Ajker Patrika

ইউরোপেও যুদ্ধ পৌঁছে দিতে পারে ইরান

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ইউরোপেও যুদ্ধ পৌঁছে দিতে পারে ইরান
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইরান প্রয়োজনে যুদ্ধ ইউরোপেও পৌঁছে দিতে পারে। ছবি: নিউজউইকের সৌজন্যে

ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আরেক দফা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে হুমকি দিচ্ছে দেশটি। ধারণা করা হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চলমান সংঘাত আবার শুরু করা থেকে বিরত রাখতেই ইরান এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, প্রয়োজনে ইরান যুদ্ধ ইউরোপেও পৌঁছে দিতে পারে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন–এর খবরে বলা হয়েছে, গত এক মাসে ইরানের সামরিক কমান্ডাররা একের পর এক প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়েছেন। এসব বক্তব্যে তাঁরা দাবি করেছেন, ইরান বিপুল পরিমাণ নতুন অস্ত্র মজুত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুদ্ধ আবার শুরু করে, তাহলে এসব অস্ত্র ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হতে পারে।

ইরানি কর্মকর্তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে তাঁদের হামলার লক্ষ্যবস্তুর পরিধি আরও বাড়ানো হবে। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে যাওয়া ইন্টারনেটের কেবল কেটে দেওয়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের তথ্যকেন্দ্রে হামলা এবং আঞ্চলিক তেল ও গ্যাস স্থাপনায় আঘাত হানা।

গত মাসের শেষ দিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেন, ‘বিশ্ব অবাক হয়ে যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের হাতে এমন নতুন লক্ষ্যবস্তু রয়েছে, যেগুলোতে এখনো হামলা চালানো হয়নি।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার প্রায় নয় মাস পর সংঘাতটি কার্যত অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। এতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী, তা নিয়ে সবাই অনিশ্চয়তায় রয়েছে। একই সময়ে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক অস্থিরতাও বাড়ছে। দুই পক্ষই নিজেদের বিজয়ী বলে দাবি করছে। তেহরানের বক্তব্য, এত বড় হামলার পরও তারা টিকে আছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন বলছে, ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে ব্যাপক ক্ষতির মুখে ফেলা হয়েছে।

এ দিকে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন নতুন অর্থনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপ পরীক্ষা করে যাচ্ছে। তবে তেহরান দৃঢ়ভাবে এসব চাপ মোকাবিলা করছে এবং নতি স্বীকার করতে অস্বীকার করছে। মোহেব্বি বলেন, ‘যুদ্ধ শেষ হয়নি। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করেছে।’

ইউরোপকেও লক্ষ্যবস্তু করার সম্ভাবনা

গত কয়েক সপ্তাহে হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টারা ইরান নিয়ে বিভিন্ন সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে বৈঠক করেছেন। ট্রাম্প প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি নতুন কোনো পদক্ষেপ নেবেন না। তবে কয়েকজন উপদেষ্টা ব্যক্তিগতভাবে সিএনএনকে বলেছেন, ট্রাম্পের এই ঘোষণা চূড়ান্ত কি না, অথবা ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের আগেই তাঁর সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে কি না, তা তাঁরা জানেন না।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প যদি মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বা পরে আবার সামরিক অভিযান শুরুর নির্দেশ দেন, তাহলে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী নতুন পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এসব পরিকল্পনায় তথাকথিত ‘সব বোমার জননী’ ব্যবহার করার সম্ভাবনাও রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারে থাকা সবচেয়ে বড় অ-পারমাণবিক বোমা হলো জিবিইউ-৪৩ /বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট বোমা, যা ‘মাদার অব অল বোম্বস বা মোয়াব’ (MOAB) নামে পরিচিত। এটি ব্যবহার করা হলে সংঘাতের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। শনিবার ইরানের সেনাবাহিনীর কমান্ডার আলিরেজা শেখ বলেন, ‘এগুলো ইরানের জনগণকে ভয় দেখানোর জন্য তৈরি প্রচারণার হাতিয়ার।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইরানের জনগণই সব বোমার জননী।’

ইরান এমন একটি নতুন ও বেশি আক্রমণাত্মক সামরিক কৌশলের ইঙ্গিত দিয়েছে, যার অর্থ হতে পারে, তারা প্রথমে আক্রান্ত হওয়ার অপেক্ষায় থাকবে না। বরং প্রয়োজনে আগে থেকেই হামলা চালাতে পারে। গত সপ্তাহে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলোতে জানানো হয়, ইরানজুড়ে সামরিক মহড়া চালানো হয়েছে। ওই মহড়ায় একসঙ্গে ৩০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয় বলেও দাবি করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষণায় মনোযোগী ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক ফারজিন নাদিমি বলেন, ‘তেহরান যদি নতুন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইউরোপে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ইংল্যান্ডে অবস্থিত মার্কিন বিমানঘাঁটি কিংবা জার্মানির র‍্যামস্টেইন সামরিক সরবরাহকেন্দ্র থাকতে পারে।’ যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে এটিই দেশটির সবচেয়ে বড় সামরিক স্থাপনা।

নাদিমি বলেন, ‘তবে উত্তেজনা একেবারে চরম পর্যায়ে না পৌঁছালে ইরান সম্ভবত এই বিকল্পটি ব্যবহার করবে না।’

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি মাসের শুরুর দিকে একটি অনির্দিষ্ট নতুন হুমকির পর যুক্তরাজ্যে মোতায়েন থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সব দূরপাল্লার বোমারু বিমানকে আবার যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ঘাঁটিতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই বিমানগুলো সরিয়ে নেওয়ার কয়েক দিন আগে ব্রিটিশ সরকার কয়েকজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের সেই বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করার একটি কথিত ইরানি ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে, যেখানে আগে মার্কিন বোমারু বিমানগুলো অবস্থান করছিল।

লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সম্ভাবনা বাড়াতে ইরান আরও উন্নত ও সমন্বিত ড্রোনবহর ব্যবহার করতে পারে বলে মনে করেন নাদিমি। এসব ড্রোনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্যামেরা এবং তথ্য আদান-প্রদানের বিশেষ ব্যবস্থা থাকতে পারে। এ ধরনের ড্রোন একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে, নিজেদের উড্ডয়নপথ ও গতি পরিবর্তন করতে পারবে এবং শত্রুপক্ষের সংকেত-বিঘ্নিত করার প্রযুক্তি ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতে পারবে।

নাদিমি বলেন, ‘তারা এখনো এসব সক্ষমতা দেখাতে পারেনি। তবে অতীতে এ ধরনের প্রযুক্তি তৈরির বিষয়ে আলোচনা করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইরান তাদের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা বাড়িয়ে সেগুলোতে সুপারসনিক প্রযুক্তি যুক্ত করার চেষ্টা করতে পারে। এতে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো শব্দের গতির চেয়ে বেশি গতিতে চলতে পারবে এবং সেগুলোকে মাঝপথে আটকে দেওয়া আরও কঠিন হতে পারে।’

এ ছাড়া সামরিক যোগাযোগ ও নজরদারির কাজে ব্যবহৃত উপগ্রহের সংকেতেও বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা করতে পারে ইরান।

যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে পুরো অঞ্চল

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির উপপরিচালক আলি ভায়েজ সিএনএনকে বলেন, ইরানের সামরিক কমান্ডাররা নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়াকে প্রায় অনিবার্য বলে মনে করছেন। একই সঙ্গে তাঁরা সম্ভাব্য হামলার খরচ ও পরিণতি তুলে ধরে ওয়াশিংটনকে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করছেন। ভায়েজ বলেন, ‘তেহরান স্পষ্ট করে দিতে চায় যে পরবর্তী দফার যুদ্ধ অনেক বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে। এবার বিধিনিষেধ কম থাকবে এবং পরিণতি আরও প্রাণঘাতী হতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু বিপদ হলো, ইরান যে হুমকিকে যুদ্ধ ঠেকানোর উপায় হিসেবে দেখছে, ওয়াশিংটন সেটিকে উসকানি হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। ফলে যে যুদ্ধ এড়াতে তেহরান চেষ্টা করছে, তাদের এই পদক্ষেপের কারণেই সেই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা আরও বাড়তে পারে।’

ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, তখন তারা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ দেশটির সামরিক কমান্ডার, শীর্ষ কর্মকর্তা ও বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা করে। নিহত বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে স্কুলশিক্ষার্থীরাও ছিল। এর জবাবে ইরান মূলত আরব প্রতিবেশী দেশগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। তেহরানের অভিযোগ, এসব দেশ ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগসাজশ করেছে।

ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। প্রতিবেশী দেশগুলোর তেল রপ্তানির জন্য ব্যবহৃত একমাত্র সামুদ্রিক পথ এটি। এরপর ইরান বিভিন্ন আরব শহরের বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা চালায়। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র দুবাই হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়। কুয়েতের পানিশোধনাগারগুলোতে আঘাত হানা হয়। এ ছাড়া তথ্যকেন্দ্রগুলোতে হামলার ফলে ওই অঞ্চলের কয়েকটি দেশে ব্যাংকিং পরিষেবা ব্যাহত হয়।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরান শুধু আমিরাতকেই লক্ষ্য করে আড়াই হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে। ইসরায়েলসহ অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় আমিরাতের ওপরই বেশি হামলা চালানো হয়েছে। আবুধাবি প্রায় সব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। গত সপ্তাহে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মোহসেন রেজায়ি হুঁশিয়ারি দেন, নতুন করে ইরানের ওপর হামলা হলে দেশটি ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ ও স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে। এসব লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন স্থাপনাও রয়েছে। রেজায়ি বলেন, ‘আবার যুদ্ধ শুরু হলে পুরো অঞ্চলের অসংখ্য সমুদ্রতলদেশীয় কেবল, তথ্যকেন্দ্র, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সংক্রান্ত স্থাপনা এবং অন্যান্য অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত