Ajker Patrika

অতিথির রণতরি ডুবল মার্কিন হামলায়, প্রশ্নের মুখে ‘মহাসাগরের রক্ষক’ মোদি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২৬, ২১: ৩৩
অতিথির রণতরি ডুবল মার্কিন হামলায়, প্রশ্নের মুখে ‘মহাসাগরের রক্ষক’ মোদি
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

গত বছরের অক্টোবরের শেষ দিকে নৌবাহিনীর ইউনিফর্ম আর সানগ্লাস চোখে দিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশটির নৌসেনাদের উদ্দেশে এক জ্বালাময়ী বক্তব্য দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি ভারত মহাসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব এবং এই পথে পরিচালিত বাণিজ্য ও তেল পরিবহনের কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, ‘ভারতীয় নৌবাহিনী হলো ভারত মহাসাগরের রক্ষক বা অভিভাবক।’ মোদির এই বক্তব্যের পর উপস্থিত সবাই ‘ভারত মাতা কি জয়’ ধ্বনিতে চারপাশ মুখর করে তুলেছিলেন।

কিন্তু সেই ঘোষণার পাঁচ মাস না পেরোতেই ভারতের ‘অভিভাবক’ হওয়ার দাবি এখন বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ভারত মহাসাগরে নিজের আমন্ত্রিত অতিথিকেই রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে নয়াদিল্লি।

গত বুধবার শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূল থেকে মাত্র ৪৪ নটিক্যাল মাইল (৮১ কিমি) দূরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন সাবমেরিনের টর্পেডো হামলায় ধ্বংস হয়েছে ইরানি যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস ডেনা’। জাহাজটি ভারত আয়োজিত বহুপক্ষীয় নৌ মহড়া ‘মিলান’-এ অংশ নিয়ে দেশে ফিরছিল। এই মহড়ার সময় ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু ডেনার নাবিকদের সঙ্গে পোজ দিয়ে ছবি তুলেছিলেন।

কিন্তু মর্মান্তিক এ ঘটনার পর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে ভারতীয় নৌবাহিনীর এক দিনের বেশি সময় লেগেছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এই হামলা ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ইরানবিরোধী যুদ্ধ বিস্তারেরই একটি স্পষ্ট সংকেত। জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার পর মার্কিন প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথ পেন্টাগনে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘তারা আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিজেদের নিরাপদ ভেবেছিল, কিন্তু আমাদের একটি সাবমেরিন সেই ইরানি যুদ্ধজাহাজটিকে ডুবিয়ে দিয়েছে।’

তবে নিজেদের উপকূল থেকে দুই হাজার মাইল দূরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থানরত যুদ্ধজাহাজের ওপর এমন হামলার পর তেহরান ক্ষোভে ফেটে পড়ে। ইরানের দাবি, ‘আইআরআইএস ডেনা’ ছিল ভারতের নৌবাহিনীর আমন্ত্রিত ‘অতিথি’। সেটিকে কেন নিশানা করা হলো?

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সমুদ্রের বুকে নৃশংসতা চালিয়েছে। আমার কথা মিলিয়ে নেবেন—এই নজির তৈরির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে তিক্ত অনুশোচনা করতে হবে।’

বর্তমানে আইআরআইএস ডেনা ভারত মহাসাগরের তলদেশে পড়ে আছে। এর সঙ্গে প্রাণ হারিয়েছেন ৮০ জনে বেশি ইরানি নাবিক, যাঁরা দুই সপ্তাহের ভারত সফরে ভারতীয় নৌসেনাদের সঙ্গে মার্চপাস্ট করেছিলেন এবং সেলফি তুলেছিলেন।

অবসরপ্রাপ্ত ভারতীয় নৌ কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনার মধ্য দিয়ে ভারত মহাসাগরে ‘নিট সিকিউরিটি প্রোভাইডার’ বা মূল নিরাপত্তাদাতা হিসেবে ভারতের যে ভাবমূর্তি ছিল, তা ক্ষুণ্ন হয়েছে। তাঁদের মতে, ডেনার ওপর এই হামলা ভারতের সামুদ্রিক আঙিনায় দিল্লির ক্ষমতা ও প্রভাবের সীমাবদ্ধতাকে উন্মোচিত করেছে।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ভারতের পূর্ব উপকূলের বিশাখাপট্টনম থেকে ডেনা যাত্রা শুরু করেছিল। ৪ মার্চ ভোরে শ্রীলঙ্কার জলসীমার ঠিক বাইরে এটি আক্রান্ত হয়। শ্রীলঙ্কান নৌবাহিনী ৩২ জন জীবিত নাবিককে উদ্ধার করেছে এবং ৮০টির বেশি মরদেহ উদ্ধার করেছে। এখনো ১০০ জনের বেশি নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন।

ওই হামলার ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় পর গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভারতীয় নৌবাহিনী একটি বিবৃতি দেয়। তারা জানায়, বিপৎসংকেত পাওয়ার পর ভারত একটি উদ্ধারকারী জাহাজ মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, কিন্তু ততক্ষণে শ্রীলঙ্কা উদ্ধারকাজ শুরু করে দেয়।

তবে সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, নয়াদিল্লি বা ভারতীয় নৌবাহিনী—কেউই ইরানের যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করেনি, এমনকি মৃদু প্রতিবাদও জানায়নি।

সামরিক বিশ্লেষক ও সাবেক নৌ কর্মকর্তারা একে ভারতের জন্য ‘ক্যাচ-২২’ বা উভয়সংকট হিসেবে দেখছেন। প্রশ্ন উঠছে, ভারত কি আগে থেকে জানত যে তাদের বাড়ির আঙিনায় একটি ইরানি জাহাজে মার্কিন হামলা হতে যাচ্ছে? নাকি ভারতের নজর এড়িয়েই একটি সাবমেরিন এই কাণ্ড ঘটিয়ে দিল?

ভারতের সাবেক নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল অরুণ প্রকাশ বলেন, ‘যদি এটি ভারতের জন্য অজানা হয়ে থাকে, তবে তা বড় উদ্বেগের বিষয়। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের তথাকথিত কৌশলগত অংশীদারত্ব রয়েছে।’

জোটনিরপেক্ষ হিসেবে ভারতের বর্তমান অবস্থান এখন ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ নামে পরিচিত হলেও বাস্তবে দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অনেক কাছাকাছি চলে গেছে। ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের শুরুর মাত্র দুই দিন আগে মোদি ইসরায়েল সফর করে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে ‘ভাই’ বলে আলিঙ্গন করেছিলেন।

অন্যদিকে, ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা খামেনির মৃত্যুতে মোদি একটি শোকবার্তাও দেননি। গতকাল ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি দিল্লির ইরান দূতাবাসে গিয়ে শোক বইয়ে সই করেছেন। সাধারণত এ ধরনের ঘটনায় কোনো মন্ত্রীকে পাঠানো হয়, কিন্তু এবার পাঠানো হয়েছে একজন আমলাকে।

ভারতীয় সামরিক ইতিহাসবিদ শ্রীনাথ রাঘবন বলেন, ‘কূটনৈতিকভাবে ভারত নিজেকে এই যুদ্ধে আক্রমণকারীদের পাশে দাঁড় করিয়েছে। এটি মধ্যপ্রাচ্যে ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতাকে দীর্ঘমেয়াদি সংকটে ফেলবে।’ বিরোধী দল কংগ্রেসের সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে অভিযোগ করেছেন, মোদি সরকার ভারতের জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে কয়েক দশকের যত্নে গড়া পররাষ্ট্রনীতি ধ্বংস করছে।

আল জাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশি জোবাইদুল আমিনকে যুক্তরাষ্ট্রে ধরে নিয়ে গেছে এফবিআই

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে চীনা স্যাটেলাইট ইরানের নীরব ঢাল

ভারতকে চীনের মতো শক্তিশালী শত্রু হতে দেবে না যুক্তরাষ্ট্র

ফটিকছড়িতে প্রধান শিক্ষক ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার হাতাহাতি

ইরান যুদ্ধে পালানটিরের ‘মেভেন’ যেন ১২ ঘণ্টায় ৯০০ আজরাইল

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত