মেজবাহ আহমেদ। ২০২৪ সালে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার পর থেকে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু চাকরি হচ্ছে না। হতাশ কণ্ঠে বললেন, ‘এখনো চাকরি না হওয়ায় পরিবার ও আশপাশের লোকজন বাঁকা চোখে দেখা শুরু করেছে।’
একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতকোত্তর সিঁথি সাহা যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছেন না। তিনি বললেন, যেসব চাকরির প্রস্তাব পাচ্ছেন, সেগুলোর বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা তাঁর প্রত্যাশার সঙ্গে মিলছে না।
মেজবাহ ও সিঁথির মতো উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবছর ডিগ্রি নিয়ে বের হওয়া বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অনেকে এখন বেকারত্বে ধুঁকছেন। আর যাঁরা চাকরি পাচ্ছেন, তাঁদেরও অনেকে যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী পাচ্ছেন না। দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের উচ্চহারের চিত্র উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিবেদনেও। প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে প্রায় ২৯ শতাংশ বেকার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, ওই বছর দেশে প্রায় ২৬ লাখ ২৪ হাজার বেকারের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারীদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি গড়ে না তোলায় উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়াচ্ছে। ব্যবহারিক জ্ঞান, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, যোগাযোগক্ষমতা ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতার ঘাটতিও এ সংকটের অন্যতম কারণ।
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর তদারকির দায়িত্বে থাকা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন গত শনিবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, কর্মসংস্থান উপযোগী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার জন্য উচ্চশিক্ষাব্যবস্থায় বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তৃতীয় ভাষা ও কারিগরি শিক্ষার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
‘গ্র্যাজুয়েটিং ইন টু আনসার্টেনটি’ শীর্ষক আইএমএফের গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের উচ্চহার উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী শ্রমশক্তির উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৩৬ শতাংশ। এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় গত সেপ্টেম্বরে।
তবে গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত আইএমএফের ‘রিজিওনাল ইকোনমিক আউটলুক: এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের প্রায় ২৯ শতাংশ বেকার।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে শুধু চাকরি না পাওয়াই সমস্যা নয়। চাকরি পেলেও অনেকের কাজ তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে মিলছে না। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত কর্মীদের প্রায় ৫০ শতাংশ এমন চাকরিতে আছেন, যে কাজের জন্য তাঁদের পর্যায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রয়োজন হয় না। অর্থাৎ তাঁরা নিজেদের যোগ্যতার তুলনায় কম দক্ষতার কাজে যুক্ত।
বিবিএসের সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে মোট বেকারের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৬ লাখ ২৪ হাজার। তাঁদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারীদের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার। শ্রমশক্তি জরিপ-২০২২ অনুসারে, তখন দেশে বেকারের সংখ্যা ছিল ২৫ লাখ ৮২ হাজার। তাঁদের মধ্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ছিলেন ৭ লাখ ৯৯ হাজার।
পেশাবিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়োগদাতারা এখন তথ্যপ্রযুক্তি, ইংরেজি ভাষা, যোগাযোগ, সমস্যা সমাধান ও দলগত কাজের দক্ষতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এসব দক্ষতার ঘাটতি থাকলে উচ্চতর ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও চাকরির বাজারে প্রবেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে উচ্চশিক্ষিত বেকার বাড়ছে।
জানতে চাইলে চাকরি খোঁজার অন্যতম অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বিডিজবস ডটকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফাহিম মাশরুর বলেন, স্নাতক ডিগ্রিধারী বাড়ছে। কিন্তু কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি, অর্থনৈতিক কাঠামোও পরিবর্তন হয়নি। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। তিনি বলেন, শুধু সনদ অর্জন নয়, কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের গ্র্যাজুয়েটদের এ বিষয়ে ঘাটতি দেখা যায়।
উচ্চশিক্ষিত বাড়ছে
ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৩ অনুযায়ী, ওই বছর দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ৫৩টি। ওই প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীসংখ্যা বৃদ্ধির তথ্যও রয়েছে। বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয় ১৭২টি। এর মধ্যে সরকারি ৫৬টি এবং বেসরকারি ১১৬টি।
এ ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে ২ হাজার ২৫৭টি। এর মধ্যে সরকারি কলেজ ৫৫৫টি। স্নাতক পাস (ডিগ্রি) কলেজ ১ হাজার ৯২১টি, স্নাতক (সম্মান) চালু আছে ৮৮১টি কলেজে। স্নাতকোত্তর চালু আছে ১৭৬টি কলেজে। পেশাদার প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৩১৭টি।
সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলো থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করছেন। তবে শিক্ষাবিদেরা বলছেন, নামসর্বস্ব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা গ্র্যাজুয়েটদের উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কেননা, বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে (নতুন পাবলিক ও বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) দক্ষ শিক্ষক, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, গবেষণা সুবিধা এবং চাহিদা অনুযায়ী বিষয় নেই। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত অনেক কলেজেও একই হাল।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রতিবছর যে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পাস করে বের হচ্ছেন সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। আবার অনেকে বাজারের চাহিদাসম্পন্ন জনবল হিসেবে বের হচ্ছেন না। ফলে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে।
জানতে চাইলে ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর বলেন, ‘আমাদের উচ্চশিক্ষার সমস্যা হচ্ছে, আমরা তাদের চাকরির জন্য তৈরি করি না। আমাদের দরকার, উচ্চশিক্ষার সঙ্গে ট্রেডকোর্স, শর্টকোর্স। কারিগরিতে যদি শিক্ষার্থী নিতে হয়, তাহলে এ খাতকে আগে সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। একসময় নার্সিংয়ে শিক্ষার্থী যেতে চাইত না, এখন যাচ্ছে। শিক্ষিত মানুষও যে সেলস ট্রেডে, হেয়ার কাটিংয়ে যেতে পারে, তা সমাজকে বোঝাতে হবে।’
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের সংকট
গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, উচ্চশিক্ষিত বেকারদের বড় অংশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীরা। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ২০২৪ সালের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ থেকে স্নাতক হওয়া শিক্ষার্থীদের ২৮ দশমিক ২৪ শতাংশ বেকার। পুরুষ স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ ও নারী স্নাতকদের মধ্যে ৩৪ দশমিক ৩১ শতাংশ।
অবশ্য এর সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ। তিনি বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৭ শতাংশ শিক্ষার্থী আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। তাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে বেকার তৈরির কারখানা বলা কিন্তু বাস্তবতা নয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেশে-বিদেশে বিভিন্ন খাতে কাজ করছেন। দেশের রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতেও তাঁদের অবদান রয়েছে।
প্রযুক্তির পরিবর্তনে চ্যালেঞ্জ
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, উচ্চশিক্ষিত বেকার বাড়ার অন্যতম কারণ শিক্ষিত তরুণদের দক্ষতা ও নিয়োগদাতাদের চাহিদার মধ্যে ব্যবধান। এ ছাড়া রয়েছে প্রযুক্তির পরিবর্তনের প্রভাব। কেননা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার বাড়ায় কিছু কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাচ্ছে। ফলে চাকরির বাজার সংকুচিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
আইএমএফের গবেষণা প্রতিবেদনেও শিক্ষিত তরুণদের দক্ষতা ও নিয়োগদাতাদের চাহিদার মধ্যে ব্যবধানের কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু দক্ষতা উন্নয়ন সেই গতিতে না হলে তরুণদের কর্মসংস্থানে চাপ আরও বাড়তে পারে। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিয়োগদাতাদের চাহিদার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে।










