিল। এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ২০০ হেক্টর জমির ধান পচে নষ্ট হয়েছে। এতে অন্তত ২০ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। শ্রমিক সংকটের কারণে ধন কাটতে পারেননি অনেক কৃষক। শ্রমিক সংকট না হলে আরও কিছু ধান কাটতে পারতেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী: শুভেন্দু প্রায় নিশ্চিত, পেতে পারেন দুই ডেপুটি

মির্জা ফখরুল-ফাতেমাসহ আরও যাঁরা পাচ্ছেন খালেদা জিয়া স্মৃতি স্বর্ণপদক

এসিআই মোটরসে চাকরি, থাকছে সপ্তাহে ২ দিন ছুটিসহ নানা সুবিধা

প্রাণ গ্রুপে ৬০ পদে নিয়োগ, ফ্রেশাররাও আবেদন করতে পারবেন

আনসার কর্মকর্তার চোখ থেঁতলে দিলেন হকারেরা, আহত আরও ৫

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত