Ajker Patrika

গ্যাসের অবৈধ সংযোগ: ফতুল্লার ঘরে ঘরে ‘মৃত্যুকূপ’

  • গত এক সপ্তাহে তিনটি বিস্ফোরণে ২১ জন দগ্ধ হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ৭ জন।
  • বাসিন্দারা বলছেন, তিতাস গ্যাসের পাইপ লিকেজের কারণে ঘটছে বিস্ফোরণ।
  • নগর-পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, বাড়িগুলোয় ভেন্টিলেশন নেই, জমছে গ্যাস।
সাবিত আল হাসান, নারায়ণগঞ্জ 
গ্যাসের অবৈধ সংযোগ: ফতুল্লার ঘরে ঘরে ‘মৃত্যুকূপ’

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার কুতুবপুর অঞ্চলের বাসিন্দা নুসরাত জাহান। পরিবারের রান্নার জন্য দিনে ৩-৪ ঘণ্টা তাঁকে থাকতে হয় রান্নাঘরে। তবে সম্প্রতি একের পর এক বিস্ফোরণের ঘটনায় উদ্বিগ্ন তিনি। এ কারণে রান্নাঘরে যেতে ভয় পান। আতঙ্ক নিয়ে করছেন রান্না। শুধু নুসরাত নন, নারায়ণঞ্জের অনেকে এখন ভুগছেন বিস্ফোরণ-আতঙ্কে। ভয়ে কেউ কেউ ঝুঁকছেন ইলেকট্রিক চুলার দিকে।

চলতি মাসে মাত্র চার দিনে গ্যাস থেকে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে তিনটি। ভয়াবহ এসব বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়েছে ২১ জন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে ৭ জন। আহতদের অনেকে এখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। স্থানীয়রা বলছেন, গ্যাস পাইপের লিকেজে ফ্ল্যাটগুলো একেকটি ‘ডেথ চেম্বার’ হয়ে উঠেছে।

তিতাস সূত্র জানায়, ১৯৬৪ সাল থেকে নারায়ণগঞ্জে গ্যাস-সংযোগ শুরু হয়। রাষ্ট্রীয় গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান তিতাস এই অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ করে। সাম্প্রতিক সময়ে হঠাৎ শুরু হয়েছে বিস্ফোরণ। ৫-৬ বছর ধরে বিস্ফোরণের ঘটনা বেড়েই চলছে।

বাসিন্দারা বলছেন, তিতাস গ্যাসের পাইপ লিকেজের কারণেই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে, যার অন্যতম উদাহরণ ২০২০ সালের তল্লা মসজিদে বিস্ফোরণ। ওই বিস্ফোরণে ২০ জন প্রাণ হারান। ওই ঘটনার পর তদন্তে উঠে আসে, দুর্ঘটনায় তিতাস কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাই অন্যতম কারণ। তিতাসের গ্যাসলাইনে এমন লিকেজ এখনো রয়েছে। পাশাপাশি অবৈধ সংযোগে কারণে এই লিকেজের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

চলতি মাসের ১০ মে ফতুল্লার উত্তর ভুইগড় এলাকায় গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে দগ্ধ হন তিন সন্তানসহ এক দম্পত্তি। এই পাঁচজনই মারা গেছে। এরপর ১১ মে ফতুল্লার লাকীবাজার এলাকায় গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে দগ্ধ হন চারজন। তাঁরা হলেন আব্দুল কাদির (৫০), তাঁর ছেলে মেহেদী (১৭) এবং যমজ ছেলে সাকিব ও রাকিব (১৬)। তাদের মধ্যে আব্দুল কাদির গতকাল মারা গেছেন।

সর্বশেষ ১৩ মে সোনারগাঁয়ে জেরা পাওয়ার প্ল্যান্টের ক্যানটিনে চুলার গ্যাস জমে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে দগ্ধ হন ১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাঁরা হলেন নাজমুল শেখ (৪০), সাইফুল ইসলাম (৩০), রামিজুল (৪৫), আমির (২৫), শঙ্কর (২৫), কাউসার (৩০), তুহিন শেখ (৩০), মনির হোসেন (৪৫), আল আমিন (৪০), ওসমান গনি (৩০), সুপ্রভাত ঘোষ (৪২) ও বদরুল হায়দার (৫০)। তাঁদের মধ্যে শঙ্কর গত বৃহস্পতিবার মারা গেছেন।

নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী গত বছর গ্যাসজনিত বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে চারটি। গ্যাস থেকে অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে ২০৪টি। অন্যদিকে চলতি বছরের ১৩ মে পর্যন্ত বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে ৭টি। আর গ্যাস থেকে অগ্নিকাণ্ড ৭১টি।

বিস্ফোরণের কারণ হিসেবে ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল আরেফীন বলেন, ‘আমরা মাইকিংসহ অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রাম চালু রেখেছি। কেউ যদি বাসায় গ্যাসের গন্ধ পায়, তাহলে দ্রুতই যেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানায় এবং দ্রুত ঘরের দরজা-জানালা খুলে দেয়। কিছু সময় বৈদ্যুতিক সুইচ এবং চুলা, সিগারেট, কয়েল জ্বালানো থেকে বিরত থাকে। সচেতনতার মাধ্যমে এই দুর্ঘটনা অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব।

পাশাপাশি তিতাসের উচিত, যেখানে লিকেজ আছে, সেগুলো মেরামত করে গ্যাস লিকেজ বন্ধ করতে হবে।’

তবে এসব লিকেজের নেপথ্যে চোরাই সংযোগ অনেকাংশে দায়ী বলে জানিয়েছেন তিতাসের ঠিকাদার ও মহানগর বিএনপি নেতা মুস্তাকিম শিপলু। তিনি বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আবাসিক গ্যাস-সংযোগ বন্ধ করে দেওয়ার পরেই নেতারা বাণিজ্য করেছেন অবৈধ লাইন দিয়ে। তাঁরা তিতাসের অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে গ্যাসের সংযোগ দিয়েছেন। মূল সংযোগ থেকে পাইপ টানা এবং রাইজার বসিয়ে গ্যাস সরবরাহ করেছেন তাঁরা। অদক্ষ কর্মী দিয়ে সংযোগ দিয়ে হাজার হাজার লিকেজ তৈরি করেছেন।

তবে গ্যাস লিকেজের কথা স্বীকার করেছেন তিতাসের ফতুল্লা অঞ্চলের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী আতিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এখানকার গ্যাসলাইন বেশ পুরোনো। এগুলো ধারাবাহিকভাবে পরিবর্তন করা হচ্ছে। রাইজার সংযোগ পর্যন্ত আমাদের দায়িত্ব। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, চুলার সংযোগস্থল এবং ত্রুটিপূর্ণ ব্যবহারের কারণে ঘর গ্যাস চেম্বারে পরিণত হয়।

তবে শুধু গ্যাস লিকেজই মুখ্য নয়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং প্রকৌশলীদের পরামর্শ ছাড়া ইমারত নির্মাণও গ্যাস চেম্বার তৈরির অন্যতম কারণ বলে মন্তব্য করেছেন নাসিকের নগর-পরিকল্পনাবিদ মঈনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বিল্ডিং কোড মেনে ইমারত নির্মাণ করা জরুরি। দেখা যায়, এই অঞ্চলে অধিক ঘনবসতি হওয়ার কারণে একই ঘরে রান্না এবং ঘুমায় অনেক পরিবার। যেখান থেকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে কয়েক গুণ। বিশেষত ৫ তলার নিচে নির্মাণ করা ভবনগুলো কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই তৈরি করা হয়। সে ক্ষেত্রে রান্নাঘরে বাতাস চলাচলের সুব্যবস্থা এবং ভেন্টিলেশন রাখা হচ্ছে না। গ্যাস লিকেজ থাকলেও ভেন্টিলেশন এবং বাতাস চলাচল স্বাভাবিক থাকলে দুর্ঘটনার শঙ্কা একেবারেই থাকে না। তাই আবাসন পরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা অত্যন্ত জরুরি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত