Ajker Patrika

মাঠে জলাবদ্ধতা: বোরোর পর আউশ নষ্ট আমন আবাদেও শঙ্কা

  • পাম্প দিয়ে পর্যাপ্ত পানি না নামায় ডুবে আছে কাউয়াদীঘি হাওরের আউশ ও আমন ধানের খেত।
  • চলতি আমন মৌসুমে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
  • বোরো মৌসুমে এই পাম্প দিয়ে দ্রুত পানি না কমায় বেশির ভাগ কৃষকের ধান তলিয়ে যায়।
মাহিদুল ইসলাম, মৌলভীবাজার
মাঠে জলাবদ্ধতা: বোরোর পর আউশ নষ্ট আমন আবাদেও শঙ্কা
রাজনগর উপজেলায় জলবদ্ধতায় ডুবছে ধান খেত। ছবি: আজকের পত্রিকা

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নে মনু সেচ প্রকল্পের কাশিমপুর পাম্প হাউস। কৃষকদের কথা চিন্তা করে হাওরের পানি কমানোর জন্য এই পাম্প স্থাপন করা হয়। একটা সময় এটি হাওরাঞ্চলের কৃষকের ভরসা ছিল। তবে এখন সেটিই যেন সংকটের কারণ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। পাম্পগুলো দিয়ে পর্যাপ্ত পানি না কমায় কৃত্রিম জলাবদ্ধতায় ডুবে আছে বিস্তীর্ণ কাউয়াদীঘি হাওরের আউশ ও আমন ধানের খেত। কৃষকেরা পানি কমানোর দাবি জানালেও বাস্তবে এই পাম্প দিয়ে হাওরের দুই ফুট পানি কমতে সময় লাগবে অন্তত দুই মাস। আর এতেই কৃষকেরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

কৃষকেরা জানান, রাজনগর ও সদর উপজেলাজুড়ে কাউয়াদীঘি হাওর। এই হাওরের পানি না কমায় ইতিমধ্যে হাওরের পাকা আউশ ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। চলতি আমন মৌসুমে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। হাওরে পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও পাম্প দিয়ে পানি নামতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। গত বোরো মৌসুমে এই পাম্প দিয়ে দ্রুত পানি না কমায় বেশির ভাগ কৃষকের ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়।

মৌলভীবাজার কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে ২২ হাজার হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত কাউয়াদীঘি হাওর। জলাবদ্ধতা নিরসন ও কৃষি রক্ষার লক্ষ্যে ১৯৭৬ সালে কুয়েত সরকারের যৌথ অর্থায়নে মনু সেচ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ১৯৮০ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। হাওরের উদ্বৃত্ত পানি কুশিয়ারা নদীতে নিষ্কাশনের জন্য রাজনগরের কাশিমপুরে স্থাপন করা হয় আটটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প। প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল হাওরের পানি নিয়ন্ত্রণ করে কৃষিজমিকে আবাদযোগ্য রাখা।

কাউয়াদীঘি হাওরের কৃষকেরা জানান, হাওরের পানি দুই থেকে আড়াই ফুট কমানো সম্ভব হলে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমিতে আমন আবাদ করা যেত। এতে প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার টন ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। পানি না কমায় সেই সম্ভাবনাও এখন অনিশ্চিত। কাশিমপুরে ৮টি পাম্প রয়েছে। এই পাম্প নিয়মিত চালানো হয় না। এর মধ্যে অনেক সময় বিদ্যুৎ থাকে না। আর এতে করে খুবই ধীরগতিতে পানি নামছে। এই পাম্পকে আরও অত্যাধুনিক করা প্রয়োজন।

কৃষকেরা আরও জানান, গত বোরো মৌসুমে এক-তৃতীয়াংশ ফসলও ঘরে তুলতে পারেননি। এবার আউশ ধানও পানিতে তলিয়ে গেছে। অন্যদিকে আমনের চারা রোপণের সময় পেরিয়ে গেলেও জমিতে পানি থাকায় চাষাবাদ শুরু করতে পারছেন না অনেক কৃষক।

রাজনগরের ফতেপুর ইউনিয়নের শাহাপুর গ্রামের কৃষক সোহেল মিয়া বলেন, ‘আমি প্রায় দুই একর জমিতে আমনের চারা রোপণের প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ করেছি। কিন্তু সব জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এখন চারা রোপণই করা যাচ্ছে না।’

রাজনগরের বালিগাঁও এলাকার বাসিন্দা তুহিন জুবায়ের বলেন, পুরো কাউয়াদীঘি হাওরের চারপাশে বাঁধ থাকায় পানি বেড়ে গেছে।

হাওর রক্ষা সংগ্রাম কমিটির মৌলভীবাজার সদর উপজেলা শাখার সভাপতি আলমপুর হোসেন বলেন, কাউয়াদীঘি হাওরের বর্তমান সংকট সম্পূর্ণ মানবসৃষ্ট। পাম্প নিয়মিত চালু থাকলে এভাবে জলাবদ্ধতা তৈরি হতো না। দ্রুত দুই থেকে আড়াই ফুট পানি নামানো না গেলে আমন আবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

হাওর রক্ষা আন্দোলনের সদস্যসচিব খছরু চৌধুরী বলেন, একসময় হাওরের বিলে থাকা পানির স্তর নির্ধারণী স্কেলটি ২০০৪ সালে সরিয়ে পাম্প হাউসসংলগ্ন গভীর ক্যানেলে স্থাপন করা হয়। এর ফলে বর্ষা ও শীত উভয় মৌসুমেই পানি আটকে রেখে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। প্রতিবার একই সংকট তৈরি হচ্ছে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে হাওরের কৃষিব্যবস্থাই হুমকির মুখে পড়বে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলীদ বলেন, বর্তমানে হাওরের পানির উচ্চতা ৮ দশমিক ৬০ মিটার। পানির উচ্চতা সাড়ে আট মিটারের মধ্যে থাকার কথা। পাম্প হাউসের বর্তমান সক্ষমতায় দুই ফুট পানি কমাতে বৃষ্টিহীন অবস্থাতেও ৫০ থেকে ৬০ দিন সময় লাগবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, দ্রুত পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করে পানি নিষ্কাশন এবং আমন চাষের উপযোগী পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত