Ajker Patrika

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ: ভাগ্য বদলায়নি, কষ্টে দিন পার চা-শ্রমিকের

  • পাশাপাশি এলাকায় দুটি জনগোষ্ঠীর বসবাস।
  • একটি জনগোষ্ঠী তাঁদের শ্রম, অধ্যবসায় দিয়ে নিজেদের এগিয়ে নিয়েছে।
  • আরেকটি জনগোষ্ঠী বছরের পর বছর রয়েছে একই অবস্থানে।
মাহিদুল ইসলাম, মৌলভীবাজার
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে সুনছড়া চা-বাগান এলাকায় কাজ করে বাড়ি ফিরছেন শ্রমিকেরা। ছবি: আজকের পত্রিকা
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে সুনছড়া চা-বাগান এলাকায় কাজ করে বাড়ি ফিরছেন শ্রমিকেরা। ছবি: আজকের পত্রিকা

পাশাপাশি দুটি জনগোষ্ঠীর বসবাস। দূরত্ব বলতে সর্বোচ্চ ২০০ মিটার হবে। মাঝখানে বয়ে চলা ছোট একটি ছড়া, যা পৃথক করেছে চা-শ্রমিক ও খাসিয়া জনগোষ্ঠীর আবাসস্থলকে। কাছাকাছি এলাকায় বসবাস হলেও মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ডবলছড়া খাসিয়াপুঞ্জি ও ডবলছড়া বা সুনছড়া চা-বাগানের শ্রমিকদের জীবনমানে ব্যাপক ফারাক। একটি জনগোষ্ঠী জুমের পান চাষ করে কিছুটা ভাগ্য বদলালেও, অন্য গোষ্ঠী চা চাষ বা চা-বাগানে কাজ করে বদলায়নি ভাগ্য।

কেউ বলেন ডবলছড়া, কেউ বলেন দেবলছড়া। আবার সুনছড়া নামেও পরিচিত সীমান্তবর্তী এই চা-বাগান। এই এলাকায় প্রায় তিন হাজার চা-বাগানের মানুষের বসবাস। ঘনবসতি থেকে প্রায় ৮-১০ কিলোমিটার দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয় এই এলাকায়।

এখানে চা-বাগানের বাসিন্দাদের জন্য নেই কোনো ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাসস্থান বা সুচিকিৎসার ব্যবস্থা। এই এলাকার শ্রমিকেরা বংশপরম্পরায় বাগানে কাজ করেও বদলায়নি ভাগ্যের চাকা। চা-বাগানের ঠিক পাশেই রয়েছে ডবলছড়া খাসিয়াপুঞ্জি। এখানের পরিবেশ ঠিক উল্টো। প্রায় ৭৫টি খাসিয়া পরিবার বসবাস করে এই পুঞ্জিতে। তাদের মূল পেশা পান চাষ। পান চাষ করে কিছুটা হলেও তাদের জীবনযাত্রা পরিবর্তন হয়েছে, তা পরিবেশ দেখেই বোঝা যায়। বছরের বেশির ভাগ সময় পান বিক্রি করে আয়ের টাকায় চলে খাসিয়াদের জীবন ও সংসার। বাজারে পানের দাম যত বেশি, আয়ের সংখ্যাও তত বেশি।

সরেজমিনে সীমান্তবর্তী ডবলছড়া চা-বাগান এলাকা ও খাসিয়াপুঞ্জিতে দেখা যায়, যে কেউ ইচ্ছা করলেই পুঞ্জিতে প্রবেশ করতে পারবেন না। পুঞ্জির মন্ত্রী বা হেডম্যানের অনুমতি পেলে প্রহরী গেট খুলে ভেতরে প্রবেশ করান। অনুমতি না মিললে ফিরে আসতে হবে। খাসিয়ারা জুম থেকে পান সংগ্রহ করে পুঞ্জিতে নিয়ে আসছেন। এসব পান নারীরা বিক্রির জন্য পরিপাটি করছেন। পুঞ্জিতে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন উপাসনালয়, বিদ্যালয়। পাহাড়ের ওপর পরিপাটি দোতলা, পাকা, আধা পাকাসহ মাটি ও বাঁশের বেড়ার ঘর। নিচ থেকে ওপরে ওঠার জন্য রয়েছে একাধিক পাকা সিঁড়ি। দেখলে মনে হবে কেউ যেন পর্যটকদের জন্য সুন্দর পরিপাটি করে কটেজ সাজিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে চা-বাগানে রয়েছে মাটি ও বাঁশের ঘর। ছোট ছোট ঘরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য চিকিৎসাসহ মৌলিক অধিকার থেকে।

কথা হয় ডবলছড়া খাসিয়াপুঞ্জির কয়েকজনের সঙ্গে। তাঁরা বলেন, ‘সরকারিভাবে আমরা কোনো সহযোগিতা পাচ্ছি না, যা কিছুই আছে আমাদের সব নিজস্ব অর্থে পরিচালিত। আমরা প্রতিদিন পান সংগ্রহ করে বিক্রি করে জীবন চলে। যে যত বেশি পান চাষ করেছেন, তাঁর আয় ততই বেশি। বর্তমানে এক কুড়ি পানের বাজার মূল্য ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা, যা অনায়াসে বিক্রি করা যায়। পুঞ্জি থেকে পাইকার এসে পান নিয়ে যায়। পান চাষে খরচ বাড়লেও এখনো প্রায় অর্ধেক লাভ হয়। বছরে একেকজন কয়েক লাখ টাকার পান বিক্রি করতে পারেন।’

একই এলাকার চা-শ্রমিকেরা জানান, সারা বছর ১৭৮ টাকা মজুরিতে কাজ করতে হয়। একটি পরিবার থেকে মাত্র একজন শ্রমিক নিয়মিত বাগানে কাজ করতে পারেন। পরিবারের একজন কাজ করলে বাকি চার সদস্যকে বেকার থাকতে হচ্ছে। দুর্গম এই এলাকা থেকে বাইরে কাজে যাওয়া অনেক কষ্টের। যাতায়াতের ব্যবস্থা নেই। সবাই কষ্ট করে জীবনযাপন করছেন। নেই পর্যাপ্ত খাবার ও থাকার ব্যবস্থা।

বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরি বলেন, ‘চা-শ্রমিকেরা সব সময় বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। রাষ্ট্র উদ্যোগ না নিলে এ বৈষম্য দূর হবে না।’ তিনি বলেন, ‘খাসিয়ারা সরকারিভাবে বিভিন্ন সুযোগ পাচ্ছে। বিশেষ করে সরকারি চাকরির জন্য তাদের কোটা ছিল, এ জন্য তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেছে। আরও বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে তারা।’

ডবলছড়া খাসিয়াপুঞ্জির হেডক্লার্ক পিডিশন প্রধান সুচিয়াং বলেন, ‘আমরা সরকারি কোনো সহায়তা পাই না। আমাদের যা কিছু আছে, সবকিছু নিজস্ব অর্থ দিয়ে করেছি। সরকারি সহযোগিতা পেলে খাসিয়াদের জীবনমানের উন্নয়ন হতো।’

মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক (ডিসি) তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, ‘আমাদের কাছে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো কিছুর জন্য আবেদন করলে যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করা হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত