Ajker Patrika

ঝুঁকি ভাতায় ব্যয় হাজার কোটি

• প্রতিষ্ঠানের মোট জনবল ৬০৮। সবাই পাচ্ছেন ঝুঁকি ভাতা সুবিধা

• ঝুঁকি ভাতার পরিমাণ বছরে ২৫-২৭ মাসের মূল বেতনের সমান

• দুদকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সুপারিশসহ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে

সৈয়দ ঋয়াদ, ঢাকা
ঝুঁকি ভাতায় ব্যয় হাজার কোটি

মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) সব কর্মকর্তা-কর্মচারীই পাচ্ছেন ঝুঁকি ভাতা। বছরে এ খাতে তাঁদের মধ্যে বণ্টন হচ্ছে সংস্থার আয়ের প্রায় ১০০ কোটি টাকা। সে হিসাবে ঝুঁকি ভাতায় গত এক দশকে সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পকেটে গেছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা।

এমন তথ্য উঠে এসেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) গঠিত প্রাতিষ্ঠানিক টিমের অনুসন্ধানে। প্রতিবেদনে বিএসটিআইয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম এবং সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির অভিযোগও উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি সম্প্রতি সুপারিশসহ দুদক থেকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে।

সূত্র জানায়, দুদকের গঠিত টিম চলতি নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বিএসটিআইয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের দুর্নীতির উৎস, কারণ ও প্রতিরোধের উপায় অনুসন্ধান করে কমিশনের কাছে ১৭টি সুপারিশ করে। এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে বিষয়টি অবহিত করার সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। পরে দুদকের সচিব সাইদুর রহমান খানের স্বাক্ষরে সুপারিশগুলো মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আজকের পত্রিকাকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

বিএসটিআই নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার এবং সুপারিশ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানোর বিষয়টি আজকের পত্রিকাকে নিশ্চিত করেছেন দুদকের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম। তবে এ বিষয়ে আর কিছু জানাতে অপারগতা জানান তিনি।

সূত্র জানায়, দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএসটিআইয়ের আয়ের একটি অংশ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বিধান থাকলেও তা দেওয়া হয় না। প্রতিষ্ঠানের আয় ও উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে তা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঝুঁকি ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা দিতে ব্যয় হচ্ছে। এ ছাড়া সংস্থাটিতে আর্থিক অনিয়ম, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম এবং সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠে এসেছে।

বিএসটিআই আইন, ২০১৮ অনুযায়ী, সংস্থাটির আয় ও উদ্বৃত্ত অর্থ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নির্ধারিত আইনি বিধান অনুসরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। প্রতিবেদনের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির আয়কে বেসরকারি অর্থ হিসেবে বিবেচনা করে এর একটি অংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বণ্টন করছে বিএসটিআই। অথচ অর্থ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, বিএসটিআইয়ের কোনো আয়কে বেসরকারি আয় হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই।

ইতিমধ্যে বিএসটিআইয়ের ঝুঁকিভাতার নামে অর্থ বণ্টনের বিষয়ে একাধিকবার অডিট আপত্তি এসেছে। অডিট আপত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘প্রতিষ্ঠানের আয়ের ৪০ শতাংশ বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার বিএসটিআই কাউন্সিলের নেই।’ পণ্যের মান সনদ ও লাইসেন্স প্রদান কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক দায়িত্বের অংশ হওয়ায় এ থেকে অর্জিত আয় প্রতিষ্ঠানের সরকারি আয় হিসেবেই বিবেচিত হওয়ার কথা। তারপরও প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়ন না করে দীর্ঘদিনের প্রচলিত নিয়মের দোহাই দিয়ে অর্থ বণ্টন অব্যাহত রাখা হয়েছে।

২৫ থেকে ২৭ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ ঝুঁকিভাতা

বিএসটিআইয়ে মোট জনবল ৬০৮। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই জনবলের সবাই ঝুঁকিভাতা পাচ্ছেন। এর পরিমাণ বছরে ২৫ থেকে ২৭ মাসের মূল বেতনের সমান। জনপ্রতি মাসে গড়ে এর পরিমাণ প্রায় ৬০ হাজার টাকা। বছরে যা দাঁড়ায় প্রায় ১০০ কোটি টাকা। সে হিসাবে গত এক দশকে এই ঝুঁকিভাতা দেওয়া হয়েছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের মনিটরিং সেল ২০২২ সালের ৫ জুন বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনের বাইরে অতিরিক্ত ২৫ থেকে ২৭ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ ঝুঁকিভাতা দেওয়া বন্ধের নির্দেশনা দেয়। এই নির্দেশনার বিরুদ্ধে বিএসটিআইয়ের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মো. তুহিন আহমেদ ২০২২ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ওই নির্দেশনার কার্যকারিতা স্থগিত হওয়ার পর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঝুঁকিভাতা নেওয়া অব্যাহত থাকে বলে দুদকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুদকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিএসটিআইয়ের মোট ৬০৮টি পদের মধ্যে গ্রেড–৪-এ ছয়টি, গ্রেড–৬-এ ৫১টি, গ্রেড–৯ ও তদূর্ধ্বে ৩৭৫টি, গ্রেড–১০ ও ১১-তে নয়টি, গ্রেড–১২ থেকে ১৬-তে ১০৭টি এবং গ্রেড–১৭ থেকে ২০-এ ৫৯টি পদ রয়েছে। তাঁদের সবাই ঝুঁকিভাতা সুবিধা পাচ্ছেন।

বিধিমালা হয়নি প্রায় আট বছরেও

বিএসটিআই আইন, ২০১৮-এর ৪১ ধারায় প্রতিষ্ঠানের তহবিল গঠন, অর্থের উৎস, তফসিলি ব্যাংকে অর্থ জমা এবং বিধি অনুযায়ী তহবিল পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই আইন করার দীর্ঘ সময় পরও প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়নি।

দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিধিমালা না থাকার সুযোগে ঝুঁকিভাতা, পেনশনভাতা ও কল্যাণভাতাসহ বিভিন্ন খাতে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। অথচ এসব ব্যয়ের যৌক্তিকতা ও আইনগত ভিত্তি নিয়ে অডিট আপত্তি রয়েছে। পৃথক বেনেভোলেন্ট তহবিল থাকা সত্ত্বেও কল্যাণমূলক খাতে প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যয়ের বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অডিট আপত্তি থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেই

বিএসটিআইয়ের বিভিন্ন আর্থিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে সরকারি বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তরের একাধিক আপত্তি উঠে এসেছে। এসব আপত্তির মধ্যে রয়েছে সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন করে দরপত্র মূল্যায়ন, নন-রেসপনসিভ ঠিকাদারকে রেসপনসিভ হিসেবে বিবেচনা করে চুক্তি সম্পাদন এবং প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ে অনিয়ম।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়ের প্রশাসন ভবনের চতুর্থ তলার ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ কাজে ১ কোটি ৫১ লাখ ৭৫ হাজার ৫৮৬ টাকার অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। একই তলার ডেকোরেশন কাজে ফলস সিলিং স্থাপন না করেও ৫ লাখ ৫৩ হাজার ৭২৮ টাকা বিল পরিশোধ এবং নকশা ও কার্যাদেশবহির্ভূত কাজে ১৯ লাখ ১১ হাজার ১৯৭ টাকা বিল দেওয়ার বিষয়টিও অডিট আপত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ‘পাঁচ জেলায় বিএসটিআইয়ের সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্পের ২ কোটি ২০ লাখ ৭ হাজার ২০০ টাকার কেনাকাটায় অনিয়ম এবং ঠিকাদারের কাছ থেকে ২ লাখ ৬৯ হাজার ১৬১ টাকা লিকুইডেটেড ড্যামেজেস (এলডি) আদায় না করার অভিযোগ রয়েছে। মহাপরিচালকের (ডিজি) অবসরভাতার নামে অনিয়মিতভাবে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মবহির্ভূতভাবে বছরে ২৫ থেকে ২৭ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ বোনাস ভোগ করাসহ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে বছরে শতকোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ যদি সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে বলতে হবে, স্ট্যান্ডার্ড ইনস্টিটিউট হয়ে তারা ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মাধ্যমে জনগণের অর্থ আত্মসাতের মহোৎসবের স্ট্যান্ডার্ড তৈরিতে লিপ্ত রয়েছে। এসব অনিয়মের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় নিয়মবহির্ভূতভাবে ভোগ করা অর্থ বাধ্যতামূলকভাবে ফেরত নেওয়াসহ দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।’

জনবল কাঠামো পুনর্বিন্যাসের সুপারিশ

দুদকের অনুসন্ধানে বিএসটিআইয়ের জাল সিল ব্যবহার করে নিম্নমানের ও ভেজাল পণ্য বাজারজাত করার অভিযোগ উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে সংস্থাটি ১৭ হাজার ৮৯৭টি খাদ্যপণ্যসহ মোট ২৭ হাজার ৫৭টি নমুনা পরীক্ষা করলেও বাধ্যতামূলক লাইসেন্সের আওতার বাইরে থাকা অনেক পণ্য যথাযথ তদারকির বাইরে রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় লাইসেন্সের আওতা বাড়ানো, গোয়েন্দা নজরদারি, বিশেষ অভিযান, কারখানা পরিদর্শন এবং বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ জোরদারের সুপারিশ করেছে দুদক।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিএসটিআই, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা এবং একই কাজের পুনরাবৃত্তির কারণে অর্থ ও জনবলের অপচয় হচ্ছে। সুপারিশে এসব সংস্থার দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করা, সমন্বিতভাবে কাজ পরিচালনা এবং আধুনিক কেন্দ্রীয় পরীক্ষাগার স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি লাইসেন্স ও নমুনা অনুমোদন পেতে উদ্যোক্তাদের হয়রানি বন্ধে কর্মকর্তাদের রোটেশন পদ্ধতিতে দায়িত্ব প্রদান, কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ও অভ্যন্তরীণ নজরদারি জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে।

বিএসটিআইয়ের ৮৪২টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ৪৭৬টি নবম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব হওয়ায় জনবল কাঠামো পুনর্বিন্যাস, মাঠপর্যায়ে তদারকি বাড়ানো এবং পরীক্ষাগার আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পরামর্শ দিয়েছে দুদক। একই সঙ্গে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। এখন এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যকর উদ্যোগই বিএসটিআইয়ের সংস্কার, ভোক্তা অধিকার ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

বিএসটিআইয়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান বলেন, ‘বিষয়টি আমি এখনো জানি না। জেনে আপনাকে জানাতে পারব।’

বেতনের বাইরে বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বছরে ২৫ থেকে ২৭টি মূল বেতনের সমান ঝুঁকিভাতা গ্রহণের অভিযোগের বিষয়ে বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, এটা নতুন সত্য নয়। এর একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে। যেভাবে বলা হচ্ছে, বিষয়টি ঠিক এমন নয়, আবার বিষয়টি নতুন নয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত