Ajker Patrika

‘হঠাৎ বিকট শব্দে ঘুম ভাঙে, চারদিকে শুনি শুধু চিৎকার’

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী
‘হঠাৎ বিকট শব্দে ঘুম ভাঙে, চারদিকে শুনি শুধু চিৎকার’
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন একজন আহত ব্যক্তি। ছবি: আজকের পত্রিকা

গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন বাসের যাত্রীরা। হঠাৎ বিকট শব্দে ঘুম ভাঙে তাঁদের। চোখ খুলতেই দেখেন, বাসের সঙ্গে ট্রাকের সংঘর্ষ হয়েছে। চারদিকে মানুষের চিৎকার, কান্না আর ছোটাছুটি। কেউ রক্তাক্ত, কারও হাত-পা ভাঙা। কেউ আবার নিথর পড়ে আছেন অন্য যাত্রীর শরীরের ওপর। দুর্ঘটনার প্রায় পাঁচ মিনিট পর উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসেন স্থানীয় লোকজন।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোররাতে নাটোরের বড়াইগ্রামে বালুবোঝাই ট্রাকের সঙ্গে আরপি পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হন। আহত হন অন্তত ৩০ জন। আহতদের মধ্যে ১৯ জনকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁদের সাতজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুর্ঘটনার সময় তাঁরা ঘুমিয়ে ছিলেন। যাত্রীদের অভিযোগ, অতিরিক্ত যাত্রী তোলা ও বেপরোয়া গতিতে বাস চালানোর কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

হাসপাতালের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে ভাঙা পা নিয়ে চিকিৎসাধীন আছেন রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মাটিকাটা ভাটা গ্রামের সিয়াম আলী (১৮)। তিনি পটুয়াখালী থেকে ওই বাসে রাজশাহী আসছিলেন। সিয়াম জানান, বাসে আসনসংখ্যার চেয়ে বেশি যাত্রী তোলা হয়েছিল। কুষ্টিয়া পর্যন্ত বাসটি বেপরোয়া গতিতে চলেছে। রাত দুইটার দিকে খাবারের বিরতির পর বাসে উঠে ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। পরে বিকট শব্দে তাঁর ঘুম ভাঙে।

সিয়াম বলেন, ‘ঘুম ভাঙতেই দেখি ট্রাকের সঙ্গে বাসের সংঘর্ষ। দেখি, ডান পা ফ্র্যাকচার হয়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে অনেকজন মারা গেছে। হোটেলে বিরতির পরও বাসটি বেপরোয়া গতিতে চলছিল। যাত্রীরা কয়েকবার চালককে আস্তে চালাতে বলেছিলেন। কয়েকবার গালিও দিয়েছিলেন। তবু জোরেই চলছিল।’

তিনি আরও জানান, এক সপ্তাহ আগে একই বাসে পটুয়াখালী থেকে রাজশাহী এসেছিলেন। সেদিনও বাসটি বেপরোয়া গতিতে চলছিল। কয়েকজন যাত্রী সুপারভাইজারকে মারতে উদ্যত হলে বাসের গতি কিছুটা কমানো হয়েছিল।

নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার পিকরুল সেন্টার এলাকার বাসিন্দা রুবেল আলী (২৪) পেশায় রডমিস্ত্রি। ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে ওই বাসে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। বর্তমানে রামেক হাসপাতালের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রুবেল বলেন, ‘এ দুর্ঘটনার জন্য বাসের চালকই দায়ী। নিয়ম মেনে গাড়ি চালালে দুর্ঘটনা হতো না। বাস রং সাইডে গিয়ে ট্রাককে মেরে দিয়েছে।’

দুর্ঘটনার পরের পরিস্থিতি বর্ণনা করে রুবেল বলেন, ‘যাত্রীরা সবাই ঘুমাচ্ছিলেন। ঘুম ভেঙে দেখি, মানুষজন ছোটাছুটি করার চেষ্টা করছেন। একজনের গায়ের ওপর আরেকজন পড়ে আছেন। সবাই চিৎকার করছেন। আমার পা ভেঙেছে, দাঁতও ভেঙেছে। এসব দেখে অজ্ঞান হয়ে যাই। পরে ফায়ার সার্ভিস আমাকে উদ্ধার করে।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার ফুটানিবাজারের বাসিন্দা তামিম আলী (২০) বর্তমানে ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি আছেন। তাঁর মামা রুবেল উদ্দিন জানান, তামিম নির্মাণশ্রমিক। তাঁর কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন, বাসটি ভুল পাশ দিয়ে গিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবোঝাই ট্রাককে ধাক্কা দেয়।

দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন বাসের হেলপার নয়ন আলীও (২৪)। তাঁর বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের পিটিআই এলাকায়। নয়নের দুলাভাই মো. ইসলাম জানান, নয়ন আগে অটোরিকশা চালাতেন। সোমবারই প্রথম বাসের হেলপার হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। প্রথম দিনেই দুর্ঘটনার শিকার হন।

বাসের আরেক যাত্রী তৌহিদুল ইসলাম (৩০) চিকিৎসাধীন আছেন হাসপাতালের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে। তাঁর বাড়ি যশোরের কেশবপুরে। ঝিনাইদহ থেকে বাসে উঠে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যাচ্ছিলেন তিনি। তৌহিদুল বলেন, ‘একটা গাড়িকে ওভারটেক করার সময় বাসটা ডান দিকে ঢুকে যায়। তখন সামনে থেকে আসা ট্রাকের সঙ্গে দুর্ঘটনা ঘটে। ঘুম ভাঙতেই দেখি, একজন আরেকজনের ওপর পড়ে আছেন।’

ঝিনাইদহ থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছিলেন চিকিৎসক মুশফিকুর রহমান। তাঁর দুলাভাই চিকিৎসক আনোয়ার মাহমুদ বলেন, ‘নাটোর রোডে গাড়ি ঢুকলেই গতি বেড়ে যায়। ওই এলাকায় সব সময় হাইওয়ে পুলিশের নজরদারি প্রয়োজন। তা না হলে দুর্ঘটনা থামবে না।’

রাজশাহীর গোদাগাড়ী সদরের মেডিকেল মোড়ের বাসিন্দা মো. মজুন (৪০) হাসপাতালের অজ্ঞাত রোগীদের ওয়ার্ডের সামনে একটি বিছানায় চিকিৎসাধীন। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার সময় তিনিও ঘুমাচ্ছিলেন। কীভাবে দুর্ঘটনা ঘটেছে, তা জানেন না। তবে দুর্ঘটনার পর বাসটি ভুল পাশে ছিল। তাঁর ধারণা, চালক ঘুমিয়ে পড়ায় বাসটি বিপরীত লেনে চলে গিয়েছিল।

এদিকে দুর্ঘটনাকবলিত বাসের যাত্রী চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের বাসিন্দা মো. ওয়াহিদের কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না স্বজনেরা। তাঁকে খুঁজতে রামেক হাসপাতালে এসেছিলেন তাঁর খালু কাজেম আলী। তবে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া আহতদের মধ্যে ওয়াহিদকে খুঁজে পাননি তিনি।

কাজেম আলী বলেন, ‘আমরা ওয়াহিদের কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। সে জীবিত না মৃত, সেটাও জানি না।’

দুর্ঘটনায় বাসটির চালক সোহেল রানাও নিহত হয়েছেন। তাঁর বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ফরাদপুর গ্রামে। এ ছাড়া দুর্ঘটনায় আরও ১৩ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে নাটোর জেলা প্রশাসন। তবে দুর্ঘটনায় মোট কতজন আহত হয়েছেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। যাত্রীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৪৫ আসনের বাসটিতে অতিরিক্ত আরও প্রায় ১৫ জন যাত্রী ছিলেন।

রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অন্য আহত ব্যক্তিরা হলেন রাজশাহীর কাজলা ধরমপুরের ফজলুল হক (৫০), বরিশালের বাবুগঞ্জের শহিদুল ইসলাম (৩৫), চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের শামিম হোসেন (১৮), সদরের ববি (৩০), নাটোরের বাগাতিপাড়ার জুলফিকার আলী (৫০), নওগাঁর সাপাহারের বন্দিয়াঘাটের আব্দুর নূর (৪০), নিয়ামতপুরের চিরঞ্জিত (৩০) ও ডালিম (৩০), ঝিনাইদহ সদরের তাওহীদ (৩০), ঝিনাইদহের জুয়েল কিবরিয়া (৩৮), মাদারীপুর সদরের ইমা (২১) ও নারগিস (৫০)।

রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম আহমেদ বলেন, দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিরা হাসপাতালে আসার পর জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকেরা তাঁদের পরীক্ষা করেছেন। তাঁদের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। তবে যাঁদের মাথায় আঘাত রয়েছে, তাঁদের বিষয়ে ৪৮ ঘণ্টা না পেরোনো পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। সকালে হাসপাতালের পরিচালক প্রত্যেক রোগীকে দেখে এসেছেন। তাঁদের সব ধরনের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত