Ajker Patrika

স্বামীকে হত্যার পর কয়েক টুকরা, স্ত্রী ও পুলিশের বক্তব্যে খুনের বর্ণনা

শরীয়তপুর প্রতিনিধি
স্বামীকে হত্যার পর কয়েক টুকরা, স্ত্রী ও পুলিশের বক্তব্যে খুনের বর্ণনা
হত্যাকাণ্ডের শিকার জিয়া সরদার। ছবি: সংগৃহীত

শরীয়তপুর সদর উপজেলার চন্দ্রপুর এলাকায় স্বামীকে হত্যা করে লাশ টুকরা করে বিভিন্ন জায়গায় ফেলে আসেন এক নারী। ক্যামেরার সামনে সেই হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়েছেন তিনি নিজেই। ওই নারীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার (১৫ মে) রাত ১০টার দিকে শরীয়তপুর সদর উপজেলার আটং বৃক্ষতলা সড়কের পাশ থেকে মাথাসহ মরদেহের একাংশ উদ্ধার করে পুলিশ।

হত্যাকাণ্ডের শিকার শরীয়তপুর সদর উপজেলার মাহমুদপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক মেম্বার রাজ্জাক সরদারের ছেলে জিয়া সরদার (৪০)। আর অভিযুক্ত আসমা বেগম পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার জুপিয়া গ্রামের সোলেমান শেখের মেয়ে। গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়া উপজেলার আসাদ তালুকদার নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর প্রথম বিয়ে হয়। সেই ঘরে এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।

জিয়া সরদার দীর্ঘদিন মালয়েশিয়ায় ছিলেন। ২০১৯ সালের দিকে তিনি আসমাকে গোপনে বিয়ে করেন। আসমা তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী। বিয়ের পর বিভিন্ন জায়গায় ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। এর মধ্যে জিয়া সরদার প্রথম স্ত্রীকে ডিভোর্স দেন। সর্বশেষ আসমা বেগমকে নিয়ে চন্দ্রপুর বাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করে আসছিলেন।

যদিও পুলিশ বলছে, ভুক্তভোগীর নাম জয়নাল আবেদিন।

ঘটনার বর্ণনায় পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ আলম সাংবাদিকদের বলেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দাম্পত্য কলহ ছিল। দুইজনেরই দ্বিতীয় বিয়ে। আসমা বেগমের গোপালগঞ্জ টুঙ্গিপাড়ায় এক ছেলে ১৭-১৮ বছরের, মেয়ে আছে, বয়স ১৫ বছর। আর তাঁর স্বামী (দ্বিতীয়) জয়নাল আবেদিনের বাড়ি শরীয়তপুরের বিনোদপুরে। তিনি মালয়েশিয়ায় ছিলেন।

ওসি জানান, আসমা বেগমের সঙ্গে জয়নালের সম্পর্ক হয় মোবাইল ফোনে। একপর্যায়ে স্বামী ও সন্তান ত্যাগ করে চলে আসেন আসমা। ২০১৯ সালে জয়নাল দেশে এসে শরীয়তপুর শহরে আসমাকে নিয়ে বিভিন্ন বাসায় থাকেন। গত বছর কোরবানি ঈদের আগে আবার দেশে এসে আসমাকে নিয়ে পালং থানাধীন সন্তোষপুর পুলিশ ফাঁড়ির অধীন চন্দ্রপুর বাজারে আবু বকরের বাড়িতে ভাড়া থাকেন।

আসমার বরাতে হত্যাকাণ্ডের বর্ণনায় ওসি বলেন, গত মঙ্গলবার (১২ মে) দিবাগত রাত ২টার দিকে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। অন্য এক মেয়ের সঙ্গে জয়নালের কথা বলা নিয়ে এই বিরোধ হয়। একপর্যায়ে ঘরে থাকা একটি রড দিয়ে জয়নালকে বাড়ি দেন আসমা। জয়নাল পড়ে গিয়ে অচেতন হয়ে গেলে আরও কয়েকটা বাড়ি দেন। মারা গেছে বুঝতে পারলে সারারাত ঘরেই বসে থাকেন। দিনের বেলায় কী করবেন বুঝতে না পেরে চাকু দিয়ে হাত ও পা কেটে আলাদা করেন। এর পরের দিন পেট কেটে নাড়িভুড়ি একটি ড্রামে ভরেন। শুধু মাথা অক্ষত রাখেন।

লাশ গোপনের চেষ্টা নিয়ে ওসি বলেন, মরদেহ কাটা ও দুইদিন অতিবাহিত হওয়ায় গন্ধ বের হতে থাকে। গত বৃহস্পতিবার খণ্ডিত হাত ও পা বস্তায় ভরে অটোরিকশা যোগে নড়িয়া নদীর পাড়ে রেখে আসেন। এরপর ড্রাম ও বস্তায় প্লাস্টিকের দুটি ব্যাগে বাকি অংশ ভরে একটি রিকশা যোগে বের হন। পালংয়ের এক স্থানে এক চিকিৎসকের বাসায় ড্রাম রাখেন। এরপর প্লাস্টিকের বস্তা দুটি একটি খোলা জায়গায় মাছের ঘেরের পাশে রেখে আসেন।

ওসি শাহ আলম বলেন, এক চিকিৎসকের বাসায় ড্রাম নিয়ে গেলে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, এর মধ্যে কী আছে। তিনি বলেন, মাছ। কিন্তু ড্রামের মুখ খোলার পর দুর্গন্ধ নাকে লাগলে পুলিশকে জানানো হয়। ওসি শাহ আলম সঙ্গে সঙ্গে ওই বাড়িতে পুলিশ পাঠান। এরপর তিনি নিজেই যান। আসমাকে সেখানে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি হত্যার কথা স্বীকার করেন। পরবর্তীতে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জয়নালের দেহের খণ্ডিত অংশগুলো উদ্ধার করা হয়। বর্তমানে আসমা, হত্যাকাণ্ড ব্যবহৃত রড, ছুরি ও ড্রাম বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে রয়েছে।

ওসি বলেন, ‘আসমা প্রাথমিকভাবে সব স্বীকার করেছেন। বিজ্ঞাসাবাদে তাঁর কথার মধ্যে কোনো অসঙ্গতি পাওয়া যায়নি। জয়নালের তাঁর বাবা-মার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো নয়। তাঁর আগের সন্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক ভালো না থাকায় জয়নালের বাবাকে খবর দেওয়া হয়েছে। পরিবারের লোকজন এলে, এজাহার দিলে আমরা মামলা নেব। আইনগত ব্যবস্থা আমাদের প্রক্রিয়াধীন।’

এদিকে ঘটনার বর্ণনায় আসমা বেগম ক্যামেরার সামনে বলেন, ‘দুইজনে হাতাহাতি করতে করতে দরজার পাশে একটা রড ছিল সে রড দিয়া বাড়ি দিছি। আমি বুঝতে পারি নাই যে এত দ্রুত লাইগা গেল।’

কার সহযোগিতায় মরদেহের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন জায়গায় ফেলেছেন? কী দিয়ে কেটেছেন? এ প্রশ্নে আসমা বলেন, ‘একাই, চাকু দিয়া। এখানে আর নরিয়া নদীর পাড়ে ফেলছি।’

তিনি বলেন, ‘স্বামীর নাম জিয়া সরদার। আমরা চন্দ্রপুরে থাকতাম। আর আমার বাড়ি পিরোজপুরে। মোবাইলে যোগাযোগ, এরপর বিয়ে করছি। স্বামী বিদেশে থাকতো। গত কোরবানির ঈদের পরে দেশে আসছে। এর আগে কোনো খুন-খারাবি করি নাই। আমি একটা পিপড়ারেও মারি নাই। আর এখন আমি কেমনে কী করলাম নিজেই জানি না! গত মঙ্গলবার রাত্রে...বুধবার মরে গেছে। আমি এখন পর্যন্ত কারো সাথে ঝগড়াও করি নাই। কেউরে মারিও নাই। নিজে না খাইয়েও মানুষকে খাওয়াইছি। আমার ভাগ্যে আছে তাই হয়ে গেছে। শয়তানের কাজ। আমার ভাগ্যে আছে তাই হয়ে গেছে!’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত