Ajker Patrika

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে জারুলের স্নিগ্ধতা

জাককানইবি সংবাদদাতা
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে জারুলের স্নিগ্ধতা
ক্যাম্পাসে সড়কের পাশে জারুল ফুলের গাছ। ছবি: আজকের পত্রিকা

দুপুর গড়িয়ে বিকেল। রোদের তেজ নরম হয়ে এসেছে। মৃদু বাতাস বইছে। এমন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক পেরোতেই যেন অন্য এক জগতে ঢুকে পড়া হয়। চারপাশে নীরব সবুজ আর তার ভেতর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে জারুল—বেগুনি ফুলে ভরা গাছ, শান্ত অথচ চোখে পড়ার মতো এক সৌন্দর্য নিয়ে। ময়মনসিংহের ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসটা প্রথম দেখায় হয়তো খুব জাঁকজমকপূর্ণ মনে হবে না। কিন্তু একটু সময় নিয়ে তাকালে বোঝা যায়, এখানে সৌন্দর্যটা অন্য রকম। ধীরে ধীরে চোখে পড়ে, মনেও ঢুকে যায়।

জারুলের মৌসুম এলে ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য যেন হঠাৎ করেই উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম গেট দিয়ে প্রবেশ করলেই রাস্তার দুই পাশে সারি সারি গাছ, ডাল ভরা নানান রঙের ফুল। হালকা বাতাসে ঝরে পড়া পাপড়ি মাটিতে ছড়িয়ে থাকে। কেউ হয়তো খেয়ালই করে না, কিন্তু এই অগোচর দৃশ্যগুলোই ক্যাম্পাসকে অন্য রকম করে তোলে। হাঁটতে হাঁটতে মনে হবে—এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলো তো। ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য শুধু জারুলে আটকে নেই; নজরুল ভাস্কর্য, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, পুরোনো ও নতুন বিজ্ঞান অনুষদসহ ক্যাম্পাসের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে মহুয়া, বুদ্ধ নারকেল, উদয়পদ্ম, বাওবাব, চাঁপালিশ, সুলতানচাঁপা, ঢাকীজাম, কুম্ভী, বিলিম্বি, নাগলিঙ্গম, শ্বেত পলাশ, লোহাকাঠ, লাল সোনাইল, গর্জন, চন্দ্রপ্রভা—আরও কত নাম না-জানা গাছ। কোথাও পুরোনো গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে, কোথাওবা নতুন চারা গাছ নীরবে বড় হয়ে উঠছে। এর মাঝেই লুকিয়ে আছে বিপন্ন তুন, যেন সময়ের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে। সব গাছের নাম হয়তো সবাই জানেন না, কিন্তু অনুভবটা সবারই একই। ক্লাসে যাওয়ার তাড়া থাকলেও কেউ একটু থামেন, মাথার ওপর ছায়াটা টের পান। কেউ হয়তো হঠাৎ করে বলে ওঠেন—‘এই গাছ তো আগে দেখিনি!’ এভাবেই অজান্তেই প্রকৃতির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়।

বিকেলের দিকে ক্যাম্পাসটা সবচেয়ে বেশি নিজের মতো হয়ে ওঠে। রোদ নরম হয়, গাছের ছায়া লম্বা হতে থাকে। জারুলের ফুলগুলো তখন আরও উজ্জ্বল লাগে, যেন দিনের শেষে নিজের রঙটুকু আরেকবার জানিয়ে দিচ্ছে। সিঙ্গারা হাউসের রাস্তার পাশে বসে থাকেন কিছু শিক্ষার্থী—কারও হাতে গিটার, কেউ কবিতা পড়ছেন, কেউ আবার শুধু চুপচাপ বসে ভাবছেন—আহা চলে যাওয়ার পর কতই না মনে পড়বে এই ক্যাম্পাস, এই সৌন্দর্য। কোনো কথা নেই, তবু বোঝা যায়—এই নীরবতাও একটা অনুভূতি। ক্যাম্পাসে সময়টা যেন একটু ধীরে চলে। শহরের মতো তাড়াহুড়ো নেই, শব্দ নেই, অস্থিরতা নেই। এখানে বিকেল মানে শুধুই একটা সময়—একটা অনুভব। পাঁচ টাকার আদা চায়ের কাপে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, হঠাৎ হেসে ওঠা, আবার হঠাৎ চুপ হয়ে যাওয়া, হঠাৎ খাবারের প্ল্যান করা কিংবা হঠাৎ ভ্রমণের পরিকল্পনা করা—সবকিছু মিলিয়ে একটা অদ্ভুত শান্তি কাজ করে। অনেকের জন্য এই জায়গা শুধু পড়াশোনার জন্য নয়, এখানে কেউ বন্ধুত্ব খুঁজে পান, কেউ নিজের স্বপ্নটা গুছিয়ে নেন, কেউ আবার ভেঙে পড়ে আবার উঠে দাঁড়াতে শেখেন। এই গাছগুলো, এই পথগুলো সব যেন সেই গল্পগুলোর নীরব সাক্ষী।

বর্ষায় এই ক্যাম্পাস অন্য রকম হয়ে যায়। ভেজা পাতার গন্ধ, কাদামাটির নরম স্পর্শ—সবকিছু মিলিয়ে অপার এক স্নিগ্ধতা। আবার শীতকালে কুয়াশার ভেতর দিয়ে গাছগুলোকে দেখলে মনে হয়, যেন কোনো গল্পের ভেতর হাঁটছি। কিন্তু গ্রীষ্মে জারুল ফুটলে এই ক্যাম্পাস যেন নিজের আসল পরিচয়টা সবচেয়ে বেশি দেখায়। হয়তো তা-ই, যাঁরা এখানে কিছুদিন কাটিয়েছেন, তাঁদের কাছে জায়গাটা উচ্চশিক্ষার স্থান তো বটেই, তাঁরা সঙ্গে করে নিয়ে যান কিছু স্মৃতি, কিছু অনুভূতি, একটা নীরব আশ্রয়। পড়াশোনা শেষ হয়ে গেলেও, ব্যস্ত জীবনে ঢুকে পড়লেও হঠাৎ করে কোনো বেগুনি ফুল দেখলে মনে পড়ে যায় এই পথগুলো, এই বিকেলগুলো। শেষ বিকেলে যখন আলোটা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে, জারুলের পাপড়িগুলো তখনো মাটিতে ছড়িয়ে থাকে। কেউ সেগুলো লক্ষ করেন, কেউ করেন না। কিন্তু সেগুলো থেকে যায় নীরবে, অচেনা কারও জন্য অপেক্ষা করে।

হয়তো এভাবেই, অজান্তেই, জারুলের স্নিগ্ধতায় প্রতিদিন একটু একটু করে গড়ে ওঠে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের নিজস্ব এক গল্প, যার কোনো শুরু নেই, শেষও নেই, শুধু আছে অনুভব।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত