কমলগঞ্জে গ্রাফটিং ও মালচিং পদ্ধতির সংমিশ্রণে টমেটোর চাষ, মিলবে সারা বছর

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে মালচিং পেপার ও গ্রাফটিং পদ্ধতির সমন্বয়ে টমেটো চাষ করছেন কৃষকেরা। চাষিদের দাবি, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ পদ্ধতিতে ভালো ফলন ও বাজারদর পাওয়া যায়। সে সঙ্গে সারা বছর উৎপাদন করা যায় টমেটো।
জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর, মাধবপুর ও সদর ইউনিয়নে মালচিং পেপারের সঙ্গে গ্রাফটিং পদ্ধতি ব্যবহার করে গ্রীষ্মকালীন টমেটোর চাষ হচ্ছে। একই পদ্ধতিতে অন্যান্য সবজিও চাষ করছেন কৃষকেরা।
মালচিং পেপার হলো জমির মাটি ঢেকে রাখার একটি পদ্ধতি। চাষের আগে জমিতে পেপার বিছিয়ে দিলে আগাছা জন্মানো, সরাসরি সূর্যের তাপ ও বিভিন্ন পোকামাকড়ের ক্ষতি কমানো সম্ভব বলে জানান চাষিরা। একবার পেপার ব্যবহার করে কয়েকবার ফসল উৎপাদন করা যায় বলেও তাঁদের দাবি।
গ্রাফটিং পদ্ধতিতে টমেটোগাছের রোগবালাই কমানো, শিকড় শক্ত করা ও ফলন বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। বনবেগুন বা তিত বেগুনের শক্ত কাণ্ডের সঙ্গে টমেটোগাছের অংশ জোড়া দিয়ে চারা তৈরি করা হয়। কমলগঞ্জের কৃষকেরা এ পদ্ধতি ব্যবহার করে সফলতা পেয়েছেন বলে জানান।
চাষিদের ভাষ্য, স্থানীয় কৃষকেরা লাখ লাখ টাকা খরচ করে গ্রাফটিং চারা তৈরি করেন এবং বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করেন। মালচিং পেপারের ওপর এসব চারা রোপণ করা হয়। ৩০ শতক জমিতে টমেটো চাষে তিন থেকে চার লাখ টাকা খরচ হয়।
কমলগঞ্জে কয়েকজন কৃষক চার থেকে পাঁচ একর জমিতে টমেটো চাষ করছেন। প্রতিটি টমেটোখেতে প্রতিদিন গড়ে ছয় থেকে সাতজন শ্রমিক কাজ করেন। চাষিদের মতে, গ্রাফটিং পদ্ধতিতে ব্যাপকভাবে টমেটো চাষ হলে গ্রীষ্মকালেও বাজারে টমেটোর সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে।
গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষে খরচ বেশি হলেও বাজারে ভালো দাম পাওয়া যায় বলে জানান কৃষকেরা। মৌসুমের শুরুতে তাঁরা প্রতি কেজি টমেটো ১০০ টাকা পাইকারি দরে বিক্রি করেছেন। বর্তমানে বাজারভেদে প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তবে গ্রাফটিং পদ্ধতিতে বেশির ভাগ কৃষক সফল হলেও কয়েকজনের টমেটোগাছ ফল ধরার সময় পোকার আক্রমণে মারা যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কৃষি বিভাগের কোনো সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ চাষিদের।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজারে প্রায় ২১ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষ হয়। প্রতি হেক্টরে গড়ে ৩০ টন উৎপাদন হয়। শীতকালীন টমেটো চাষ হয় ১ হাজার ২২১ হেক্টর জমিতে। এ ক্ষেত্রে প্রতি হেক্টরে ৩০ থেকে ৩৫ টন ফলন হয়।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বারি টমেটো-৮ সারা বছর চাষ করা যায় এবং বনবেগুন বা কাঁটাবেগুনের সঙ্গে কলমের উপযোগী। গ্রাফটিং করা চারায় ফলন বেশি হয়। কমলগঞ্জের কৃষকেরা গত পাঁচ থেকে ছয় বছর ধরে এ পদ্ধতিতে টমেটো চাষ করছেন।
টমেটোচাষি আব্দুস সালাম বলেন, মালচিং পেপারের ওপর গ্রাফটিং চারা রোপণ করা হয়। মালচিং পেপার দিলে মাটি ঢেকে থাকে, আগাছা জন্মায় না এবং রোপণ করা ফসলের গাছ দ্রুত বড় হয়। মালচিং ও গ্রাফটিং পদ্ধতির সংমিশ্রণে টমেটোসহ কৃষিতে দারুণ সফলতা আসছে।
আদমপুর ইউনিয়নের টমেটোচাষি গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘মালচিং পেপারের ওপর প্রায় দুই একর জায়গায় গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষ করছি। ফলন ভালো হয়েছে। তবে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। গ্রাফটিং পদ্ধতিতে চারা রোপণ করেছি। গত চার থেকে ছয় বছর ধরে এ পদ্ধতিতে আমরা টমেটো চাষ করি।’
গ্রীষ্মকালীন টমেটোচাষি আতিকুর রহমান বলেন, ‘এ বছর আমি ১৫ হাজার চারা গ্রাফটিং করে মালচিং পদ্ধতিতে রোপণ করেছিলাম। এতে ১২ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। গত ১৫ দিন ধরে টমেটো বিক্রি করছি। আশা করছি, ৩০ লাখ টাকার টমেটো বিক্রি করতে পারব। এখন প্রতি কেজি টমেটো ৬০ টাকা করে বিক্রি করছি।’
মৌলভীবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দীন বলেন, ‘তিত বেগুনের কাণ্ডের সঙ্গে বারি টমেটো-৮-এর অংশ লাগিয়ে গ্রাফটিং করা হয়। গ্রাফটিং করতে হলে একই জিনগত বৈশিষ্ট্য থাকতে হয়। তিত বেগুন ও টমেটোর একই জিনগত বৈশিষ্ট্য থাকায় গ্রাফটিং করা যাচ্ছে। এ পদ্ধতির ব্যাপক বিস্তার হলে সারা বছর বাজারে দেশীয় টমেটো পাওয়া যাবে।’








